নিপীড়ন: বাংলাদেশ বনাম ইউরোপ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৪ মে ২০১৯, ১৭:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

নিপীড়ন: বাংলাদেশ বনাম ইউরোপ। ছবি: যুগান্তর
নিপীড়ন: বাংলাদেশ বনাম ইউরোপ। ছবি: যুগান্তর

ভালোবাসা মানব জাতির এক অনুভূতি যার মধ্যে নাই ভেদাভেদ, নাই বয়সের পার্থক্য, নাই বাঁধাবিঘ্ন, নাই কষ্ট, নাই দুঃখ। ভালোবাসার মধ্যে রয়েছে শুধু ভালোবাসা। কিন্তু যদি ভালোবাসাতে বিনিময় বা শর্তাবলী যুক্ত হয় তখন ভালোবাসা শর্তাধীন। ভালোবাসা কারে কয় এবং তা কেন যাতনা ময়। এর ওপর নানা ধরনের মতামত রয়েছে।

আমি ইউরোপের নিপীড়ন, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এবং ভালোবাসার জগৎ থেকে তুলে ধরব স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, পুরুষের সঙ্গে পুরুষ, নারীর সঙ্গে নারী এবং দ্বি-লিঙ্গের সম্পর্ক নিয়ে। ইউরোপের বাইরের জগতের সমাজ কীভাবে এসব সম্পর্কের মূল্যায়ন করে বা আদৌ এসব সম্পর্কের স্বীকৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা আছে কি? ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা বিষয়টি বেশ পরিচিত সবার কাছে। আমার প্রশ্ন কাকে, কেন এবং কী কারণে ভালো লাগে? ভালোলাগার পর বন্ধুত্বের সম্পর্ক সৃষ্ট হতে পারে এবং তা হতে পারে পুরুষ এবং মহিলার সঙ্গে; তাতে কোন সমস্যা নাই। কারণ জাস্ট ফ্রেন্ড। কারো প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কি ভালোবাসার লক্ষণ? নাকি চেহারা, সৌন্দর্য, ব্যবহার বা রূপে গুণে কাউকে ভালো লাগা এবং পরে ভালোলাগা থেকে অন্তরঙ্গ মিলন ভালোবাসার লক্ষণ?

ইউরোপে অনেক রকম বন্ধুত্ব, ভালোলাগা, ভালোবাসা এবং অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। সহনশীলতা এবং গ্রহণযোগ্যতার কারণে সমাজ, ধর্ম বা রাষ্ট্রের থেকে তেমন কোন বাধাবিঘ্ন নাই। পৃথিবীর সর্বত্রে যদি একই ধরনের শর্তাবলী থাকত তাহলে কেমন দেখাত জানি না। তবে ইউরোপের খোলামেলা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এবং ইউরোপের বাইরের নিষিদ্ধ সম্পর্কের পার্থক্য শুধু সহনশীলতা এবং গ্রহণযোগ্যতা।

প্রসঙ্গত বর্তমান আরব, আফগানিস্থান, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া থেকে প্রচুর ছেলে-মেয়ে ইউরোপে আশ্রয় নিচ্ছে পুরুষের সঙ্গে পুরুষ এবং নারীর সঙ্গে নারীর সম্পর্কের কারণে। আমি চেষ্টা করব বর্ণনা দিতে বর্তমান ইউরোপের নানা ধরনের রিলেশন যেমন সামাজিক মিডিয়া, সর্ট এবং লং ডিস্টান্স, লিভিং অ্যাপার্ট, কর্ম জীবন এবং ফ্যামিলি লাইফ সম্পর্কে।

সামাজিক ও মিডিয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক: ডিজিটাল যুগে পরস্পর পরস্পরের সিভি দেখে যোগাযোগ করা থেকে ডেটিং পরে পছন্দ থেকে ভালোলাগা এবং অন্তরঙ্গ সম্পর্ক শেষে ভালোবাসা ও সংসার।

