মানুষ হতে চাই মানবতা ও ভালোবাসার স্বার্থে

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০১৯, ১০:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

ছবিতে নাজমুল, রহমান এবং এরিক

যুগ যুগ ধরে মানবের মাঝে হাজারও মহামানবের আবির্ভাব হয়েছে এবং হচ্ছে পৃথিবীতে। এরাও মানব তবে কিছুটা ভিন্ন, তাইতো তারা মহামানব।

মহামানব কি? কিভাবে মানব হতে পারে মহামানব? কি করতে হবে মহামানব হতে হলে? মহামানব না হতে পারলেও একজন ভালো মানুষ কি হওয়া সম্ভব নয়? আমাদের গোলস (goals) এবং উদ্দেশ্য (objectives) কি? এবং কিভাবে বিশ্ব দরবারে সেগুলোকে আমরা তুলে ধরতে পারি?

পাশ্চাত্য যেমন সুইডিশ বা জার্মান এদের নিজস্ব একটি পরিচয় রয়েছে। সুইডিশ জাতির নীতিবাক্য হচ্ছে ‘রাজকীয়’ (Royal) আর জার্মানদের নীতিবাক্য ‘ঐক্য, ন্যায়বিচার এবং মুক্তি’। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশি, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের নীতিবাক্য কি বা দরকার আছে কি তার? ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালেবাসি’ এটাই যদি আমাদের নীতিবাক্য হয় তবে জানতে হবে কি বুঝানো হয়েছে এ জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে। আমরা দেখতে সবাই একরকম নই বা আমাদের চিন্তা ধারাও এক নয়। আমাদের শিক্ষার মূল লক্ষ্য কি বা কেমন হওয়া উচিত? আমাদের ব্যবহার কেমন হওয়া দরকার? আমাদের চেহারায় যেমন ভেজাল (নানা রকমের) তার মানে কি আমাদের কর্মেও ভেজাল হতে হবে? আমাদের পরিচয়ে কি আমরা বিশ্বের দরবারে সৎ ও নিষ্ঠাবান জাতি, নাকি দুর্নীতিবাজ জাতি? কোন পরিচয়ে আমরা পরিচিত হতে চাই? আমরা কি আইন মান্যকারী জাতি, নাকি আইন ভঙ্গকারী জাতি? আমরা যেমন দেশে দুর্নীতি পরিচয়ে পরিচিত হতে চাই না ঠিক তেমনি বিদেশেও আমরা অসুন্দর বা দুর্নীতিবাজ জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চাই না।

দেশের কাঠামো গঠনে আমাদের সিদ্ধান্তে আসতে হবে আমরা কেমন জাতি হিসেবে বাস করতে চাই। জাতীয় সংসদ ভবনে এর ওপর একটি বিশ্লেষন দিয়ে তা আইনের অন্তর্ভুক্তে এনে সঠিকভাবে আমাদের জাতীয় নীতিবাক্য প্রনয়ন করা আশু প্রয়োজন। জাতি হিসেবে আমরা গরীব বা আমাদের অনেক কিছু নাই তাতে আমাদের জাতীয় পরিচয় ক্ষুন্ন হবে না, তবে ক্ষুন্ন হবে যদি আমরা সততায় বা নৈতিকতায় গরীব হই। আমরা ভালো মানুষ এমনকি মহামানব হতে চাই। যদিও পৃথিবীতে মহামানবের সংখ্যা কম তুলনামূলক ভাবে।

একজন মহামানব হওয়া খুবই কঠিন কাজ, কিন্তু মহানুভবতার সঙ্গে একটু সহানুভূতির সংস্পর্শ হলেই একজন মানুষ হতে পারে ভালো মানুষ। আমার ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের এক বন্ধু থাকে লন্ডনে তার পরিবার নিয়ে। এসেছিল বেড়াতে স্টকহোমে। পরে তার সখ হলো জাহাজে করে বাল্টিক সাগর পাড়ি দেয়ার।

উদ্দেশ্য সমুদ্রভ্রমণ করা তাও পৃথিবীর বড় জাহাজে করে। সেই সঙ্গে জাহাজের ভেতরের সব কিছু দেখা যেটা সত্যিকার অর্থে বলতে হয় এক ভাসমান শহর এবং সবশেষে বেশ কয়েকজন বন্ধুদের সঙ্গে হেলসিঙ্কিতে গিয়ে আড্ডা দেয়া। বাল্টিক সাগর ভ্রমণ শেষে আমরা ফিরেছি স্টকহোমে।

বন্ধু নাজমুলের তাড়া রয়েছে তাকে স্টকহোম আরল্যান্ডা বিমান বন্দরে যেতে হবে ফিরতি ফ্লাইট ধরার জন্য। আমার স্ত্রী মারিয়া গাড়ি নিয়ে এসেছে সকালে আমাদের জাহাজ ঘাট থেকে রিসিভ করতে।

