একজন ভালো মানুষের গল্প

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৫ মার্চ ২০১৯, ১০:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

গল্প

বেইন্ট ভিনকিভিস্ট (Bengt Vinqvist) অবসরপ্রাপ্ত পোস্টম্যান, বয়স ৭৮ বছর। কর্মজীবনের পুরো সময় কাটিয়েছেন পোস্ট ম্যানেজমেন্টের ওপর।

বেইন্ট জীবনে বিবাহ করেননি এবং তার কোন সন্তান নেই। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। তার তিন বোন এবং তারা যে যার মত বসবাস করছেন সাউথ অব সুইডেনে। আমার সঙ্গে বেইন্টের পরিচয় ১৫ বছর ধরে। তিনি এখন আমার পরিবারের একজন সদস্য বললে ভুল হবে না। কারণ তার ভাল-মন্দে, সময়ে অসময়ে আমরা যেমন তার পাশে আছি সেও ঠিক তেমনি প্রয়োজনে রয়েছে আমাদের পাশে। তিনি তার কর্মের পাশাপাশি বক্সিং এবং টেনিস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার মেরিট লিস্টে সুইডিশ জাতীয় বক্সিংয়ের উপর যথেষ্ট সুনাম রয়েছে।

বর্তমানে শুধু এলিট টেনিসের উপর তিনি প্রশিক্ষণরত। তিনি তার টেনিস এবং ফিটনেস মিলে প্রতিদিন তিনঘন্টা সময় ব্যয় করেন। তার বর্তমান আকাঙ্ক্ষা টেনিসে বয়স ভিত্তিক জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক লাভ করা। তিনি প্রায়ই দেশের বিভিন্ন শহর টেনিস টুর্নামেন্টের কারণে ভ্রমণ করেন। যেহেতু বেইন্ট বক্সিংয়ের উপর প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতা করেছেন, তার জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের মধ্যে মুহম্মদ আলী তার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ঠিক তেমন করে জায়গা পেয়েছিল এন্থনি ফ্লেচার, (Anthony Fletcher) পেনসিলভানিয়ার এক (Pennsylvania) কালো আমেরিকান বক্সার। তৎকালীণ বক্সিং জগতের এক উদিয়মান তারকা যে তুলেছিল আমেরিকায় তুমুল লড়াইয়ের ঢেউ। বেইন্ট, এন্থনির খেলায় মুগ্ধ হয় এবং তার শুভাকাঙ্খী হয়ে পড়ে।

সে বক্সিং ম্যাগাজিন, রেডিও এবং টিভিতে এন্থনিকে ফলো করতে থাকে। ১৯৯২ সালের কোন একদিন নিউইয়র্কের ফেন্সি রেস্টুরেন্টে ডিনারে হঠাৎ কে বা কারা গুলি চালিয়ে দেয় এন্থনিকে উদ্দেশ্য করে। জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নেয় এন্থনি এবং পাল্টা আক্রমন করে। প্রচন্ড গোলাগুলির মাঝে ঢুকে যায় গুলি এক নিরপরাধীর শরীরে। পুলিশ এবং অ্যাম্বুলেন্স আসতে সময় লাগে বিধায় শরীর থেকে প্রচুর পরিমান রক্ত ঝরে। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে নতুন রক্ত দেয়া দরকার ছিল কিন্তু জেহোভাহ'স উইটনেসেস (Jehovah's Witnesses) ধর্ম বিশ্বাসের কারণে নিরপরাধীর মা অন্য ধর্মের রক্ত ছেলের শরীরে ঢোকাতে নিষেধ করেন।

অ্যাম্বুলেন্সে কর্তৃপক্ষ তাকে হাসপাতালে আনতে আনতেই মারা যায় সেই নিরপরাধী। এন্থনি দোষি সাব্যস্ত হয় এবং জেলে ঢোকে। খবর ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে এবং বেইন্ট ঘটনা জানতে পারে।

কেস চলাকালীণ কোন এক সময় এন্থনির বিলাসবহুল প্রাচুর্যের অবসান ঘটতে থাকে আইনের কাটগড়ায় উকিলের খরচ দিতে দিতে। পরে তার আর সামর্থ্য থাকে না আইনের সাহায্য পাবার। এমন একটি খবর বক্সিং মাগাজিনে দেখতে পায় বেইন্ট। বেইন্ট পরে এন্টনীর সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ এবং এন্থনিকে সুইডেন থেকে অর্থ সাহায্য করতে শুরু করেন। এন্থনির আত্নরক্ষার কারনে এমনটি ঘটেছে তাই তাকে নির্দোষ প্রমান করতে বেইন্ট সুইডেন থেকে উকিলের খরচ পাঠাতে থাকে। এন্থনি বিবাহিত এবং ছেলে-মেয়ে বউ সব রেখে জেলে ঢুকেছে। কয়েক বছর পার হয়েছে কেউ আর এখন তার খোঁজ খবর রাখেনা। সবাই ভুলতে শুরু করেছে এন্থনিকে। এন্থনি আর সেই নামকরা বক্সার নয়, এখন তার পরিচয় খুনি।

