পারেনি মাকে একা ফেলে রাখতে, মা লিখেছে বাড়ি যেতে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৬ মে ২০১৯, ১৩:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

মা

নদী পার হয়ে মায়ের ডাকে সাড়া দিয়েছিল সেই মহা মানুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

সবার ধারণা হয়তো ইতিহাস ইতি টেনেছে সেখানে, না ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে এবং নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হয়েছে। অবিশ্বাস হওয়ার কথা কিন্তু না, এ এক অঢেল ভালোবাসার কাহিনী যা সাক্ষী হয়ে রয়েছে আমার এক বন্ধুর হৃদয়ে। ইতিহাস সে তো ঘটে যাওয়া ঘটনার সাক্ষী।

ঝরে পড়া বকুল ফুলের মতো বন্ধুর মুখ দিয়ে ঝরছে তার পুরনো কথাগুলো। আমি দূর হতে তার কথা শুনেছি আর মুগ্ধ হয়ে শুধু ভেবেছি। সেই সঙ্গে আমার চোখে সাগরের ঢেউ বইতে শুরু করেছে যার আর শেষ নেই। রমজান মাসে সে তার মার কথা বলছে আজকের মা দিবসে। মাকে হারিয়েছি আমিও এবং সে হারানোর স্মৃতি এক হয়েছে আমাদের দু’জনার আলোচনায় - মা দিবসে মাকে স্বরণ করে হৃদয়ের কিছু কথা।

মনের কথা শেয়ার করতে ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসে যা ছুঁয়েছে আমার মনকে। পড়েছি এক সঙ্গে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজে ১৯৮৩-৮৪ সালে। আমি ছেড়েছি দেশ সেই যে কবে। ওদিকে বন্ধু দেশে শেষ করেছে এমবিবিএস (MBBS)। তারপর পাড়ি দেয় নিউজিল্যান্ডে পোস্ট গ্রাজুয়েশন, স্থায়ীভাবে বসবাস এবং পেশাগত কর্মজীবন শুরু করার এক স্বপ্নে। অভিবাসন খ্যাত দেশ নিউজিল্যান্ড বসবাসের সুযোগ দিয়ে রাজ্যভিত্তিক নতুন ভিসা চালু করে দেশটির অভিবাসন বিভাগ।

যে বিশ্বাসে ঢুকেছিল নিউজিল্যান্ডে তা বাস্তবে পরিনিত হয়নি। পরে অস্ট্রেলিয়ায় এসে অ্যাবরিজিনদের ডাক্তার হিসেবে চাকরি শুরু করে। (অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য লক্ষনীয়।

এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক রীতি-নীতি রয়েছে। তাই ইউরোপের বাইরের দেশের ডাক্তাররা সাধারণত আদিবাসী অ্যাবরিজিনদের চিকিৎসক হিসেবে চাকুরি করে কারণ বর্ণ বৈষম্য)। কিছুদিন যেতেই চিঠি এসেছে, কার চিঠি? মায়ের চিঠি, কি লিখেছে? মা ভীষন অসুস্থ বাড়ি যেতে হবে। পরিবারের ছোট ছেলে, বাবা-মার আদরের। হয়তো মনের অজান্তেই ভালোবাসার গভীরতা ছিল অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। তাছাড়া বাবা মারা গেছেন আগেই, বড় ভাই একটু দূরে চলে গেছে মায়ের কাছ থেকে। সবার অনুপস্থিতিতে মার অসুস্থতার খবর তাকে ধরে রাখতে পারেনি অস্ট্রেলিয়ার জীবন।

সব ফেলে ফিরে এসেছে মায়ের ছেলে মায়ের কোলে। মার কিডনিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বড় বড় ডাক্তাররা তার মাকে চিকিৎসার সঙ্গে ভয় ঢুকিয়ে দিনে দিনে তিলে তিলে অসুস্থ করেছে, সঙ্গে দূর্বল করেছে তাঁর মনকে। কি করা! কোন উপায় না পেয়ে শেষে মাকে নিয়ে ভারতের চেন্নাই নিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে থাকে। (ভারতের তামিল নাড়ু রাজ্যের রাজধানী এবং দেশটির চতুর্থ বৃহত্তম মেট্রোপলিটন শহর। এটি বঙ্গোপসাগরের করমন্ডল উপকূলে অবস্থিত।) বলতে গেলে মাকে মৃত্যুর পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। এদিকে সময় তার গতিতে চলছে, বছর পার হয়েছে। দেশে মার সঙ্গে থাকার সময় তাঁর অনুরোধে সে বিয়েও করেছে।

মা দিনে দিনে সুস্থ হচ্ছে তাই সে প্ল্যান করেছে পুনরায় অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাওয়ার। সহধর্মীনিকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে সে তার সেই পুরনো পেশায় যোগ দিয়েছে। এদিকে দেশ থেকে আবার খবর আসছে দিনের পর দিন মার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটার। বন্ধু মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। এক সময় সে অস্ট্রেলিয়ায় তাবলীগে যোগ দেয় মেডিটেশন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে। এসময় এক মৌলানা বন্ধুর মনের খবর জানতে পেরে উপদেশ দেয় তাকে তার মায়ের কাছে ফিরে আসতে।

