কী ওয়েস্ট, বাহামা এবং মায়ামি ভ্রমণে জলিদের সঙ্গে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ০১:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

বিজয়

যীশুখ্রিষ্টের পুনরুত্থানে খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী মানবজাতির পাপের ওপর বিজয় এনেছে। মানুষকে পাপ থেকে মুক্ত করেছে। এ অর্থেই মহোৎসবের নাম পাস্কা বা ইস্টার, সুইডিসে পোস্ক (påsk) বলে। ইস্টার তথা যিশুর পুনরুত্থান-রহস্য খ্রিষ্টধর্মের একটি প্রধান ধর্মীয় বিষয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

ইস্টার হলিডে যা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষেরা পারিবারিক, সামাজিক, কৃষ্টিগত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে; এ কারনে বিশ্বের বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটি থাকে। এবারের ইস্টার হলিডেতে জলি প্ল্যান করেছে তার এক বান্ধবী শুভ্রাকে নিয়ে বাহামা ট্যুর করবে। বহু বছর আগে বাহমায় গিয়েছিলাম। সেই থেকে তারও শখ সেখানে যাওয়ার। অবশেষে ড্রীম কাম ট্রু। জলির দুই মেয়ে নাদিয়া, জারা সঙ্গে বান্ধবী শুভ্রা, তার বোন এবং তাদের দুই মেয়ে রওনা দিয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে।

জার্নীর শুরুতেই একটু ঝামেলা হয়েছিল জলির। তার দুই মেয়ের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে যা চোখে পড়ে প্রথম যখন তারা মায়ামিতে ল্যান্ড করে। কি করা তাড়াহুড়ো করে বার্থ সার্টিফিকেট জোগাড় করে পরে সমুদ্রপথে যাত্রা এবং ভালোভাবে এসে পৌছেছে বাহামায়।

জলির বাহামার ওপর বর্ণনা শোনার পর স্মৃতির পাতায় এসে হাজির হয়েছে বহু দিন আগে আমিও গিয়েছিলাম সেখানে। মনে হলো আমিও ছিলাম তাদের সঙ্গে সেই ভ্রমণে আজ সেই স্মৃতি যা না শেয়ার করলেই নয়। ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে যখন আমেরিকাতে আসেন, তখন প্রথম যে স্থানটিতে তিনি অবতরণ করেছিলেন, তা ছিল বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ।

কলম্বাস দ্বীপটিকে স্পেনের সম্পত্তি বলে দাবী করেন এবং এর নাম দেন সান সালবাদোর। ১৭১৭ সালে এটিকে ব্রিটিশ উপনিবেশ করা হয়। ১৯৫৯ সালে সম্পত্তির ওপর ভিত্তি করে পুরুষদের ভোটের অধিকার দেয়া হয়। ১৯৬২ সালে মহিলাদেরও ভোটের অধিকার দেয়া হয়। বাহামা দ্বীপপুঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে, কিউবা ও হিস্পানিওলা দ্বীপের উত্তরে অবস্থিত প্রায় ৭০০টি দ্বীপ ও হাজার খানেক ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত।

বাহামা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান, জলবায়ু ও ভূগোল এটিকে পর্যটকদের একটি জনপ্রিয় গন্তব্যস্থলে পরিণত করেছে। উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের কাছে অবস্থিত হওয়ায় সারা বছরই এখানকার জলবায়ু খুব মৃদু । এখানে নীল সমুদ্রের পাশে অনেক সুন্দর সুন্দর সমুদ্রসৈকত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আরও দূরের দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার লোক এখানে বেড়াতে আসে।

