বর্তমান যুগে এমন শিক্ষক কোথায় পাবো?

  রহমান মৃধা, বুদাপেস্ট (হাঙ্গেরি) থেকে ১৫ জুন ২০১৯, ১৮:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

গোপাল স্যার। ছবি: সংগৃহীত
গোপাল স্যার। ছবি: সংগৃহীত

কেউ আমাকে বলে না কী করতে হবে। আমি নিজে যা ভালো মনে করি তাই করি। কেউ আমাকে অনুপ্রেরণা দিবে এটা আমার কাম্যও নয়। আমি যখন নিজেই অনুপ্রাণিত হই তখন ভালো কিছু করতে চাই। আমি যদি নিজে নিজেকে ভালো না বাসি তবে অন্য কেউ বলবে না কোনোদিন ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’।

কারণ এমন একটি কথা বলতে দরকার সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। এসব কিনতে পাওয়া যায় না। এসব জোর করে বা লোকালয়ে খুঁজেও পাওয়া যায় না। এসব নিজের মধ্যে নিজে সৃষ্টি করতে হয়। যার হৃদয়ে আছে ভালোবাসা সেই জানে ভালোবাসতে। কারণ ভালোবাসা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন ভালোবাসার।

আমি দেশের শিক্ষা এবং শিক্ষকদের নিয়ে বেশ লিখেছি। অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনাও করেছি। কখনও শক্ত কখনও নরমভাবে সমালোচনাও হয়েছে। শিক্ষার অবনতির পেছনে বিভিন্ন কারণ জড়িত। তার মধ্যে শিক্ষকদের ভূমিকা এবং তাঁদের দোষ-গুণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়োগ করা, তাঁদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণদান এবং তাঁদের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সন্তানকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য বাবা-মার সচেতনতারও গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান সরকার তার সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে করে শিক্ষার মান উন্নত করা যায়।

পরিবর্তন আনতে দরকার সময়ের, ভালো পরিকল্পনার এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার। প্রতিটি ভালো কাজ কোনো না কোনোভাবে শুরু হয়। কোনো সময় তা সঠিক সময়ে হয়, কোনো সময় দেরিতে আবার কোনো সময় কিছুটা আগে। কোনো কিছুর যখন শুরু হয় তার শেষও হয় কোনো এক পর্যায়ে।

এইতো সেই দুই বছর আগের কথা। হঠাৎ আমার স্কুল জীবনের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের আর্থিক দুরাবস্থা দূর করতে দূরপরবাস থেকে সমাজ, দেশ ও বিদেশে নাড়া দিয়েছিলাম সাড়া পেতে। হয়তো এমনটিই ছিল নিয়তির খেলা। তাইতো গোপাল স্যারের অছিলায় শিক্ষার পরিবর্তন নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলাম যা মিরাকেল হয়ে আমাকেও বদলে দিয়েছে।

গোপাল স্যার কাউকে বলেননি তার কষ্টের কথা। বলেননি তাঁর অসহায় অবস্থার কথা। আমাকে কেউ কখনও জোর করেনি স্যারের জন্য কিছু করতে বা স্যারকে নিয়ে ভাবতে। বিবেক যখন তাড়া দিয়েছিল তখন সাড়া দিয়েছিল অন্তর আর অন্তর ছিল সুন্দর। তাই পেরেছিলাম কিছু করতে স্যারের জন্য সবাই মিলে। ৪০ বছর একটানা শিক্ষকতা করেছেন। জীবনে বিয়ে করেননি। এরপরে অবসরে। ভাঙাচোরা একটা কুঁড়ে ঘর। কারো কাছে হাত পাতেননি। করেননি মাথা নত। কাউকে পরোয়া করে কখনো কথাও বলেননি। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতায় স্যারকে একটা বাড়ি করে দেবো, স্যারকে রাজি করাতে কতোটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল তা আমি জানি। আমাদের ছিলো ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার কাছে স্যার নতি স্বীকার করেছিলেন।