সর্ট এবং লং ডিস্টান্স বা লিভিং অ্যাপার্ট সম্পর্ক: এরা একে ওপরের প্রতি আস্তা রেখেই আলাদা আলাদা থাকতে পছন্দ করে। যার যার মত করে জীবনযাপন করে, এদের অন্তরঙ্গ সম্পর্কই যৌথ সম্পর্ক। এ ধরণের সম্পর্ক হবার নানা কারণ থাকতে পারে। ছুটিতে কোথাও দেখা, সামাজিক মিডিয়া বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা। এখানেও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থেকে ভালোলাগা পরে তা ভালোবাসায় পরিণত হয়ে থাকে। এই গ্রুপে যারা জীবনযাপন করে তারা টাইম টু টাইম অন্তরঙ্গের সমন্বয় এবং এক সঙ্গে ছুটি কাটানো, প্লান অনুযায়ী বা অকেশনালি রিলেশন বজায় রাখে।

কর্ম জীবনের সম্পর্ক: এখানে কাজে বা অফিসে একে ওপরের সঙ্গে যোগাযোগ, পরে পছন্দ থেকে ভালোলাগা। শেষে ভালোবাসা এবং অন্তরঙ্গের মিলন যা ফ্যামিলি লাইফে পরিণত হয়। এদের সম্পর্ক বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিরিয়াস হয়ে থাকে।

ফ্যামিলি লাইফ সম্পর্ক: যারা চেনা জানা, প্রেমপ্রীতি, ভালোবাসা এবং পরে বিয়ে বা একত্রে বাস এবং স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে এক সঙ্গে থাকে। এদের সংখ্যা ৩০% বললে ভুল হবে না। ফ্যামিলি লাইফে সবার গোলস (goals) এবং অবজেক্টিভস এক এবং অভিন্ন।

এর পরও রয়েছে বড় আকারে এক গ্রুপ যারা সমকামী এবং এদের মধ্যে অনেকে এক সঙ্গে বসবাস করে। আবার অনেকে সিঙ্গেলভাবে বা ওপরের কোন এক গ্রুপের মধ্যে পড়বে এমন ভাবে বসবাস করছে। এদের কথা “আমার ওপর কেউ খবরদারি করবে, তা আমি মানতে পারি না” যার কারণে অনেকে সিঙ্গেল থাকতে পছন্দ করে এবং এদের সংখ্যাও কম নয় বর্তমানে।

ইউরোপে অন্তরঙ্গ মিলনে কম্প্রমাইজ নাই। অন্তরঙ্গ সম্পর্ক যদি ভালো না হয় তখন তারা নতুন পার্টনার খুঁজতে শুরু করে। বাংলাদেশে থাকতে শুনেছি অর্থ না থাকলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়, এখানে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ভালো না হলে ভালোবাসা জীবন থেকে পালায়।

অর্থে যেহেতু এরা গরীব নয় তাই এটা খুব একটা বিষয় না সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষেত্রে। বিয়েও এদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, তবে এরা এদের বিশ্বাসের প্রতি খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অনেকে বিয়ে করে যখন তাদের ছেলে-মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক। অনেকে বিয়ে করে আবার অনেকে কখনোই বিয়ে করে না।

তারা মনে করে, যেহেতু অন্তরঙ্গ সম্পর্কে বাঁধা নাই তাই বিয়ে জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। ধর্মীয় কারণে কিছু সংখ্যক গ্রুপ বিয়ে করে ছেলে-মেয়ে হবার আগে যা তাদের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। ভালোবাসা, অন্তরঙ্গ মিলন, ভালোলাগা এবং বিশ্বাসের সমন্বয়ে এরা জীবনের ভ্যালু মূল্যায়ন করে থাকে।

আমরা যারা ফ্যামিলি লাইফ গ্রুপের মাঝে আছি, কি অবস্থা আমাদের জীবনের? আমাদের কাছে শুধু নিজেদের জীবনই বড় নয়। আমরা একে অপরের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে একসঙ্গে বসবাস করছি। জটিলতা বা সমস্যা যে নাই তা নয়, তার পরও ম্যানেজ করে চলতে অভ্যস্ত।

অনেক সময় মনে পড়ে সেই পুরনো কথা- “নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস”। তাই যখন দেখি বন্ধু-বান্ধব নতুন নতুন পার্নাটার নিয়ে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে আমাদের মনে হয় যে তারা বেশ আছে। নিত্য নতুন পার্টনার আহ কী-না মজা!

