জানতে হলে পড়তে হবে

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

হোটেলে এক ছেলে বোরকার আড়ালে করে সঙ্গী হিসেবে একজনকে নিয়ে গেলো স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে। কিভাবে রিসেপশনিস্ট জানবে সত্যিই এই মুখোশধারি তার স্ত্রী কিনা!

বর্তমানে বোরকার আড়ালে নারীদের বেশে কিছু পুরুষও হিজাবের সঙ্গে নিকাবের ব্যবহার করছে। আজ সুইডেন ফেরার পথে এক রমনী কালো রঙের বোরকা পরা অবস্থায় পাসপোর্ট কন্ট্রোলে ধরা পড়ে। ইমিগ্রেশন পুলিশ তার চেহারার সঙ্গে পাসপোর্টের ছবির মিল খুঁজতে মুখ দেখতে চায়।

বোরকা পরা রমনী প্রথমে রাজী না হওয়ায় পুলিশ বিষয়টি সন্দেহজনক মনে করে। অবশেষে মহিলা পুলিশ তাকে তল্লাশী চালায়। সে একজন পুরুষ রমনীর বেশে সুইডেনে ঢুকতে চেষ্টা করার সময় হাতে নাতে ধরা পড়ে।

বেশ খারাপ লাগলো দেখে যে ধর্মের নামে এত বড় ভন্ডামি। কাপড়ের আড়ালে সুন্দরকে অসুন্দর করে যদি কেউ মানবজাতির কলঙ্ক হয়ে জীবনযাপন করতে চায় বা ধর্মের নামে নিজেকে আড়াল করে অমানবিক আচরণ করে, কিভাবে আমরা তার প্রতিকার করব? বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে যদি ধর্মের নামে ভন্ডামি চলতে থাকে বা তার ব্যবহার যদি ভুল পথে পরিচালিত হয়, কি হবে এর শেষ পরিনতি।

ইউরোপে অনেক শিক্ষিত, মার্জিত মুসলিম পরিবারের মেয়েরা তাদের চোখ মুখ বোরকায় ঢেকে জীবনযাপন করছে। কেউ চুল এবং পুরো শরীর সুন্দর করে ঢেকে চলাফেরা করছে, তবে মুখ খোলা রেখে।

ইউরোপের অনেক প্রতিষ্ঠান হিজাবকে মেনে নিলেও নিকাবকে মেনে নিতে পারছে না। কারন পুরো চোখ মুখ বন্ধ থাকার কারনে এখানে কাজ পাওয়া দুস্কর।
মুখ না দেখতে পারলে সনাক্ত করা সম্ভব নয় যার কারনে চাকরি পাওয়া সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। লেখাপড়া শিখে যদি নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগানো না যায় তাহলে তো জীবন বৃথা হয়ে গেলো।

সমাজের নিপীড়িত বা নির্যাতিত মানুষের মতো জীবন চালাতে হবে ধর্মকে ভুল বোঝার কারনে এটাও তো ঠিক নয়! কোরআনের মধ্যে যখন মানব জীবন চলার সমস্ত নির্দেশনা রয়েছে তখন তো তা ভালো করে জানতে, পড়তে, শিখতে এবং বুঝতে হবে।

একই সঙ্গে সেই অনুযায়ী কাজও করতে হবে। অন্যের উপর এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছেড়ে দিলে তো চলবে না। যদি কেউ কোরআনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে মানবজাতিকে বিভ্রান্তের দিকে ঠেলে দেয় তাদেরকেও ছাড় দেয়া যাবে না।

ধর্মকে ভুল বুঝানো এবং ভুল ব্যাখ্যা দেয়া অন্যায়। সময় এসেছে সঠিক পথ খুঁজে বের করার। আমরা ইদানিং দেখছি বিশ্বের অনেক দেশে বিশেষ করে আমেরিকায় যখন কোনো ক্রাইম সংগঠিত হয় তখন ক্রিমিনালের কোন ছবি না পাওয়া গেলে আই উইটনেসের বিবরণ থেকে FBI হাতে আকা তার একটি ছবি তৈরী করে।

এ ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চোখ আর মুখের চিত্র পরিষ্কার করে অংকন করা যাতে ক্রিমিনালকে চিনতে সহজ হয়। অর্থাৎ একজন মানুষকে চেনার সহজ উপায় হচ্ছে তার মুখ ও চোখের বৈশিষ্ট্যকে সনাক্ত করা। আমি আমার জ্ঞানের চর্চায় যতটুকু বুঝতে চেষ্টা করেছি কোরআনের ৩৩নং সূরা আহযাব, ৫৯নং আয়াতের অনুবাদ হচ্ছে ‘হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।

আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু’। এই আয়াতে দুটি অংশ রয়েছে যার একটি মহিলাদের চাদর বা ওড়না তাদের উপর টেনে দেয়া। তাছাড়া এর গুরুত্ব এবং সেই সঙ্গে তাদের চিনতে পারার গুরুত্বের বিষয়ও বলা হয়েছে। আবার কোরআনের ২৪নং সূরা নূর, ৩১ নং আয়াতে ঈমানদার নারীদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে ‘তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে’।

