সৌদিতে প্রতারণার নতুন ফাঁদ: ফ্রি ভিসায় কন্ট্রাক্ট ভিসা

  সাগর চৌধুরী, সৌদি আরব থেকে ১৭ Jun ২০১৯, ১৯:৩৩:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

প্রতারিত শ্রমিকদের কয়েকজন। ছবি: যুগান্তর

সর্বহারা প্রবাসী শ্রমিকের আহাজারি ও আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠছে আকাশ বাতাস। একটু সুখের আশায় সহায় সম্বল বিক্রি করে সুদে টাকা নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বৈধ কন্ট্রাক্ট ভিসা, বিএমইটি ছাড়পত্র, কাজের চুক্তিপত্র নিয়ে সৌদি আরব এসে দীর্ঘ সাত মাসে চার কোম্পানিতে কাজ করে বেতন ভাতা না পেয়ে বাথা বাঙালি মার্কেটে একটি বহুতল ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড কার প্যাকিং এ মানবেতর জীবন যাপন করছে ৩০ জন বাংলাদেশি প্রতারিত শ্রমিক।

শুরুতেই প্রতারণার খপ্পরে পরে শ্রমিকরা। তারা জানান, দালালরা তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে সৌদি আরবের ফাহাদ কোম্পানিতে রোড ক্লিনারের ভিসার কথা বলে। কিন্তু ভিসা স্ট্যাম্পিং হওয়ার পর যখন শ্রমিকরা দেখতে পায় ফাহাদ কোম্পানির স্থলে বাবতেইন কোম্পানির ভিসা লেগেছে, তখন তারা এই ভিসায় সৌদি আরব যেতে অস্বীকৃতি জানায়।

কিন্তু দালালরা শ্রমিকদের বলে এগুলো কন্ট্রাক্ট ভিসা, বাবতেইন কোম্পানির ভিসা হলেও কাজ কিন্তু ফাহাদ কোম্পানিতে। তাই চিন্তা না করে সৌদি আরব গিয়ে কাজে যোগদানের কথা বলেন।

জনশক্তি রপ্তানির সমস্ত নিয়ম নীতি মেনে দালালরা কৌশলে হাজার হাজার ফ্রি ভিসাকে কন্ট্রাক্ট ভিসা বলে চালিয়ে দিলেও প্রবাসীদের কল্যাণে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর নজরে আসছে না। প্রতিনিয়ত হাজার হাজার শ্রমিক প্রতারণার স্বীকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরলেও টনক নড়ছে না রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তাব্যক্তিদের।

প্রতারণা বন্ধে নেওয়া হচ্ছে না প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তাই এই সুযোগে প্রবাসী শ্রমিকের রক্তচোষা দালাল চক্র দেশে এবং প্রবাসে গড়ে তুলেছে বিশাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট তিন ভাগে কাজ করছে বলে জানান কয়েকজন ভুক্তভোগী। একটি অংশ বাংলাদেশে ভিসা বিক্রির কাজে নিয়োজিত, আরেকটি সৌদি আরব থেকে ভিসা সংগ্রহ এবং অন্যটি সৌদিতে কাজের সন্ধানে থাকে।

কেউ সাড়ে চার লাখ কেউবা পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে আটকা পড়ে বাধ্য হয়ে ৯০০ সৌদি রিয়াল বেতনে সৌদি আরবের রিয়াদের উদ্দেশ্যে গেল নভেম্বর মাসে যাত্রা করেন। শ্রমিকরা বলছেন, রিয়াদের বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাদেরকে কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি।

পরে তারা দেশে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দুজন বাংলাদেশি বাসার এবং হাসান তাদের বিমানবন্দর থেকে নিয়ে দাখেল মওদুদ এলাকার একটি বিল্ডিংয়ে রাখেন। তারপর ওখান থেকে কখনও কনস্ট্রাকশনের কাজ, কখনও পাইপ লাইনের কাজ, কখনও আবার ক্লিনার এর কাজ এভাবে চার পাঁচটি কোম্পানিতে কাজ করিয়ে কোন বেতন ভাতা না দিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করে তারা। ১২/১৩ ঘণ্টা কাজ করে বেতন না পেয়ে হতাশ হয়ে দেশে ফিরতে চান প্রতারিত শ্রমিকরা।

শ্রমিকরা জানান, সর্বশেষ আল কাসিম শহরের পাঁচ নাম্বারে একটি ক্লিনার কোম্পানিতে তাদের কাজ দেওয়া হয়। সেখানে ৬০০ রিয়াল বেতন ৩০০ রিয়াল মিশরি ফোরম্যান এবং সুপারভাইজার কেটে রাখে। টাকা না পেলে তারা মারপিট করে।

ওই ক্যাম্পে একজন বাংলাদেশিকে অতিরিক্ত মারপিট করার ফলে সে এখন পাগল প্রায় বলে অভিযোগ করেছেন তার সতীর্থরা। যেকোন সময় মারা যেতে পারে। সেখানে কোন চিকিৎসার ব্যবস্থা নাই। এর আগে দুইজন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছে বলে জানান শ্রমিকরা।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না ঘরে কিংবা এক রুমে ৪০/৫০ জনকে থাকতে হয়। সেই কোম্পানি থেকে তাদের বের করে দিলে এখানে এসে আশ্রয় নেন। তারা অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন। দেশে তাদের স্ত্রী সন্তান পরিবার পরিজন পথের ভিখারি।

শুধু তাই নয়, দেশ থেকে পাঠানো শ্রমিকের চুক্তিপত্রের সঙ্গে কাজের কোন মিল থাকছে না। আবাসিক হোটেলে কাজের কথা বলে সুপার মার্কেটের ক্লিনার কিংবা ট্রলি বয়ের কাজ, পেট্রল পাম্পে কাজের কথা বলে কনস্ট্রাকশনের কাজ করিয়ে মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে প্রতারণা করে যাচ্ছে এই চক্র। অসহায় শ্রমিকরা ভিসা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি পড়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেন, প্রতারিত শ্রমিকদের সহায়তা করবে বাংলাদেশ দূতাবাস।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত