শিক্ষা প্রশিক্ষণে SWOT Analysis পদ্ধতির ব্যবহার

  রহমান মৃধা, সুইডেনে থেকে ০১ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

শিক্ষা প্রশিক্ষণ

বর্তমান শিক্ষা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় নানা ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে পরিবর্তন আনার জন্য। নকল এবং কোচিং বন্ধ করা এ প্রচেষ্টার একটি মূল লক্ষ্য বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।

কিন্তু আমার বোধগম্য হচ্ছে না এই ভেবে যে, নকল বা কোচিং বন্ধ করলেই কি সফল হবে শিক্ষা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আসল উদ্দেশ্য? ভালো ও টেকসই সুশিক্ষা পেতে হলে শুধু নকল এবং কোচিং বন্ধ করলেই হবে কি?

নকল এবং কোচিংই কি দেশের শিক্ষার অবনতির জন্য দায়ী? নকল নতুন কিছু নয়। এটি আগেও ছিলো, তবে প্রশ্নের উত্তরের ধরণ হ্যাঁ বা না হওয়ায় নকল করা সহজ হয়েছে। এদিকে কোচিং সেন্টার আগের তুলনায় বেশি হয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মারাত্মক প্রতিযোগিতার কারণে।

এমতাবস্থায় ভালো ফলাফল পেতে সবাই উঠেপড়ে লেগেছে যার কারণে কোচিংয়ের চাহিদা বেড়েছে। তবে শিক্ষার গুণগত মান কমার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা কি ঘেটে দেখা হয়েছে সঠিকভাবে? নকল এবং কোচিংয়ের পেছনে যে কারণ বা রুট কজ (route cause) জড়িত তা যদি সঠিকভাবে সনাক্ত করা না হয় তাহলে শিক্ষার পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে কি? আমি এর আগে লিখেছি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা যা শুধু শিক্ষক নয় শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও অ্যাপ্লাই করা আশু প্রয়োজন যদি আমরা সত্যিকারে শিক্ষার পরিবর্তন দেখতে চাই।

শিক্ষা প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হলে কী শিক্ষা, কেন শিক্ষা এবং সর্বোপরী কীভাবে শিক্ষা- এ প্রশ্নগুলোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা প্রশিক্ষণ পদ্ধতির পরিবর্তন আনতে না পারলে আমাদের শিক্ষার উন্নতি হবে না। নকল বা কোচিংয়ের উপর সময় ব্যয় না করে বরং শিক্ষা প্রশিক্ষণ পদ্ধতির উপর জোর দেয়া হোক।

কোচিং বন্ধ করলে বর্তমানে যেভাবে কোচিং চলছে সেভাবে না হয়ে হয়তো হবে অন্যভাবে। তা যেমন হতে পারে জাপান বা আমেরিকান কোচিং সেন্টার ‘কুমন’ (Kumon) পদ্ধতির মতো। কুমন কী এবং তা কিভাবে মনিটরিং করা হয়? আমি আমেরিকার ক্যার্লিফোনিয়ায় দেখেছি কুমন কোচিং সেন্টার। কুমন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান এবং এখানে এক্সট্রা খরচে শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ের ওপর স্কুলে যে হোমওয়ার্ক দেয় তার সমাধান পেয়ে থাকে।

বাবা-মা স্কুল শেষে তাদের ছেলেমেয়েদের কুমনে নিয়ে যায় এবং তারা (কুমন কর্তৃপক্ষ) তাদের কুমন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীকে সমস্যার সমাধান শেখায়। কুমন কোচিং সাধারণত প্রাইমারি এবং হাইস্কুল অবধি হয়ে থাকে। আমি সুইডেনে নিজে পড়েছি পরে আমার ছেলেমেয়ে পড়ছে তাই এখানের শিক্ষা প্রশিক্ষণ পদ্ধতির উপর যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। আজ তুলে ধরবো সুইডেনের শিক্ষাপদ্ধতি এবং প্রশিক্ষণের ওপর কিছু তথ্য। আমার মেয়ে জেসিকা একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। এখানে শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত বাবা-মার সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে উন্নয়নমূলক আলোচনা হয়ে থাকে। এ আলোচনায় SWOT Analysis পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। SWOT (strengths, weaknesses, opportunities, and threats) analysis is a framework used to evaluate and to develop strategic planning. SWOT analysis assesses internal and external factors, as well as current and future potential. SWOT Analysis পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর গঠনমূলক পরিকল্পনাপদ্ধতি এবং তার দক্ষতার সঙ্গে কী শিক্ষা, কেন শিক্ষা এবং কীভাবে শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর আলোচনা করা হয়।

SWOT Analysis পদ্ধতিতে খোলামেলা আলোচনা হয়ে থাকে এবং এখানে অ্যাগ্রী টু ডিজঅ্যাগ্রী প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। জেসিকা তার গণিতের ওপর কিছু দুর্বলতার কারণ তুলে ধরতে বর্ণনা দিল গণিত শিক্ষকের শিক্ষাপদ্ধতির ওপর।

জেসিকার বর্ণনায় ‘শিক্ষককে জানতে হবে প্রতিটি শিক্ষার্থী সম্পর্কে। কারণ এদের মধ্য কেউ লাজুক টাইপের, কেউ কথা বেশি বলে, কেউ হয়তো তার চিন্তাধারায় কিছুটা স্লো (slow)।

