লিসবন অপরূপ সৌন্দর্য্যময় এক মায়ার নগরী

  রাসেল আহমেদ, পর্তুগাল থেকে ১৬ জুন ২০১৯, ০৬:২০ | অনলাইন সংস্করণ

লিসবন

পর্তুগালের নাম শুনলে মনে পড়ে, তাদের গৌরবান্বিত অতিতের কথা। পর্তুগিজরা একসময় অর্ধেকের বেশি পৃথিবী শাসন করেছে। এশিয়া থেকে আফ্রিকা এবং সুদূর আমেরিকা পর্যন্ত তাদের শাসন বিস্তৃত ছিল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সম্রাজ্ঞের অধিপতি ছিল এই পর্তুগিজরা।

পর্তুগালের রাজধানী শহর ও বৃহত্তম নগরী লিসবন যা আটলান্টিক মহাসাগর ও টাগুস নদীর র্তীরে অবস্থিত। লিসবন শহরটি মূলত ৭ টি বড় বড় পাহাড় নিয়ে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা গঠিত আধুনিক এক শহর। তাই এ শহর অনেকের কাছে সেভেন হিল সিটি নামেও পরিচিত।

পর্তুগিজ নাবিক ও আবিষ্কারক ভাসকো দা গামা ১৪৯৭ সালের জুন মাসে, লিসবনের গা ঘেঁসে বয়ে চলা টাগুস নদী থেকে যাত্রা শুরু করে ১৪৯৮ সালে প্রথমবারের মতো দুর্যোগপূর্ন দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল পাড়ি দিয়ে ইন্ডিয়া যাওয়ার পথ আবিষ্কার করেছিল। তার সে আবিষ্কার পর্তুগিজদের জন্য বিশাল সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল। ইন্ডিয়ান মসলার বানিজ্য ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করলো তাদের অর্থনীতিতে। নিমিষেই খুলে গিয়েছিল তৎকালীন অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল একটি জাতির সম্ভাবনার দ্বার। অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে গিয়েছিল তাদের ভাগ্যের চাকা।

লিসবনের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় হলো গ্রাসায় অবস্থিত, যেখান থেকে পুরো লিসবন ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত দেখা যায়। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন শহর হল এটি, ইতিহাস বলে গ্রিসের রাজধানী এথেন্স এর পরে লিসবনের অবস্থান। যা ইতালির রোম শহরেরও আগে স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে এ শহরে ৬ লাখের ও বেশি মানুষের বসবাস এবং এটি একটি মাল্টি কালচারাল শহর যেখানে বিশ্বের ৯৭ টির বেশি দেশের মানুষ বসবাস করে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০০ বছর আগে প্রথম এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল তাই এ শহরে অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ১৫ টির বেশি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান রয়েছে পর্তুগালে তাই প্রতি বছর প্রায় ১৮ মিলিয়ন মানুষ পর্তুগাল ভ্রমন করে এবং এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক মানুষ আসে এ নগরীর প্রাচীন সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

এখানে অনেক ঐতিহাসিক ও বিশ্ব ঐতিহ্যে এবং দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তাছাড়া দুনিয়ার গোটা কয়েক রাজধানী শহরে সমুদ্র সৈকত রয়েছে তাদের মধ্যে লিসবন অন্যতম। লিসবন সিটি সেন্টার থেকে মাত্র ২০ কি.মি. দূরে সৈকতের অবস্থান যা মাত্র ১৫/২০ মিনিটে আসা যাওয়া করা যায় বাস, ট্রেন বা কারে।

আলফামা হলো লিসবনের অন্যতম প্রাচীন ও পুরাতন এলাকা যেটি ১৭৫৩ সালের ভয়াবহ ভুমিকম্পের ও জলোচ্ছ্বাসের পরেও টিকে রয়েছে অক্ষত অবস্থায়। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভীড় জমায় সরু রাস্তা ও প্রাচীন জনপদ দেখার উদ্দেশ্যে।