তাই খুনি বাবার পরিচয়ে এখন আর তার ছেলে-মেয়েরা পরিচিত হতে চায় না বিধায় তার পরিবার সমস্ত সম্পর্কের অবসান ঘটিয়েছে।

এন্থনির এবং তার বড় মেয়ে যার কাছে সুইডেন থেকে বেইন্ট টাকা পাঠাত শুধু তাদের সঙ্গে বেইন্টের যোগাযোগ রয়েছে যা আমি জেনেছি বেইন্ট থেকে পরে। ২০১৬ সালের কোন এক সময় হঠাৎ আমার এক মিটিংএ ডাক পড়ে ফ্র্যাংকলিন, ওহিওতে (Franklin, Ohio)। একদিন গল্প প্রসংগে আমি আমার এক কলিগ পেনসিলভানিয়ার বাসিন্দা তাকে এন্থনির বিষয়ে বলি। কলিগ বিষয়টি সম্পর্কে বেশ সচেতন এবং আমাকে তার মৃত্যুদন্ডের ঘটনা এবং সে ড্রাগসের সঙ্গে জড়িত ছিল বিষয়টি জানায়। আমি বেশ অবাক হই এ কথা জানার পর। সুইডেন ফেরার পথে এন্থনির বিষয়ে আরো খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারি এন্থনির মেয়ে বেইন্টের টাকা দিয়ে স্তন ইমপ্লান্ট (Breast implant) করা থেকে শুরু করে বিলাসী জীবনযাপন করছে। এন্থনি ফ্লেচার ড্রাগ বিক্রেতা এবং খুনি সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যু দন্ডেদন্ডিত হয়েছে।

পেনসিলভানিয়ার নিয়মে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে যাবৎজীবন কারাদন্ডে দন্ডিত এন্থনি। অথচ এ কথা বেইন্টকে কেউ বলেনি। এন্থনি এবং তার মেয়ে বিষয়টি গোপন রেখে বেইন্টের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য নিয়ে চলছে।

আমি প্রথম দিকে বিষয়টি জানতে পেরে শুধু ভেবেছি মানব জাতির মধ্যে এমন বিশাল হৃদয়বান মানুষও পৃথিবীতে রয়েছে। আমরা আপন জনের জন্য অনেক কিছু করি সত্য কিন্তু কতজন এমন করে যেমনটি বেইন্ট করেছে! বেইন্ট তার প্রায় সমস্ত অর্থ ব্যয় করেছে এই এন্থনির জন্য অথচ এ কেমন অবিচার! আমি আমেরিকা থেকে ফিরে পুরো ঘটনা বেইন্টকে বলি। বেইন্ট আমাকে কখনও বলেনি যে তার সততার অপব্যবহার করে এতবছর এন্থনির পরিবার তাকে ঠকিয়েছে। তবে যতটুকু আমি বেইন্টকে চিনেছি তাতে মনে হয় তিনি একটু কষ্ট পেয়েছেন।

গত দুই বছর হলো বেইন্ট তাকে সাহায্য করা বন্ধ করেছে। এন্থনি চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমান পৃথিবীর নানা ধরণের সমস্যা দেখে আজ মনে পড়ে গেল এন্থনির কথা, মানব কি করে হতে পারে এমনই দানব! আজ বেইন্ট আসবে আমাদের বাসায়। সে বাংলা খাবার পছন্দ করে, তার জন্য মাছ রান্না করেছি। আমার বাবা-মা বেঁচে নেই, তারপর বয়সে তিনি আমার বাবার সমবয়সী হবেন। বাবা বেঁচে থাকলে ৮০ বছর হতেন। সব মিলে বেইন্ট আমাদের পরিবারে বেশ আপন হয়ে উঠেছেন। সে খুব আনন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের কথা জানতে চায়। তার ভালোই লাগে যখন সে আমাকে দেখে বলে বাংলাদেশের ওপর আমি নানা কাজ করছি। তার অঢেল অনুদান যা মুগ্ধ করেছে নিশ্চিত আমেরিকার সেই প্রাক্তন বক্সার এন্থনির পরিবারকে। মুগ্ধ করেছে আমাকে যখন শুনেছি বছরের পর বছর পরের জন্য সে প্রায় সমস্ত অর্থ দান করেছে। বেইন্টের স্বপ্ন একটিই তা হলো টেনিসে জাতীয় পর্যায়ে গোল্ড কাপ জেতা। তার শারীরিক ফিটনেস এবং টেনিসের উপর বিশাল দক্ষতা রয়েছে। সুইডেনে তার সমমানের খেলোয়াড় রয়েছে বেশ কয়েকজন। এখন বিজয় নির্ভর করছে তার পারফরমেন্সের ওপর।

জুন মাসে সুইডেনে সুইডিশ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা হবে। বেইন্টের প্রিপারেশন চলছে ভালই। আমরা তার সুস্থতা কামনা করছি যেন সে ভালভাবে তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×