আমরা মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলাধীন গঙ্গারামপুর হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা স্যারের জন্য যা করেছিলাম তার সামাজিক, নৈতিক ও আদর্শিক মূল্য ছিল অপরিসীম। স্যারের জন্য হৃদয় দিয়ে কিছু করার মধ্যে নিহিত ছিল একটি চিন্তা, একটি বিশ্বাস, একটি মূল্যবোধ, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি দর্শন ও একটি সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বহু শিক্ষক অসহায় জীবনযাপন করছেন। আমাদের দৃষ্টান্তমূলক কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে কোনো অসহায় শিক্ষকের ছাত্রছাত্রীরা যদি তাদের প্রিয় শিক্ষকের পাশে দাঁড়ায়, তাঁর মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে, তাহলেই আমাদের চিন্তা পুষ্টিলাভ করবে। আমাদের বিশ্বাস সুদৃঢ় ভিত্তি পাবে। সমাজে মূল্যবোধ বিকশিত হবে। মানুষের মধ্যে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার ভালোবাসার বন্ধন দিয়ে সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের দর্শন বাস্তবরূপ লাভ করবে। ফলশ্রুতিতে আমাদের প্রয়াস একটা সংস্কৃতির রূপ পরিগ্রহ করবে। আর সেই বাড়ির চাবি আরেকজন আদর্শ শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা সাধন কুমার ভট্টাচার্যের বিধবা স্ত্রী অর্চনা রানী ভট্টাচার্য গোপাল স্যারকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেটাও ছিল আরেকটি মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা। গোপাল স্যার এখন সেই বাড়িতে শুয়ে বসে সময় কাটান। তিনি ভালো আছেন এ খবর যখন পাই তখন মনের মধ্যে অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করে। একজন শিক্ষকের প্রতি তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসা হঠাৎ করে একদিনে গড়ে ওঠেনি বা ওঠে না। স্যার ৪০ বছর ধরে যে নিষ্ঠা ও সততা, কর্তব্য ও দায়িত্বশীলতা সহকারে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে এসেছেন সেটি ছিল তাঁর প্রতি তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার ভিত্তি। বর্তমান যুগে এমন শিক্ষক কোথায় পাবো?

দুই বছর পর ফিরে এসেছে সেই জুন মাস। কয়েকদিন ধরেই স্যারের কথা মনে পড়ছে। হঠাৎ স্যারকে নিয়ে একটি পোস্ট আমার এক ছোট ভাই জুলফিকার ফেসবুকে শেয়ার করেছে। সেটা পড়তেই মনে পড়ে গেল সেই ১৯৮২-৮৩ সালের কথা। আমি পড়েছি গঙ্গারামপুর স্কুলে গোপাল স্যারের কাছে।

ভাবনায় এসে গেল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকের কথা আবারও। কেমন শিক্ষাব্যবস্থা আমরা চাই আর সেরকম শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কেমন শিক্ষক প্রয়োজন? গোপাল স্যার আর সাধন স্যারের মতো হৃদয়বান শিক্ষক এখন কোথায়? আর সেরকম শিক্ষক ছাড়া কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন কি সম্ভব?

হাজারও প্রশ্নের মাঝে বসে আছি হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট বিমান বন্দরে। ঠিক তেমন একটি সময় হঠাৎ দেখা হলো বাংলাদেশের একটি টিমের সঙ্গে। তাঁরা সরকারি সফরে এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। ঘুরবেন কয়েকটি দেশ। সামান্য সময় কথা হলো। শুধু বলেছি, দেশের টাকায় ঘুরছেন, আশাকরি ভালো যা কিছু দেখে গেলেন একটু চেষ্টা করবেন দেশে গিয়ে তাকে কাজে লাগাতে।

এতক্ষণ মুখগুলো হাঁসিতে ছিল ভরা। যখনই দেশের কথা বললাম ঠিক তখনই মুখগুলো চুপসে গেল। তাঁরা দ্রুতই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সরকারি কর্মকর্তারা কেন নিজেদেরকে গুটিয়ে নিলেন তা আমি জানি না। সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব ও কর্তব্য কী এবং এসব কর্মকর্তা সে দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেন কিনা তা আমার জানা নেই।

তাঁরা যদি সে দায়িত্ব পালন করে থাকেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই জনগণের ভালোবাসা অর্জন করবেন। সেই ভালোবাসা তারা বুঝতে পারবেন অবসর জীবনে। গোপাল স্যার তাঁর ছাত্রছাত্রীদের খুঁজে বেড়াননি। ছাত্র-ছাত্রীরাই তাঁকে খুঁজে বেড়িয়েছে। এটি তাঁর অর্জন। সরকারি কর্মকর্তারাও যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন তাহলে তাঁরাও মানুষের ভালোবাসা পাবেন।

আর তাঁরা যদি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন তাহলে গোপাল স্যারের মতো হাজারো গোপাল স্যার তৈরি হবে। আর হাজারো গোপাল স্যার তৈরি হলে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে শিক্ষার্থীরা। আর জাতি পাবে আদর্শ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। সুতরাং আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা, আদর্শ শিক্ষক ও আদর্শ প্রশাসক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই আমরা বহুফুলের সমন্বয়ে একটি ফুলের মালা গেঁথে ভালোবাসার সেতু তৈরি করতে পারি।

রহমান মৃধা, বুদাপেস্ট (হাঙ্গেরি) থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×