এখানে পরিস্কার যে মাথা আর বুকের ওপর কাপড় রাখা কোরআনের নির্দেশ। কিন্তু মুখ আর চোখ আবৃত রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত যখন এগুলো এমনিতেই খোলা থাকে।

অতএব চোখ এবং মুখ আবৃত রাখলে তো চেনা সহজ হবে না। এ ব্যাপারে আলেমদের সঠিক মতামত দিতে হবে। একই সঙ্গে কেউ যদি কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ফেতনা সৃষ্টি করে তা মেনে নেয়া যাবে না।

কোরআনের অজুহাত দিয়ে বা কোন নিয়ম সঠিকভাবে না বুঝে কিছু বললে বা করলে যদি সমাজে বিরাট আকারে প্রভাব ফেলে তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বিশ্ব যেখানে উন্নতির চরম পর্যায়ে পৌছতে শুরু করেছে ঠিক তেমন একটি সময়ে আমরা নারী জাতির কাপড় এবং চেহারা ঢাকা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমরা না হয় আমাদের ধর্মে বিশ্বাসী নারীদের চেহারা ঢাকলাম। কিন্তু কি হবে অন্য জাতির এবং কি হবে আমাদের পুরুষদের!

আমরা যারা ভিনদেশে বসবাস করছি তারা তো আর পর্দার আড়ালে চলাফেরা করছিনা। আমরা দিনে দুপুরে রাস্তাঘাটে ননমুসলিম রমনীদের সাধারণ পোশাকে দেখছি।

তাহলে কি আমরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী পুরুষরা নিজ নিজ দেশে ফিরে মুসলিম কম্যুনিটির সমন্বয় ঘটাব? আমরা কিন্তু প্রযুক্তির মাধ্যমে এবং তার ব্যবহার করে সবকিছু দেখছি, শুনছি এবং জানছি। দারিদ্রতা, শিক্ষা বা কর্মের কারনে আমরা ননমুসলিমদের সঙ্গে উঠাবসা থেকে শুরু করে পাশাপাশি বসবাস করছি। আমরা মানবজাতি এবং মুসলমান।

আমাদের জগৎ আলাদা নয় এবং আমরা শান্তিতে সবার সঙ্গে মিলেমিশে এক সঙ্গে বসবাসে বিশ্বাসী। আমাদের নেগেটিভ প্রতিক্রিয়ার কারনে সমাজে যেনো বিরাট আকারে প্রভাব না ফেলে তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরণ পরিবর্তন হচ্ছে। অনেকে অপরাধ করছে হিজাব আর নিকাব ব্যবহার করে তাই তারা এটাকে হয়ত আবশ্যিক মনে করছে। মুসলিম আলেম সমাজ যদি হিজাব ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারার গুরুত্বও বলে দিতেন, তবে নুসরাতকে হয়তবা অমানবিকভাবে আগুনে পুড়ে মরতে হতো না। আখেরাতের বিচারের দায়ভার কিন্তু পরমকরুনাময় রাব্বুল আলামিন নিজের হাতে রেখেছেন যার জন্য তিনি তৈরি করেছেন বেহেশত এবং দোজখ। অথচ যে দায়িত্ব আমাদের পালন করার কথা তা না করে আমরা পরের চর্কায় তেল দিতে উঠে পড়ে লেগেছি।

আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য হওয়া উচিত সমাজের নিয়মকানুন মেনে চলা, মিথ্যা কথা না বলা, দূর্নীতি না করা, ঘুষ দেয়া নেয়া বন্ধ করা ইত্যাদি।

সর্বোপরি আমি মনে করি নারীজাতি কিভাবে বসবাস করবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আল্লাহ পাক তাদের দিয়েছেন। আমি আমার মাকে দেখেছি তিনি তার আদর্শ জীবনে দিব্বি সুন্দর করে পৃথিবীতে চলাফেরা করেছেন বাবার ভালোবাসার ছায়ায়। আমাদের অন্তরকে সুন্দর করতে হবে কারণ অন্তর যদি না হয় সুন্দর বিফল হবে সব সাধনা। গোটাবিশ্বের ভালো মানুষ যেখানে পৃথিবীর উন্নয়নে ব্যস্ত ঠিক তেমন একটি সময় নারী জাতির চলাচল নিয়ে যদি সময় ব্যয় করা হয় তাহলে তো কোরআনের আসল অর্থ জানা হবে না। চৌদ্দশত বছর পার হয়েছে অথচ এখনও আমরা আসল তথ্য জানতে সক্ষম হতে পারিনি বলে মনে হচ্ছে। কবে হবে সত্যের জয় আর মিথ্যার পরাজয়! আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকভাবে কোরআনের নির্দেশ বুঝতে পারার আর তা মান্য করার ক্ষমতা প্রদান করুন। আমিন।