আগুনে পুড়ে মরতে চাইনা আর

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:২২ | অনলাইন সংস্করণ

আগুন

আগুনের মেলা চলছে বাংলার ঘরে ঘরে। কি করিব ভাই হবে কি উপায়, যদি সব কিছু জ্বলে পুড়ে যায়! কে করিবে সব ধুয়ে মুছে সাফ, যদি তুমি না থাকো পাশে? এসো হে বন্ধু এসো কিছু করি সবাই মিলে এক সঙ্গে। ছোটবেলায় আগুনে আমি পুড়েছি দুই বার। শরীরের অঙ্গ ধ্বংস হয়নি তবে পোড়ার দাগ আজও রয়েছে গায়ে।

আগুনে পোড়ার ব্যথা শুধু সেই জানে যে জীবনে পুড়েছে। জীবনের বেশির ভাগ বিপদ ঘটে অসাবধানতার কারণে। আমার ছোটবেলার একটি ঘটনা আজ মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়ির কাজের মহিলা, আমরা ওনাকে কলুখালা বলে ডাকতাম।

কলু একটি পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর নাম যারা বিভিন্ন তৈলবীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন করে। তেলবীজ পেষার জন্য পশুদ্বারা চালিত যে দেশীয় যন্ত্রটি কলুরা ব্যবহার করে তার নাম ঘানি। কলুরা যে পাড়ায় থাকে তাকে বলে কলুপাড়া। যেহেতু ভদ্রমহিলা কলুপাড়ায় থাকতেন তাই আমরা ওনাকে কলুখালা বলতাম। খালার প্রথম বিয়ে হয়েছিল যে লোকের সঙ্গে তার প্রথম স্ত্রী দুই সন্তান রেখে মারা যায়। স্বাভাবিকভাবেই কলুখালা নতুন মা হিসেবে এই দুই সন্তানের জীবনে এসেছেন।

তবে সন্তান দুটি ভীষণ দুষ্ট প্রকৃতির ছিল। তারা কলু খালাকে মোটেও বিশ্বাস করতো না এবং তাকে বেশ কষ্ট দিত। কলুখালা তাদের অগোচরে কিছু রান্না করেছেন কিনা তা চেক করতো তারা এক অভিনব উপায়ে। স্কুল থেকে এসে তারা মাঝেমধ্যে চুলার মধ্যে পা ঢুকিয়ে দিত। চুলা গরম থাকলে তারা ধরে নিতো কলু খালা তাদের অগোচরে কিছু একটা রান্না করেছেন। কুলখালা তাঁর এই ধরনের দুঃখের কথা একদিন মাকে বলছেন। আমি তখন বেশ ছোট। মার পাশে বসে সব শুনছি। কয়েকদিন পরে একদিন স্কুল থেকে একটু সকাল সকাল বাড়ি ফিরেছি, বেশ খিদে লেগেছে। মাকে বললাম কিছু খেতে দিতে, তিনি বললেন খাবার রান্না হয়নি এখনও। আমি ঝট করে মার কথা বিশ্বাস না করে চুলার ভিতর আমার এক পা ঢুকিয়ে দিয়েছি। মায়ের কথা সত্যি কিনা তা যাচাই করার জন্য।

দুই দিন ধরে চুলায় ধান সেদ্ধ করা হয়েছে, ছাইয়ের মধ্যে কাঠের কয়লাগুলো নেভেনি তখনও। চিৎকার করে কান্নার সঙ্গে পা চুলা থেকে বের করলাম বটে, তবে সে যে কী করুণ অবস্থা যা বর্ণনা করার মতো নয়। দীর্ঘ একমাস ছোটবেলার এক মধুময় সময়ের অংশ কেটেছিল বিছানাতে আমার। কলু খালার জীবনের করুণ কাহিনী শুনেছিলাম সেদিন। তাইতো নিজের মাকে অবিশ্বাস করে একই কাজ করতে গিয়ে ধরা খেয়েছিলাম আগুনের কাছে।

যখন দেশে প্রচুর গরম, বৃষ্টির কোন লক্ষণ নেই, ধরেছে মাঝে মধ্যে গ্রামে আগুন এবং তা নেভাতে হাজারও লোক জড়ো হয়েছে। এমন ঘটনা দেখেছি ছোটবেলায়।

বাংলাদেশে বর্তমানে ঘন ঘন আগুন লাগা ছোটবেলার সেই পুরনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিলো।