চলুন জেনে নিই কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান বা দর্শনীয় জায়গা। প্রথমে চলে আসে ‘Jeronimos Monastery’ এর নাম। মূলত এটি হলো আবিস্কারক ভাসকো দা গামার সমাধিস্থল। এটি একটি বৃহৎ গীর্জা বা মট এবং এটিকে বিশ্বের অন্যতম সুদর্শন মট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ষোড়শ শতকে নির্মিত এই সমাধিস্থল বা গীর্জাটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসাবে স্বকৃীত।

১৪৯৮ সালে ভাসকো দা গামার ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রাকে স্মরণ করে এটির নির্মান কাজ শুরু হয়েছিল এবং এর বেশির ভাগ অর্থের যোগান এসেছিল আমাদের উপমহাদেশের মসলা বানিজ্য থেকে। লিসবন সিটি সেন্টার থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং বাস অথবা ট্রাকে করে ১৫/২০ মিনিটে পৌঁছানো যায় সহজে।

Castelo de São Jorge লিসবনের প্রান কেন্দ্রে, পাহাড়ের পাদদেশে আলফামার পাশে অবস্থিত। এই রাজ প্রাসাদটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকে লিসবনের ৩৬০° ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। খুব কাছ থেকে টাগুস নদীর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সামান্য দূরে চোখ ফেললে আটলান্টিকের নীল জলরাশির দেখা মিলবে।

১১৪৭ সালের আগ পর্যন্ত মরিশরা এ প্রসাদ থেকে খ্রিস্টান বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতো কিন্তু ঐ বছর Afonso Henriques এর নেতৃত্বে এ প্রাসাদ দখল করে নেয়। এর মধ্যে অবস্থিত যাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, সুউচ্চ দেয়াল ও পর্যবেক্ষন টাওয়ার নিমিষেই যে কারো মন ভাল করে দিতে পারে।

Torre de Belém: A Historic Tower বেলেম টাওয়ার নামে পরিচিত এ দালানটি লিসবনের অন্যতম সেরা প্রতীক। ১৫১৫ থেকে ১৫২১ সালের মধ্যে নির্মিত এ টাওয়ারটি টাগুগ নদীর মাঝে গড়ে তুলেছিল সমুদ্রগামী নৌযান পর্যবেক্ষন করার জন্য। আবিষ্কারের যুগের অন্যতম সেরা একটি নিদর্শন হিসাবে এ টিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে ১৯৮৩ সালে। এটি পর্যটক আকষর্ণীয় স্থান বেলেম এ অবস্থিত।

Oceanário de Lisboa: A Modern Aquarium লিসবন ওশেনারিয়াম হলো ইউরোপের সেরা ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যাকোরিয়াম। ১৯৯৮ সালের লিসবন এক্সপো'তে এটির উদ্বোধন হয়েছিল। রহস্যময় নানান সামুদ্রিক প্রানীর এক কৃত্রিম অভয়ারণ্য, বিশেষ করে আটলান্টিক, ভারত, প্রশান্ত ও এন্টার্টিক মহাসাগরের জীব বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ একটি অ্যাকোরিয়াম। পাশে রয়েছে ইউরোপের সর্ববৃহৎ সেতু ভাসকো দা গামা ব্রিজ, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার এবং মনোরম কেবল কার।

তাছাড়াও 'ট্রাম ২৮' রাউন্ড ভ্রমণের মাধ্যমে লিসবনে পুরাতন শহর আলফামা সহ বৃহৎ পাঁচটি পাহাড় ভ্রমণ করা যায়। সিটি সেন্টারে রয়েছে Elevador de Santa Justa: An Antique Elevator, এটি একটি একক লিপ্ট যার নকশা করেছে আইফেল টাওয়ারের নকশাবিদ। এ লিপ্ট থেকে লিসবন পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ভিউতে দেখা যায়। Sé: Lisbon's Imposing Cathedral, Arco da Rua Augusta, Igreja do Carmo সহ অসংখ্য ঐতিহাসিক, নান্দনিক ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে।

পর্তুগালের আলগ্রাভ ও আ্যলেনত্যজুসহ অনেক এলাকা সপ্তম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম শাসনের অন্তর্ভূক্ত ছিল তাই কম বেশি লিসবন ও পর্তুগালের সব জায়গায় মুসলিম নিদর্শন ও বিভিন্ন ইসলামী নাম দেখতে পাওয়া য়ায়।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×