এক্ষেত্রে শিক্ষকের অদ্ভূত, অপূর্ব, সুন্দর, উপযুক্ত, চমৎকার বাচনভঙ্গী ও উপস্থাপনা শিক্ষার্থীর কাম্য। একজন শিক্ষক যদি তা না জানেন তাহলে কীভাবে শিক্ষা দেবেন বা শিক্ষার মূল্যায়ণ করবেন তিনি? শ্রেণিকক্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থী। গণিতের শিক্ষক মনে করেন তিনি খুবই ভালো শিক্ষক এবং গণিতের উপর তার ভালো দক্ষতা রয়েছে।

জেসিকার সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে জেসিকা তার শিক্ষাপদ্ধতির উপর সন্তুষ্ট নয়। যেভাবে শিক্ষক বোঝাতে চেষ্টা করেন তাতে দুই থেকে তিনজন সমস্যার সমাধান করা শিখতে পারে।

বাকিরা শ্রেণিকক্ষে চুপচাপ থেকে সময় পার করে দেয়। পরে তারা বাসায় গিয়ে নিজেদের মতো করে বা অন্যের সাহায্যে সমস্যার সমাধান করতে চেষ্টা করে। কেউ আবার ইউটিউবে গণিতের ওপর যে শিক্ষাপদ্ধতির ব্যবস্থা রয়েছে তার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করে’।

এখানে নানা সুযোগ সুবিধা রয়েছে বিধায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে। সম্মানিত শিক্ষকের দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে হৃদয়গ্রাহী পাঠদানের ও উপস্থাপনা কৌশলের ওপরই নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের কার্যকর উপলব্ধি ও অর্জন। একজন শিক্ষক যদি প্রকাশমান হন তবেই তিনি প্রকাশিত। জেসিকার আলোচনায় আরো কিছু তথ্য জানতে পারলাম যেমন শিক্ষক তাদেরকেই ভালো শিক্ষার্থী মনে করেন যারা ক্লাসে বেশ শিক্ষকের সঙ্গে তাল দেয় বা কমিউনিকেটিভ অথচ অনেক ভালো শিক্ষার্থী রয়েছে যারা চুপচাপ বা লাজুক টাইপের তাদের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না।

SWOT Analysis পদ্ধতির মাধ্যমে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার (clear) হলো। যেমন প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজেরও আলাদা গোলস (goals) এবং ওবজেক্টিভস (objectives) রয়েছে। যেমন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে সে জানতে চায় তার আশানুপাত ফলাফল হচ্ছে কিনা! এখন যদি দেখা যায় যে আশানুপাত ফলাফল পেতে বা উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কম সেক্ষেত্রে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে ফলো আপ (follow up) মিটিংয়ের সমন্বয়ে সমস্যার সমাধানের ব্যবস্থা রয়েছে। পরীক্ষার পরে নয় বরং আগেই যেন সে ধরনের ফিডব্যাক (feedback) পাওয়া সম্ভব তার জন্য প্রতি সিমেস্টারে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকের মধ্যে সময়োপযোগী মিটিং হয়ে থাকে।

শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর খোলামেলা আলোচনায় বেরিয়ে আসে শিক্ষাপদ্ধতির ধরণ যা স্বাভাবিকভাবে SWOT Analysis এর আওতায় এনে শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন করা হয় এখানে। শিক্ষকের গোলস যদি হয় পরীক্ষার সিলেবাস কাভার করা তবে সে শিক্ষার কোনো মূল্য নেই (ক্রিয়েট নো ভ্যালু)।

কারণ সিলেবাস কাভার করা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নয়। কী হবে সেই সিলেবাস কাভার করে যদি শিক্ষার্থী তার সঠিক শিক্ষা অর্জন না করতে পারে? শিক্ষার্থীর আত্মোপলব্ধির প্রয়োজনে চমৎকার উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকতে হবে শিক্ষকের। শিক্ষকের গোলস হবে শিক্ষার্থীর চাহিদা ঘিরে। শিক্ষককে আবিষ্কার করতে হবে শিক্ষার্থীর সাফল্যের গোপনসূত্র, তার সক্ষমতা, তার জ্ঞানের গভীরতা, যা তার অন্তরাত্মায় সংরক্ষিত। অন্যদিকে শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য হতে হবে জানার জন্য শেখা এবং শেখার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে আর্নিং বাই লার্নিং যা পরে ব্যবহৃত হবে কর্মজীবনে। পৃথিবীর সেরা দেশের শিক্ষা পদ্ধতি এবং একজন শিক্ষার্থীর প্রতিফলন তুলে ধরার কারণ একটাই তা হলো সুইডেনের শিক্ষাপদ্ধতি, পরিবেশ এবং পরিস্থিতি সম্বন্ধে জানা।

বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত মানে পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রশাসনের পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি করতে সবার মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষাপ্রশাসন এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে ভয়ের সম্পর্ক থাকলে চলবে না। আমি আমার চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতায় যতটুকু দেখেছি এবং শিখেছি তাতে জানি ভয় দেখিয়ে নয়, সহযোগিতা এবং সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্ভব সমাধান। সর্বোপরি পারস্পরিক সম্মান দেখাতে হবে এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে অভিভাবকদের সচেতনতা, ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে হবে। আমি মনে করি সুশিক্ষা পেতে হলে যেমন সুশিক্ষকের দরকার তেমন দরকার শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ এবং নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের।

শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জন নয়, ব্যক্তিজীবনের জন্য বিশাল এক অভিজ্ঞতা, যা অর্জনে চাই যথাযথ আত্মবিশ্বাস আর নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া। উদ্দেশ্যমূলকভাবে এবং সহজ উপায়ে শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তনের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষা প্রশিক্ষণে SWOT Analysis পদ্ধতির ব্যবহারে নকল এবং কোচিং অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে এবং তা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে। হতাশ না হয়ে আসুন সবাই চেষ্টা করি। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×