ভ্রমণের শেষ দিনে ভয়ঙ্কর স্মৃতি

  রহমান মৃধা, দূরপরবাস তুরস্কের পথে ১৬ জুন ২০১৯, ১৪:৫০ | অনলাইন সংস্করণ

হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট। ইনসেটে লেখক।
হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট। ইনসেটে লেখক।

গিয়েছিলাম বেড়াতে সুইডেনের বাইরে। ছোট দুই ভাই বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে এসেছে। তারা সেনজেন ভিসায় এসেছে। এদিকে সময় তাদের কম। এখন এই অল্প সময়ে তাদেরকে দেখাতে হবে ইস্ট এবং ওয়েস্টের মধ্যে পরিবর্তনের ছোঁয়া তাও দ্রুততার সঙ্গে।

তাদের পছন্দের দেশগুলো ছিল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস, জাহাজে বাল্টিক সাগর পাড়ি দিয়ে লাটভিয়ার রাজধানী রিগা ভ্রমণ, পথে এস্তেনিয়ার এক পলক দর্শন পরে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট এবং সবশেষে সুইডেনের বিভিন্ন জায়গাসহ রাজধানী স্টকহোম ভ্রমণ।

এবারের ভ্রমণে জড়িত রয়েছে নতুনের সঙ্গে পুরাতনের মিশ্রণ এবং সঙ্গে প্রযুক্তির বিবর্তন। আমাদের ভ্রমণের সময়টি ছিল আন্তরিকতায় ভরা। ভ্রমণে ঘটেছে অনেক কিছু। তবে সব কথা বলা হবে না কোনদিন। তবুও ঘটে যাওয়া ঘটনা থাকবে হৃদয়ে শিক্ষণীয় হয়ে। তুলে ধরব আজ ভ্রমণের শেষের দিনগুলোর কিছু অংশ।

বুদাপেস্ট হাঙ্গেরির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর দানিউব নদীর উভয় তীরে অবস্থিত। শহরটি পূর্ব-মধ্য ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। দানিউব নদী ইউরোপ মহাদেশের অন্যতম প্রধান পরিবহন পথ। ইউরোপের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে কেবল দানিউবই পূর্ব-পশ্চিমে প্রবাহিত হয়েছে।

এই নদী খালের মাধ্যমে মাইন, পাইন ও ওড়ার নদীর সঙ্গে যুক্ত এবং এর ফলে কৃঞ্চ সাগর ও উত্তর সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। বুদা এবং পেস্টের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে দানিউব নদী এবং দুই শহরকে সংযুক্ত করেছে লিবার্টি ব্রিজ অফ বুদাপেস্ট।

পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে লিবার্টি অফ স্ট্যাচু; যা দেখলে মনে হয় শান্তির এক জীবন্ত বার্তা দাঁড়িয়ে রয়েছে শান্ত হয়ে। কয়েকদিন ধরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছিল বুদাপেস্টে। তবু কোন কিছু থেমে নেই। টুরিস্টরা মনের আনন্দে ঘোরাঘুরি করছে। আজ সন্ধ্যায় একদল কোরিয়ান পর্যটক লঞ্চ ভ্রমণে আনন্দঘন মূহুর্তের ছবি তুলছে।

আর উপভোগ করছে রাতের আঁধারে দানিউব নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা বুদাপেস্ট শহরকে। হঠাৎ একটি বোটের সঙ্গে লঞ্চের ধাক্কা লেগে পুরো লঞ্চ ক্ষণিকের মধ্যে ডুবে গেলো। রাত দশটা বাজে, বেশ অন্ধকার তারপর দানিউব নদীতে প্রচুর স্রোত এবং এর পানি ঘোলা। মূহুর্তের মধ্যে ডুবন্ত লঞ্চ স্রোতে কোথায় হারিয়ে গেলো।

পরে সারা রাত নানা ধরনের তল্লাশির পর চারজনকে জীবন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাকি পর্যটকদের মৃতদেহ দানিউব নদী থেকে উদ্ধার করতে কর্তৃপক্ষ সক্ষম হয়েছে বটে; তবে চারজনের খোঁজ এখনও মেলেনি। লঞ্চে সর্বমোট ৩১ জন পর্যটক ছিল। কী কারণে ধাক্কা লেগেছিল তা পুরোপুরি সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

আমাদের ভ্রমণের শেষের দিন আমরা লঞ্চে উঠে দানিউব নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা সৌন্দর্যকে উপভোগ করছি। ঠিক তেমন একটি সময় ঘটনাটির বর্ণনা দিলো একজন সহযাত্রী। সে প্রত্যক্ষভাবে ঘটনাটি দেখেছে। স্বল্প সময়ে অনেক কিছু দেখার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক করুন মর্মান্তিক ঘটনা যা সে বর্ণনা করল।

শুনতেই গা শিউরে উঠলো। একই সঙ্গে মনটাও ভেঙ্গে গেলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হয়ে গেলো। আমাদের লঞ্চ ভ্রমণ শেষে নৈশভোজ সেরে হোটেলে এসে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে বিমান বন্দরে এসে চেকিংয়ের পর্ব শেষ করে প্লেনে বসেছি। প্লেন ছাড়তেই যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে হঠাৎ থেমে গেলো প্লেন।

কী ব্যাপার? কিছুক্ষণ পর খবর পেলাম এই প্লেন বদলাতে হবে। তারপর অন্য একটি প্লেনে করে সুইডেনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ল্যান্ড করার বিশ মিনিট আগে হঠাৎ প্লেন ফল ডাইন করতে শুরু করল। পুরো প্লেন মনে হচ্ছিল অকস্মাৎ মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। সে যে কি এক ভয়ংকর মুহূর্ত যা শুধু অনুভব করেছে তাঁরাই যারা প্লেনের মধ্যে ছিলো।

পাইলট প্লেনটি তাঁর নিয়ন্ত্রণে এনে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে ঘটনার বর্ণনা দিলেন। জীবনে প্লেনে চড়ে দেশ দেশান্তর ঘুরেছি, এমনটি ঘটেনি এর আগে কখনও। শেষ ভালো যার, সব ভালো তার- তাই ল্যান্ডিং শেষে মনে হলো এখনও দেহে প্রাণ আছে! পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলআমিন একটু জানিয়ে দিলেন তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।

ফিরে এলাম বাড়িতে প্রিয়জনদের কাছে। সবাই একটু চিন্তিত ছিল দূর্ঘটনার জন্য। মনে হচ্ছে নতুন করে বেঁচে থাকার জন্য জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছি।

সবাই ফিরেছি শুধু ফেরেনি দক্ষিণ কোরিয়ার ২৭ জন পর্যটক; যারা প্রাণ হারিয়েছে দানিউব নদীতে। সোহেল (মিজানুর রহমান সোহেল, যুগান্তর অনলাইন বিভাগের প্রধান) কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশে চলে গেছে। আজ প্রদ্যুৎ (প্রদ্যুৎ বরণ চৌধুরী, অ্যাডল কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) চলে গেলো। দেখে গেলো অনেক কিছু আর রেখে গেলো কিছু স্মৃতি। রাত বেশ হয়েছে। কাল সকালে যেতে হবে আন্তালিয়ায়। আন্তালিয়া তুরস্কের ভুমধ্যসাগরীয় পর্যটন এলাকা।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস তুরস্কের পথে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×