আজ দৈনিক যুগান্তরের অনলাইন পেজ খুলতে চোখে পড়ে গেল ‘রাজধানীর খিলগাঁও বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অর্ধশতাধিক দোকান পুড়ে গেছে’।

হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পর বাজারের সামনে জড়ো হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিরা। তাদের চোখেমুখে সর্বশান্ত হওয়ার উদ্বিগ্নতা। তারা মলিন চেহারায় তাকিয়ে আছে পুড়ে যাওয়া দোকানগুলোর দিকে। সর্বহারা এই দুঃখী মানুষগুলো খোলা জায়গায় বসে বিলাপ করছে আর ভাবছে কী হবে এখন তাদের।

যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে মনে হচ্ছে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আগুন লাগছে সারা দেশে।

আগুন পৃথিবীর সর্বত্র লাগে এবং ছোটখাঁটো থেকে শুরু করে বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কয়েক বছর আগে সুইডেনের সাউথে একটি বড় ডিস্কো নাইটক্লাবে আগুন লেগে ৬৩ জন লোক মারা যায় এবং ২১৪ জন আহত হয়। সেখানে সর্বমোট লোক ছিল ৩৭৫ জন এবং বয়স ১২-২৫ বছরের মধ্যে। সুইডেনে সব ব্যবস্থা থাকা সত্বেও সম্ভব হয়নি সবাইকে বাঁচানো সেদিন। অসতর্কতা ছিলো সেদিন আগুন লাগার জন্য দায়ী।

আমার প্রতিবেশি এবং বন্ধু টমি লিন্ডকিভিস্ট পেশায় একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তা (fireman) এবং উপাধ্যায় ( ইন্সট্রাক্টর)। টমির সঙ্গে আগুন প্রতিরোধের উপর অনেক বিষয়ে আলোচনা করলাম। সে অবাক হলো শুনে যে বাংলাদেশে সব সুযোগ সুবিধা থাকতেও তা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি দুর্বল পরিকাঠামোর কারণে।

আমার কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ তারা যেন পৃথিবীর অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শহর পরিকল্পনা মানচিত্র (সিটি প্ল্যান) তৈরি করে এবং দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে তা যেন সবাই মেনে চলে। পুরো বাংলাদেশে ঘরদুয়ার থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট সব কিছু তৈরি করতে সিটি প্ল্যান মেনে চলা প্রয়োজন নিজের, পরিবারের এবং দেশের স্বার্থে। বাংলাদেশের প্রতিনিয়ত অগ্নিকাণ্ড প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার পরিচয় মাত্র। কে নেবে এই শতশত বাংলাদেশি পরিবার স্বজনের পোড়াদেহের দায়ভার? বাংলাদেশের কর্মরত প্রশাসন এবং রাজনীতিবিদরা এর দায়ভার এড়িয়ে যেতে পারে না।

আমি আমার কয়েকটি লেখাতে জানিয়েছি ঢাকাকে ফাঁকা করতে হবে। ঢাকা সিটির ব্যবস্থাপনার কোনো পরিকাঠামো (ইনফ্রাস্ট্রাকচার) নেই। মনে হচ্ছে আমাদের সমাজে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাচারিতা, অদূরদর্শিতা, দুর্নীতি এবং দুর্বল প্রস্তুতির (প্রিপারেশন) কারণেই শত শত লোকের মৃত্যু।

বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সেই কারণে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং একইসঙ্গে বিশ্বের যেসব টেকনোলজি রয়েছে তার সাহায্য নিতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের মডার্ন টেকনিকের সাহায্যে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর স্যাটেলাইট নয়, আগে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং মানুষের নিরাপত্তা চাই।

চাই সভ্যতার পরিকাঠামো। চাই গণতন্ত্রের নৈতিক অধিকার। চাই পরস্পরের প্রতি রেসপেক্ট এবং চাই শান্তি। আমরা আর শুনতে চাই না কোন আমলে কে বা কারা ক্ষমতায় থাকাকালীণ কী করেছে। এতে নিজেদের দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হয় এবং জাতি বিভ্রান্ত হয়। আমরা বর্তমান প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেয়া এবং তার সমাধান দেখতে চাই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশের মানুষের নিরাপত্তা দেয়া এবং তা গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এবং তার জন্য সরকারকে যা যা করণীয় তার সবকিছুই করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অজুহাতই কাম্য নয়।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×