অদ্ভুত জাতি

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২২ মার্চ ২০১৯, ১১:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ

জাতি

কিউরিয়াস বা নতুন কিছু জানা এবং শেখার আগ্রহ যদি কোন জাতির থাকে তা নিঃসন্দেহে বলব জাপানিরা তার মধ্যে প্রথম সারিতে পড়বে।

আমার জীবনে তাঁদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে কর্মের যে সমন্বয় ঘটেছে তা থেকে কিছু তথ্য তুলে ধরব আমার এ লেখাতে।

বেশ কিছুদিন আগের কথা, আমার ডিপার্টমেন্টে জাপানিজ কতৃপক্ষ এসেছে এক সপ্তাহের জন্য অডিট করতে। আমরা নতুন একটি ওষুধ তাদের দেশে বিক্রি করার জন্য আবেদন করেছি। তারা আমাদের আবেদন গ্রহণ করেছে এবং স্টকহোমের উৎপাদন বিভাগ অডিট করতে এসেছে। ওষুধ কম্পানীর জগতে নিয়মকানুনের বেশ কড়াকড়ি। আমেরিকার ফুড এ্যান্ড ড্রাগস অ্যাডমিন্সট্রেশনের মত ইউরোপ এবং জাপানিজদেরও নিজস্ব কর্তৃপক্ষ রয়েছে বিধায় এধরনের অডিট করা নিয়মের মধ্যে পড়ে।

টানা পাঁচদিনের অডিট শেষে তাদের সখ হয়েছে সুইডিশ কালচার এবং কান্ট্রিসাইড ঘুরে দেখার। শুক্রবার কাজের শেষে বাসে করে তাদেরকে নিয়ে গেলাম সুইডেনের নাম করা কপার খনির শহর কপ্পার বেরীতে (Koppar berg)। এখানে যেমন রয়েছে কপারের খনি সঙ্গে সুইডেনের ন্যাচারাল পরিবেশ এবং এক রাজকীয় প্রাসাদ লোভন্যাস হেরগোর্ড (Lövnäs Herrgård) যেখানে জাপানিজ মেহমানদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রাজকীয় প্রাসাদ লোভন্যাস হেরগোর্ডের সামনে রয়েছে বিশাল এক লেক যেখানে পরেরদিন হবে বরশি দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা সুইডেন বনাম জাপান।

সন্ধায় ঐতিহাসিক লোভন্যাস হেরগোর্ড সম্পর্কে বর্ণনা করলেন হেরগোর্ডের তৎকালীণ তত্ত্বাবধায়ক যা জাপানিজদের মন কেড়ে নিয়েছিল। ডিনারে সুইডিস ট্রেডিশনাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরের দিন ব্রেকফাস্ট করে কপারের খনি দর্শন শেষে সুইডেনের জঙ্গলে সুইডিশ ওয়েতে লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাপানিজদের জন্য এরকম বিনোদন তাদের জীবনে নতুন অভিজ্ঞতা তাই তারা খুব আপ্লুত প্রতিটি মূহুর্তে।

লাঞ্চ শেষ হতেই সামারের দিনে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো। আমি তখন জংগল থেকে কিছু কেঁচো ধরে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ঢুকালাম। কেউ কেউ বিষয়টি দেখেছে এবং পরে জানতে পারলাম তাদের মনের ভিতর বেশ কিউরিওসিটি জন্মেছিল তবে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি বিধায় আমিও কোন সাড়া শব্দ করিনি। বিকেলে বৃষ্টি শেষে মাছ ধরার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি সুইডেনর পক্ষে আমরা তিনজন এবং জাপানিজদের পক্ষে তিনজন। বাকি দুইজন সুইডিশ এবং জাপনিজদের দায়ীত্ব পড়েছে জঙ্গল থেকে মাশরুম তোলার যা হবে রাতের ডিনার। রাতে একত্রে রান্নাবাড়ি এবং মতামত বিনিময় করা হবে এই টিম বিল্ডিংয়ের মূল লক্ষ্য। রাতে ডিনারের বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে যদি মাছ ধরা না পড়ে তবে অন্য খাবার তৈরি করতে হবে।

আমি প্রথমেই বললাম আমরা যেহেতু দু’গ্রুপ তাহলে লেকের এ পাড় আর ওপাড় পছন্দ করি। জাপানিজরা পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের আলো পড়েছে যে পাড়ে ঠিক সেই পাড় পছন্দ করল এবং তারা মাছ ধরার জন্য বরশি এবং যা যা দরকার সব নিয়ে তাদের পাড়ে গিয়ে বরশি দিয়ে মাছ ধরতে লেগে গেলো।

