পথে হলো দেখা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৮ মে ২০১৯, ১০:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

দেখা

অনেক দিন আগের কথা, ১৯৮৭ সাল ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখ। পনেরো তারিখ থেকে খ্রীস্টমাসের ছুটি শুরু হবে। আমি তার দু’দিন আগেই ছুটি নিয়েছি দেশে যেতে হবে।

স্টকহোম আরলান্ডা বিমান বন্দর থেকে এরোফ্লটে ফ্লাই করে বেলগ্রেড, পরে কোলকাতা দমদম বিমানবন্দর এবং শেষে ঢাকা ফাইনাল ডেস্টিনেশন। এমনভাবে টিকিট কিনেছি সস্তার কারণে। সন্ধ্যা আটটা দশ মিনিটে প্লেন ছাড়লো আরলান্ডা থেকে।

পাশেই বসেছে একটি মেয়ে আমার সমবয়সি হবে, নাম আনা সিকোলি, দেশের বাড়ি বেলগ্রেডে। এসেছিল ঘুরতে স্টকহোমে। বেড়ানো শেষে ফিরছে তার দেশে। এমনিতেই স্বল্প সময়ের জার্নী তারপর আলাপ আলোচনায় সময় দ্রুততার সঙ্গে কেটে গেলো। ল্যান্ড করার কয়েক মিনিট আগেই এরোফ্লট কর্তৃপক্ষ জানালো পরবর্তী প্লেন ছাড়তে কমপক্ষে ২৪ ঘন্টা দেরি হবে। তাই রাতে বেলগ্রেডে থাকতে হবে। এরোফ্লট কর্তৃপক্ষ হোটেল এবং ঘোরাঘুরিসহ সব ধরনের দায়ভার নেবে বলে জানিয়ে দিলো।

আনা চলে যাওয়ার সময় বলে গেলো যদি চাও তবে আমি তোমাকে বেলগ্রেড ঘুরতে সঙ্গ দেবো। রাজি হয়ে টেলিফোন নাম্বার নিয়ে নিলাম। বিদায়ে আনা একটু মুচকি হাসি দিলো। হাসি দেখেছি জীবনে অনেক তবে এমনটি দেখিনি অতীতে। বিমানবন্দর থেকে সোজা বাসে করে হোটেলে নিয়ে এলো আমাদের। রাতের ডিনার শেষে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে ব্রেকফাস্ট শেষ করতেই এরোফ্লট কর্তৃপক্ষ থেকে খবর এলো পাইলটরা ধর্মঘট করেছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য।

অবাক কান্ড, মিখাইল সের্গেইভিচ গর্বাচেভের (Mikhail Sergeyevich Gorbachev) দেশের পাইলটদের হরতাল! ভাবনায় পড়লাম, কি করা! রিসিপশনে গিয়ে ফোন করলাম আনা সিকোলিকে। কিছুক্ষণ পর আনা এসে হাজির এবং আমাকে নিয়ে গাড়িতে করে ঘুরতে বর্ণনা দিলো দানিউব (Danube River) নদী যা পরে মিশেছে কৃষ্ণ সাগরে (black sea) সেখানে নিয়ে যাবে! ভাবছি সামান্য ক্ষণিকের পরিচয়ে কেউ এত কাছের হতে পারে, তাও ভিনদেশি এক মেয়ে। বয়সও খুব বেশি না, সবই মিরাকেলের মত মনে হচ্ছে। হঠাৎ মনের মধ্যে ঝলক পড়লো নাতো? নেহায়েত আতিথেয়তা, নাকি অন্য কোন মতলব?

এত ভেবে কি হবে -ঘোরাঘুরি করতে করতে দুপুর গড়িয়ে গেলো। লাঞ্চ শেষে নিয়ে গেলো দানিউব (Danube River) নদীর পাড়ে, যা বয়ে চলেছে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড (বর্তমান সার্বিয়া), শহরের মধ্যদিয়ে এবং মিশেছে গিয়ে সোজা কৃষ্ণ সাগরে। কৃষ্ণ সাগর ভূমধ্য সাগরের এক সংলগ্ন সাগর এবং এর আশেপাশের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন, তুরস্ক, বুলগেরিয়া ইত্যাদি। নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ দুজনে হাঁটাহাঁটির সঙ্গে চোখ পড়ে গেল দাদার বয়সি এক ভদ্রলোক সোজা শুয়ে আছে বালুর ওপর। তাঁকে ঘিরে বসে আছে নিঃশব্দে নীরবে তিনজন বাচ্চা। বয়স আনুমানিক আট, দশ এবং তেরো এর মধ্যে।