পথে চা কফির সঙ্গে একটু আড্ডা শেষে প্ল্যান করেছি নাজমুলকে সরাসরি এয়াপোর্টে দিয়ে আসব। গাড়িতে উঠতে নাজমুলের নজরে পড়েছে গাড়ির সামনের এক চাকা লিক হয়েছে। শীতের সময় সুইডেনে বরফের কারণে পিচ্ছিলতা কমাতে রাস্তায় ছোট ছোট পাথর কুচি ছিটানো হয়। পাথর কুচি টায়ারে ঢোকার কারনে হয়ত লিক হয়েছে। কি করা? শেষে ভাবলাম নাজমুলকে বাসে তুলে দেই। ২৫-৩০ মিনিটের পথ এবং প্রতি দশ মিনিট পর পর এয়ার পোর্টের বাস আসা যাওয়া করে। বাসের সময় এবং এর উপস্থিতি সচারচার নড়চড় হয়না। কিন্তু আধঘন্টা পার হয়ে গেল এবং তিনটি বাস এ সময়ের মধ্যে আসার কথা, একটিও আসেনি। বেশ কয়েকজন যাত্রী যাদের প্লেনে চেকিংয়ের সময় শেষের পথে। টাক্সি ফোন করে পাওয়া যাচ্ছে না, এদিকে যেমন ঠান্ডা তেমন বাতাস বইছে প্রচুর। দুইজন নরওয়েজিয়ান রমনী তারা বাসের টিকিট মেশিন থেকে কিনে ফেলেছে এবং তাদের প্লেন ছাড়বে ১২,৩০ মিনিটে, বাজে তখন সকাল ১১,৩০ মিনিট।

আজ আবার সুইডেনে সময় চেঞ্জ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত সুইডেনে শীতের সময় এক ঘন্টা পিছয়ে দেয়া এবং বসন্তের শুরুতে সময় একঘন্টা সামনের দিকে এগিয়ে আনা হয়। যার কারণে হয়তবা আজ ট্রাফিকের এ অবস্থা।

যদিও সময় চেঞ্জ নতুন কিছু নয় এখানে তবুও বছরে একবার ঘটে বিধায় ভুল হতে পারে।

কয়েকটি প্রাইভেট গাড়ি পাশ দিয়ে চলে গেল, জানিনা তারা কোথায় যাবে। হঠাৎ নরওয়ের এক রমনী লিফটের সাহায্য চেয়ে হাত ইশারা দিল একটি প্রাইভেট গাড়িকে, গাড়ি থেমে গেলো। মেয়েটি বললো তাদের সমস্যার কথা। ছেলেটির বয়স ৩০-৩২ হবে, সামনের ছিটে বসে রয়েছে তার বান্ধবী।

একজন ভালো মানুষের সঙ্গে আমার ঝড়ের গতিতে দেখা হলো। নাম এরিক এক পলকে ধন্যবাদ দিতে একসঙ্গে একটি ছবি তুললাম। পরে এরিক নরওয়ের দুই রমনী এবং নাজমুলকে নিয়ে দ্রুত রওনা হলো এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। একই সঙ্গে পথে যেতে যেতে তার বান্ধবী সুজান এয়ারপোর্টে ফোন করে তাদের দেরীর কারণ বর্ণনার সঙ্গে বিমান কর্তৃপক্ষকে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করেছে।

এরিক লিফট দিয়েছে যদিও তার গন্তব্যস্থল এয়ারপোর্ট ছিলনা। তারা সেই পথ দিয়ে নিকটস্থ শপিং মলে যাচ্ছিল বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কেনার জন্য। তাদের নিজেদেরই তাড়া রয়েছে বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য।

যখন তারা জানতে পেরেছে এদেরকে এয়ারপোর্টে পৌছাতে হবে নইলে ফ্লাইট মিস করবে, তখন তাদের নিজেদের ব্যস্ততা এবং বন্ধুর জন্মদিনের দাওয়াত রেখে এদেরকে এয়ারপোর্টে পৌছে দিল। এরিক এবং সুজানের মহানুভবতা এবং সহানুভূতির কাছে হার মেনেছে পৃথিবীর দুই ভিন দেশের মানুষের মন। তাইতো আজ নাজমুল সুদূর লন্ডন থেকে ভাবছে এরিক এবং সুজানের কথা।

ভাবছে হয়ত দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছিল, হয়ত দুপুরের খাবার এবং সবার সঙ্গে একত্রে আড্ডাটি মারা হয়নি গতকাল তাদের! এরিক এবং সুজানের মনুষ্যত্ববোধ এবং সহানুভূতি স্মৃতি হয়ে রয়ে গেলো বন্ধু নাজমুল এবং নরওয়ের দুই রমনীর হৃদয়ে। সঙ্গে নিয়ে গেলো একটি জাতির এবং একটি দেশের প্রতি ভালোবাসা, যা নাজমুলকে এবং নরওয়ের দুই রমনীকে শুধু মুগ্ধ নয় করেছে অবাক।

এদিকে এরিক এবং সুজান শুধু নিজেদের নয় গোটা সুইডিশ জাতিকে তুলে ধরেছে তাদের কর্মে (মনুষ্যত্ববোধ এবং মহানুভবতা)। পৃথিবীতে এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিক্ষনে, প্রতিদিন। আমাদের দৈনন্দিন কর্মে আমরা যেনো এরিক এবং সুজানের মতো এমন কিছু করতে পারি যা নিজের আত্মার তৃপ্তি বৃদ্ধি করে এবং দেশ ও জাতিকে গর্বিত করে। আমরাও যেনো এদের মত কারো দরকারে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারি মনুষ্যত্ব, মানবতা এবং ভালোবাসার স্বার্থে।