আমার সুইডিশ কলিগরা এপাড়ে তাদের মত করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাছ ধরার সময় নির্ধারিত করা হয়েছে দুই ঘন্টা। আমি বরশি না ফেলে কিছুক্ষনের জন্য জঙ্গলের বাইরে গেলাম। দেখি কিছু গরু ঘাস খাচ্ছে, সেখান থেকে পরিমান মত গরুর গবর নিয়ে ফিরে আসতে ঘন্টা মত সময় চলে গেল। এসে দেখি দুই পক্ষের কেউই কোন মাছ ধরতে পারেনি। এদিকে বর্ণনা করা হয়েছে ৪-৫ কেজি ওজনের লাক্স (সালমোন) এবং রেংনবোগে (regnbåge) নামের মাছ রয়েছে লেকে। রেংনবোগ মাছ দেখতে লাক্সের মত তবে একটু ভিন্ন রংয়ের এবং খেতে বেশ সুস্বাদু।

আমি যেখানে মাছ ধরতে প্রস্তুতি নিয়েছি সেখানে পুরো গবর ছুড়ে ফেলেছি। এখন একটু ঘুরছি আর সময় দেখছি। আধঘন্টার মত যখন সময় বাকি হঠাৎ জাপানিজ গ্রুপের একজন এক কেজি মত ওজনের একটি লাক্স ধরে বিশাল আকারে আনন্দ ফুর্তির সঙ্গে ছবি তোলা শুরু করছে। আমার সুইডিশ কলিগদের মন বেশ খারাপ। জঙ্গলে যারা মাশরুম তুলতে গিয়েছিল তারাও ফিরে এসেছে অনেক মাশরুম নিয়ে। মাছের কোন খবর নেই।

সুইডেনের বরশি একটু অন্য রকম আমাদের বাংলাদেশের তুলনায়। ফেইক মাছ দিয়ে এরা মাছ ধরে। এবার আমি আমার বরশিতে কিছু কেঁচো যুক্ত করে যেখানে গবর ফেলেছি আধাঘন্টা আগে সেখানে বরশি ফেলতেই বিরাট এক রেংবোগ মাছ ধরা পড়েছে। এক ধরনের ছোট নেট দিয়ে সেই বিশাল বড় মাছ তুলতেই হইহুল্লোর শুরু এবং পরে ওজন দিয়ে দেখা গেল সাড়ে চার কেজি। জাপানিজদের মুখ শুকিয়ে হয়েছে কয়লা। সুইডিশ কলিগদের আনন্দ দেখে কে। আমি আরেকটি ধরতেই সময় শেষ। কেও বুঝতে পারে নি এর কারণ। সবাই হতাশ! ভাবনাতে পড়েছে এ কি করে সম্ভব? তারা কেও মাছ পেল না। অথচ আমি শুরু করলাম শেষে এবং একটা নয় দুটো বিশাল মাছ ধরেছি যা জাপানিজদের করেছে অবাক।

লেগেছে আমার পেছনে মাছ ধরার মধ্যে কি রহস্য রয়েছে তা জানার জন্য। প্রথমে একটু উল্টোপাল্টা বলেছি। যেমন গুণমন্ত্র জানি তাই মাছ ধরতে সহজ হয়েছে। সন্ধ্যার ডিনারে প্রিপারেশনের উপর এক আলোচনায় বলেছিলাম, বৃষ্টির কারনে কেঁচো উঠেছিল যা দুপুরে সংগ্রহ করা এবং পরে গরুর গবর আনা এসব ছিল আমার এক্সট্রা প্রিপারেশন মাছ ধরার জন্য। আমি অতীতে স্টকহোমের ম্যালারেনে এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছি দুই বছর আগে। তখন আমি আমেরিকানদের সঙ্গে মাছ ধরার প্রতিযোগিতায় সেদিনও সব চেয়ে বড় মাছটি ধরেছিলাম।

ফার্মাসিয়াতে বিদেশী গেস্ট এলেই আমি মাছ ধরা প্রতিযোগিতা এবং বিনোদনমূলক এক্টিভিটিসের ব্যবস্থা করতাম। আলোচনা-পর্যালোচনার পুরো সময় জাপানিজদের কিউরিয়াস এবং গুরত্ব দিয়ে সবকিছু শোনা এবং জানার আগ্রহ সত্যি আমাকে মুগ্ধ করেছিল, যেমনটি আমার মাছ ধরার কৌশল মুগ্ধ করেছিল তাদের সেদিন। রবিবারে ফিরে এলাম কপ্পার বেরী থেকে স্টকহোমে।

পরের দিন ফার্মাসিয়ার হোমপেজে উইকেন্ডের এক্টিভিটিসের উপর বড় আকারে লেখালেখি হয়। জাপানিজদের মাছ ধরার প্রতিযোগিতা এবং পরাজিত হওয়ার সঙ্গে আমার বাংলাদেশি কৌশলে মাছ ধরার উপর বর্ণনা ছিল এক আনন্দদায়ক মূহুর্ত। পরে যতবার জাপানিজদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছি শুরু হয়েছে মাছ ধরার গল্প দিয়ে। জীবন চলার পথে পৃথিবীতে অনেক ছোটখাটো ঘটনা ঘটে যা সারা জীবন হৃদয়ে দাগ ফেলে। সে দাগ যদি মধুময় হয় তবে তা ক্রিয়েট সাম এক্সট্রা ভ্যালু যা অর্থে কেনা যায় না। আমি মনে করি আমাদের দৈনিক শিক্ষা যেন এমন কিছু হয় যা শেয়ার করার মত।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×