আনা একটু কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো কি ব্যাপার কি হয়েছে? যার বয়স তেরো হবে বললো দাদুভাই আমাদের সঙ্গে মরার ভান করে খেলা করতো প্রায়ই, যখনই আমাদের সঙ্গে তিনি এখানে আসতেন। কিন্তু আজ সত্যি সত্যি মারা গেছেন। এখন দাদুভাইকে ভাইকিংদের (Viking) মত করে নৌকায় আগুন জ্বালিয়ে সাগরে ভাসিয়ে দিতে হবে। দাদুভাই এ কথা আমাদের তাঁর মৃত্যুর আগেই বলে গেছেন। (ভাইকিং (Viking) বলতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রচারী ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দলকে বোঝায়, যারা ৮ম শতক থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত ইউরোপের এক বিরাট এলাকা জুড়ে লুটতরাজ চালায় ও বসতি স্থাপন করে।

এদেরকে নর্থম্যান বলা হয়। ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভাইকিংরা প্রথম ইউরোপে বসবাস করতে শুরু করে এবং সম্ভবত প্রথম ইউরোপীয় জাতি হিসেবে ১০০০ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা মহাদেশ আবিস্কার করে। আইসল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অনেক গাঁথায় ভাইকিংদের শৌর্য-বীর্যের কথা বলা হয়েছে।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মানুষেরা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করলে এদের অভিযান ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে এবং পরবর্তিতে বিলুপ্ত হয়)। তাদের দাদুভাইকে ভাইকিং স্টাইলে ছোট্ট একটি নৌকায় তুলে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। সেই নৌকা আগুনের ফোয়ারায় দাউ দাউ করে জ্বলবে আর ভাসতে ভাসতে চলে যাবে দানিউব নদী দিয়ে কৃষ্ণ সাগরে। আনার মুখে সেই ছোট্ট মেয়ের গল্প শুনতে শুনতে ফিরে এলাম হোটেলে। কি অপুর্ব পরিকল্পনা মেয়েটির তার দাদুভাইকে নিয়ে। হয়ত তাদের দাদুভাই কখনও বলেছিলেন গল্পচ্ছলে ভাইকিং কি এবং কি হতো তাদের মৃত্যু হলে। সারাদিন আনার সঙ্গে ঘোরাঘুরি শেষে ফিরেছি হোটেলে। এক ক্ষণিকের পরিচিত রমণী আনা সিকোলির সঙ্গে ঘোরাঘুরি যা ছিল এক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত।

হোটেলে ঢুকতেই এরোফ্লট কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলো ‘আজ রাত একটায় প্লেন ছাড়বে দমদম বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে, অতএব আমাকে রেডি হতে হবে’। আনাকে বললাম ‘আমার যাওয়ার সময় হয়েছে এবার বিদায় নেয়ার পালা’। হঠাৎ জড়িয়ে ধরেছে সে আমাকে, মনে হচ্ছে হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের এক মিলনায়তন। আনার চোখে জল এসেছে, এতো দেখছি ভালোবাসার জল! আমি কি তাহলে যাওয়ার বেলা কিছু রেখে গেলাম তার হৃদয়ে? চোখের ইশারায় আনা কি বলে চলে গেলো! বাঁকি রাত এবং সকালের কয়েক ঘন্টা কেটে গেলো প্লেনে, পরে ল্যান্ডিং করলাম কোলকাতা দমদম বিমান বন্দরে।

ট্রানজিটে বসে আছি ঢাকার ফ্লাইটের জন্য। হঠাৎ শুনতে পেলাম সুইডিস ব্যান্ড ‘Europe এর’ গানের সুর ‘We're leaving together,..It's the final countdown’. হারিয়ে গিয়েছিলাম কিছুক্ষণের জন্য গানের ভুবনে। চেকিং পর্ব শেষ করে প্লেনে ঢোকার কিছুক্ষণ পরে ল্যান্ড করলাম ঢাকা বিমানবন্দরে। বাবা এবং ছোট ভাই শাহিন এসেছে আমাকে রিসিভ করতে। ১৯৮৫ সালের এক বৈশাখে ছেড়েছিলাম বাংলাদেশ। ১৯৮৭ সালের শীতের বিকেলে দুই বছর পর আবার এসেছি ফিরে নিজের মাতৃভূমিতে। বেশ লাগছে মন্দ নয়। গাড়ি ছেড়ে দিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে, এখন শুধু অপেক্ষা আর প্রতিক্ষার পালা- কখন দেখব মাকে এবং সবাইকে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×