দেশটির রাজধানীর নাসাউ (Nassau)। এর সঙ্গে যুক্ত আরেকটি ছোট্ট দ্বীপের নাম হল প্যারাডাইজ আইল্যান্ড। দুটি দ্বীপের মাঝে এখন একটি সেতু হয়েছে। সেই সঙ্গে ফেরী সার্ভিসের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের সব কিছুই বাংলাদেশের মত তবে সাগরের বালু আর পানি ভিন্ন। বাহামার বীচগুলো বিখ্যাত তার নীল রঙের জন্য। নীলের এমন সৌন্দর্য অন্য কোথাও চোখে পড়েনা। এর কারণ হল, পৃথিবী’র সবচেয়ে বড় প্রবাল প্রাচীর বাহামায়। প্রবাল প্রাচীর বা দ্বীপের পানি এমনিতেই অনেক নীল হয় এবং এখানের সাগরের পানি সবচেয়ে বেশি পরিস্কার।

জলির সদ্য ভ্রমণ আমার মনকেও উড়িয়ে নিয়ে গেলো সেখানে। জলি এবং শুভ্রার পরিবার এ মনোমুগ্ধকর দেশ ভ্রমণের সমাপ্তি টেনে ফিরে এসেছে সেন্ট্রাল ফ্লোরিডায়। এবার কী ওয়েস্ট (Key West) যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে তারা যেখানে আমি এবং আমার সহধর্মীনি মারিয়া কোন এক সময় গিয়েছিলাম।

এপ্রিলের এক রোদের সকাল, সূর্যের প্রচণ্ড তাপ তবুও তখনো সহ্যর সীমা ছাড়ায়নি। এমনি এক সকালে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম কী ওয়েস্টের উদ্দেশ্যে। মায়ামি শহরের পাশ ঘেঁষে আমাদের গাড়ি চলেছিল ৫০/৫৫ মাইল গতিতে সেদিন। জলি এবং সুভ্রার পরিবার বড় একটি গাড়িতে করে সেই একইভাবে দিয়েছে রওনা কী ওয়েস্টের দিকে। জলির ফোনালাপনে আমার মনে সেই পুরনো স্মৃতি এসে আবারও হাজির, মনে হচ্ছে এই তো সেদিন -কিছু দূর এগোতেই দৃষ্টিতে পড়েছিল চারদিকে অথই জলরাশির।

জনমানবহীন মহাসড়ক ধরে দূরে লক্ষ্য করেছিলাম, সরু লতাগুল্মের মতো কি যেন লেপ্টে আছে সাগরের সঙ্গে। মারিয়া বলেছিল এটা হচ্ছে সাত মাইল সেতু, এ নামেই এর পরিচয়; কী ওয়েস্ট হচ্ছে উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমের শেষ সীমান্ত মেক্সিকো বে, ক্যারিবিয়ান সাগর আর আটলান্টিকের যুক্তস্থলে দক্ষিণ ফ্লোরিডার দৃষ্টি নন্দিন একটি দ্বীপ।

এখানে অবস্থিত মেলুরি স্কয়ার নামে এক পৃথিবী বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রকে বলা হয় সূর্যাস্তের পর আলো আঁধারের এক টুকরো দ্বীপ। এখানে জেসারি টেইলরের ঐতিহাসিক স্টেট পার্ক থেকে সূর্যাস্ত দেখার আয়োজনে বিখ্যাত ক্রুজ লাইন ও হেলিকপ্টারে সূর্যাস্ত দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। আমেরিকা যখন ব্রিটিশদের শাসনে ছিল, তখন কী ওয়েস্ট দ্বীপটি স্প্যানিশ জেলেদের অধীনে ছিল। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের সময়কালে দ্বীপটির সংস্কার হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এখানে গড়ে ওঠে আমেরিকান সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। আটলান্টিকের বিশাল জলরাশির প্রায় নব্বই মাইল ওপারে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেশ কিউবা, কী ওয়েস্ট দ্বীপ থেকে কিউবার রাজধানী হাভানা ঘুরে আসার ব্যবস্থা রয়েছে ক্রুজ লাইনের মাধ্যমে।