ভাবনায় আসে যদি সিঙ্গেল হতাম তাহলে হয়তবা তাদের মত যা খুশি করতে পারতাম। খনিকের তরে এমনটি ভাবনা আসতেই পারে। তবে আমাদের জীবন, পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আমাদেরকে ধরে রেখেছে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার মধ্যে, যেখানে অন্তরঙ্গ মিলন পরিবারের মধ্যে এক স্বর্গীয় প্রাপ্তি।

পাঠক, নিশ্চয় জানতে মন চায় এদের ভালোবাসার গভীরতা কতটুকু? শীতের দেশে একটি জিনিস বেশ লক্ষ্যণীয় তা হলো- ঠান্ডায় যখন লেকগুলো বরফে জমে যায়, মনে হয় পুরো লেক জমে আছে। কিন্তু মাত্র চার ইঞ্চি বরফ পানির ওপরে জমা। তারপর চার ইঞ্চি নিচে লেকের পুরোটাই কিন্তু পানিতে পরিপূর্ণ। অন্তরঙ্গ সম্পর্কটা চার ইঞ্চি বরফের মত নয়। দেহের ভেতরের বাকি অংশ রক্তে মাংসে তৈরি তাই নিশ্চিত এদের মধ্যেও রয়েছে ভালোলাগা এবং ভালোবাসা।

তবে ভালোবাসার বিচ্ছেদে মনে হয় হৃদয় এক বরফ জমা লেক। সূর্য যেমন মেঘে ঢাকা পড়ে ঠিক ক্ষণিকের তরে বিচ্ছেদে তেমন অন্ধকার নেমে আসে। এটা হয়তো জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অতটা নয় যে জীবন থেমে যায়, তাই এরা থেমে নাই।

অন্তরঙ্গ মিলন জীবনের একটি চাহিদা, যার গুরুত্ব রয়েছে। যদি মনের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের মিল না হয়, তার জন্য ঘৃণা নয়, বরং খোঁজে নতুন পার্টনার। এদের জীবনে এনজয় করাটাকে এরা বেশি পছন্দ করে। তাই হয়ত এদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এবং ভালোবাসা একটু অন্যরকম।

এদের যা পছন্দ তা হয়তো অনেকের কাছে অপছন্দ। মরতে তো একদিন হবেই, এটা নিশ্চিত। তবে কবে মৃত্যু হবে তা অনিশ্চিত। তাই বলে কি আমরা স্থির হয়ে বসে আছি মরার ভয়ে? হয়তো ইউরোপের মানব জীবন প্রতিটি মুহুর্ত এনজয় করার জন্যই তাদের জীবনকে স্বাবাভিক ভাবে বেছে নিয়েছে জটিলতা ছাড়া।

তাই ভালোলাগা বা ভালোবাসাকে সহজ করে নিয়েছে। অন্তরঙ্গ মিলন দেহের একটি বিশেষ অনুভূতি যা উপভোগ্য হিসাবে বেছে নিয়েছে। যা মিউচুয়াল রেসপেক্ট, সভ্যতা এবং মানবতার ছোয়ায় ভরা এবং এরা তাকে অটল করে ধরে রেখেছে। তাই আর যাই হোক মনুষ্যত্বের অবক্ষয় হয়নি এখনও।

এরা স্বার্থপর হতে পারে। এরা মনে কষ্ট দিতে পারে এবং কষ্ট সহ্য করতেও পারে। এরা আঘাত দিয়ে দূরে চলে যেতে পারে। এরা ভুলে যেতে পারে। তবে এরা এসিড মেরে, আগুনে পুড়িয়ে, ধর্ষণ করে আরেকটি জীবন ধ্বংস করে না বা পশুর মত ব্যবহার করে না। এরা তিলে তিলে নিজের স্বার্থে অন্যকে ধ্বংস করে না। এরা পাছে লোকে কিছু বলে তারও ধার ধারে না।

তবে হ্যাঁ এদের মাঝেও রয়েছে মনুষ্যত্বের অবক্ষয় বা মানুষ হয়ে দানবের মত ব্যবহার করে এমন ধরণের কেউ, যারা অসুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী একদল দানব। তাই দানবের মত নয়, অন্তরঙ্গ মিলন এবং ভালোবাসা যেন মানবের মত হয়। কারণ অন্তরঙ্গ মিলন মানব জাতির জন্য স্বর্গীয় আশীর্বাদ এবং ভালোবাসা।

লেখক: রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×