বন্ধু তার সহধর্মীনিকে নিয়ে দেশে ফিরে আসে। স্ত্রীর পরিবার এবং বন্ধুর পরিবারের ধারণা ছিলো হয়তো ক্ষনিকের তরে এসেছে দেশে চলে যাবে শিগগির। বিশাল সম্পদের অধিকারী এ দুই পরিবার। বন্ধুর নিজের পরিবার ভেবেছিল সে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে আর দেশে আসবেনা ফিরে। অতএব পুরো সম্পদ মনের আনন্দে ভোগ-দখল করবে বাকিরা। কিন্তু সে আশার অবসান হতে চলেছে।

বন্ধুর নিজের আপনজনেরা তার স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে যোগ দিয়ে স্ত্রীকে ম্যানুপুলেট করতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ার সুযোগ সুবিধা, ক্যারিয়ার ফেলে মায়ের সেবায় দেশে হাঁটু গেড়েছে তা কেও মেনে নিতে পারছে না। তার সংসারে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে শুরু করে। হঠাৎ একদিন তার স্ত্রী সংসার ছেড়ে তার নিজের বাবা-মার বাড়ি চলে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় তাদের দুই ছেলেকে। এক দিকে ঘরে অসুস্থ মা অন্যদিকে প্রিয়জন এবং সন্তান, কি করা! মার অসুখে সবাই সরে যেতে শুরু করে একে একে শুধু সে ছাড়া।

সময় পার হয়ে চলছে, শুধু ক্যারিয়ার আর পরিবার নয়, মাকে দেখাশোনার দায়ভার এবং শেষে বাংলাদেশের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে শিক্ষা প্রশিক্ষণে জড়িয়ে পড়ে। (বয়সের কারণে সরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ হারিয়ে ফেলে)। ইতিমধ্যে বন্ধুর মা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। অভিমানী সহধর্মিনী ফেরেনি আজও তার কাছে। বন্ধুও নতুন করে আর বিয়ে করেনি। বড়ভাই-ভাবি বুঝতে শুরু করেছে এখন যে ভুল তারা করেছিল সেদিন যার কারণে একটি পরিবার ভালোবাসার ইতি টেনে আলাদাভাবে বসবাস করছে আজ অবধি। মাঝে মধ্যে বন্ধু তার ছেলেদের সঙ্গে দেখা করে।

এযুগে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে সন্তান তার দায়িত্ব পালন করবে এটাই আশা করেছিল বন্ধুর সহধর্মিনী। বিবেকের কাছে বন্ধু হার মানতে পারেনি তবে সহধর্মিনীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পরিবারের অন্যদের মত সেও মাকে দূর হতে ভালোবাসতে পারত, কিন্তু সে দেখেছে ছোটবেলায় তার বাবা তার দাদির জন্য কি করেছে। বাবার সেই অঢেল ভালোবাসা যা সে দেখেছিল তা ভোলেনি আজও। বন্ধু বেছে নিয়েছিল মায়ের বাকি জীবনের সময়টুকু তাঁর পাশে থাকতে। হয়ত সে বঞ্চিত হয়েছে স্ত্রী, পরিবার, সমাজ, ক্যারিয়ার থেকে।

হয়ত সে পারেনি ধরে রাখতে ক্ষনিকের ভালোবাসা এবং লোভ লালসাকে তাই হয়েছে অবহেলিত এবং লাঞ্ছিত স্ত্রীর কাছে। বন্ধু তার অর্থের ভান্ডার ঢেলে দিয়েছে স্ত্রীকে কিন্তু দিতে পারেনি তার আদর্শকে জলাঞ্জলি। বর্তমান সামাজিক ভালোবাসার কোরবানী দিয়েছে যা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষনীয়। বন্ধু পেশায় চিকিৎসক এবং মস্তবড় শিক্ষক। সে মনের আনন্দে তার প্রশিক্ষণ দিতে বাকি জীবনকে উৎসর্গ করতে নেমেছে। তবে তার মনে বড় ব্যথা যে সে তার পেশায় মনপুত শিক্ষা দিতে নানা বাধাবিঘ্নের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে প্রতিদিন।

কারণ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় চলে মালিকদের কথা মতো। বন্ধুর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দিয়ে মালা গেঁথে গেলাম তবে ফুলের নাম নিতে পারলাম না। কি দরকার নাম ঠিকানা দিয়ে? বর্ণনায় নাম ঠিকানা নতুন করে এলে হয়তো বন্ধুর জীবনে জ্বালা বাড়াবে বই কমবে না। তাই অনেক চিন্তা করে বেছে নিয়েছি বিষয়টি তুলে ধরতে যে, ভালো মানুষের সংখ্যা এখনও বেশি যার কারণে পৃথিবী ধ্বংস হয়নি আজও। বন্ধু- জানি তুমি মনের দিক দিয়ে ভালো নেই।

তবে যেখানেই থাকো জ্ঞানের আলো জ্বেলে যেও। তোমার জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলতে থাকবে এবং একদিন তুমি শেষ হয়ে যাবে সবার মতো। তবে পার্থক্য এটাই তোমার অবর্তমানেও আশেপাশে যারা আছে তারা অন্ধকারের ছোয়া পাবেনা। কারণ সে অন্ধকারকে তুমি আলোকিত করেছো। তোমাকে ভালোবাসি হৃদয় দিয়ে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×