কী ওয়েস্টে গিয়ে হেমিংওয়ের বাড়ি না দেখলে জার্নীর সমাপ্তি হবে না, তাই আমাদের মত জলি এবং শুভ্রার পরিবারও গিয়েছে সেখানে। আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে (২১ জুলাই ১৮৯৯ - ২ জুলাই ১৯৬১) ছিলেন একজন মার্কিন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে তিনি তাঁর অধিকাংশ সাহিত্যকর্ম রচনা করেছিলেন এবং ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ১৯৬১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। জলিদের জার্নী শেষ, এবার বাড়ি ফেরার পালা। মায়ামি এয়ার পোর্টে সময় মত এসেছে এবং ল্যাগেজ চেক করেছে। হঠাৎ এয়ার পোর্টের ডিসপ্লেতে দেখে প্লেন ডিলে। এদিকে সন্ধ্যা শেষ হয়ে মিড নাইটে পরিনত হয়েছে। কোন খবর নেই সব কিছু চুপচাপ।

জলি একটু কিউরিয়াস হয়ে উপরে গেলো দেখতে কোন লেটেস্ট খবর আছে কিনা জানার জন্য। ওমা যেয়ে দেখে প্লেন উড়েছে তাদেরকে ফেলে! এমন ঘটনা ঘটতে পারে তাও আমেরিকায়? বিশ্বাস হতেও তো কষ্ট হবার কথা। কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতেই তারা বিরক্তিকর ব্যবহার করে পুরো বিষয়টি উপেক্ষা করে চলে গেলো। যাবার বেলা বলে নেক্সট ফ্লাইটে তোমাদের যাবার ব্যবস্থা। জলি বলে মানে? বলে দুইদিন পর তোমাদের যেতে হবে। জলি বলে দুইদিন থাকা,খাওয়া,গাড়ি প্লাস বাচ্চাদের স্কুল কি হবে এসবের? তারা বলে তোমাদের ব্যাপার। প্রচন্ড ঝগড়া শেষে পুলিশের আগমন। পুলিশ সব শুনে জানতে পারে যে এই এয়ার লাইন খুব সস্তায় টিকিট বিক্রি করে যার কারনে অনেকে এদের টিকিট কেনে এবং সমস্যার পড়ে কোন না কোন ভাবে। এয়ার লাইন স্পিরিটের (Spirit) সস্তা টিকিট বিধায় ক্যাপাসিটির বেশি টিকিট বিক্রি করেছে। পরে সবাইকে একসঙ্গে না নিতে পেরে ১৯ জন যাত্রী ফেলে প্লেন ছেড়ে গিয়েছে। ঘটনা শোনার পর বাংলাদেশের গুলিস্থানের কথা মনে পড়ে গেলো।

বাংলাদেশে এমনটি ঘটে থাকে যানতাম। আমেরিকায় তাও এয়ার লাইনে এমনটি ঘটতে পারে তা জানা ছিলো না। হঠাৎ রাত দুপুরে জলির ফোন পেয়ে ঘটনায় জড়িয়ে পড়ি। জলির থেকে সব শোনার পর বললাম তাকে নতুন করে টিকিট কিনে বাড়ি ফিরে যাও। পরে লস অ্যাঞ্জেলসে গিয়ে এয়ার লাইন স্পিরিটের বিরুদ্ধে সোজা কেস করতে হবে। আজ সন্ধ্যায় জলি ফোন করেছে। তার থেকে জানলাম যে এয়ার লাইন স্পিরিট জলি এবং শুভ্রাদের টিকিটের পয়সা ফেরত দিয়েছে। আমি জলিকে নতুন করে কেস করতে উপদেশ দিয়েছি। যাত্রী ছাড়া লাগেজ নিয়ে প্লেন ফ্লাই করা এবং ক্যাপাসিটির বেশি টিকিট বিক্রি করার অপরাধের জন্য। জলি আহম্মেদ আমার বোন থাকে আমেরিকার, কার্লিফোনিয়ার, লস অ্যাঞ্জেলসের উডহিলে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×