দেশের স্মার্ট বয়, খুঁজে পায় না স্বপ্নের সোনা হরিণ

  সাদেক রিপন, কুয়েত থেকে ১৯ জুন ২০১৯, ১৪:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

সোনা হরিণ

কুয়েতে বর্তমানে শ্রমিক ভিসা বন্ধ রয়েছে। তবুও গত ৩/৪ বছরে লামানা করে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভিসা শর্ত সাপেক্ষে চালু হলে সেই ভিসায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা অদক্ষ শিক্ষিত বেকার যুবকেরা স্বপ্ন পূরণের আশায় পাড়ি জমায় দেশটিতে।

বর্তমানে দেশটিতে প্রায় তিন লাখ প্রবাসী রয়েছে। কুয়েতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তরুণ প্রবাসী আলাপচারিতার এক ফাঁকে বলেন নিজেদের প্রবাস জীবনে গল্প।

বাংলাদেশে বেনসনের সিগারেট হাতে নিয়ে চুলগুলো বড় বড় করে চুলের মাঝে হাল্কা কালার লাগিয়ে এলাকায় দাপট দেখিয়ে বাইকের আওয়াজে পুরো মহল্লা কাঁপানো সেই ছেলেটা আজ ক্লিনার!

সকাল ৫ টায় ওঠে কোম্পানির পোষাক পরে ঝাড়ু হাতে নিয়ে সিগনালে সিগনালে বা রাস্তার ময়লা পরিস্কার করাই এখন তার কাজ।

৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় চুলগুলো কালার ছাড়াই লাল হয়ে গেছে, বাংলাদেশের হাল্কা গরমে ছাতা নিয়ে বের হওয়া সেই ছেলেটা আজ তীব্র গরমের মধ্যেই যিরু সাইজের চুল কেটে করছে রাস্তা পরিস্কার।

মামা (দালাল) বলেছিল কোম্পানির ভিসা, লাগায় দিব কোথাও ফোরম্যানের কাজে, তোর আন্ডারে থাকবে ২০/২৫ জন তুই তো বাবা শিক্ষিত, ডিগ্রি নেয়া ছেলে?

টাই স্যুট পরে ৮ ঘন্টা ডিউটি শেষে কিছুটা রেস্ট নিয়ে লাগিয়ে দিব একটা পার্ট টাইমের কাজে, আরে ভিসার টাকা? এতো বাবা চলে আসবে ২ বছরেই, আকামা ফ্রি, থাকার জন্য দিবে ফ্ল্যাট, সে কি বাবা রাজ প্রসাদের মতই থাকবি।

২ বছর গেলে এ কোম্পানি ভাল না লাগলে কোন এক প্রাইভেট কোম্পানিতে ট্রান্সফার করে দিবো? না হলে ছোট খাট ব্যাবসা করবি, বাকালা (মুদি দোকান) খুলে নিবি? তোর আন্ডারে লোক খাটবে কতো?

সে ছেলেটি হাজার স্বপ্ন নিয়ে ঋনের বোঝা বাবার মাথায় দিয়ে, সদ্যবিবাহিত বোনের গয়না বন্ধক রেখে এদিক সেদিক থেকে সুদে টাকা এনে দিয়ে দিলো দালালের হাতে, দালাল টাকা পেয়ে আজ দেয় তো কাল দেয় ভিসা, এদিকে সুদের টাকা বাড়ছে ছোট বোনকে শুনতে হচ্ছে শশুর বাড়ির কথা, সেই কবে নিয়েছে তোমার ভাই গয়না, খেয়ে ফেলেছে নাকি? বিদেশ যেতে কি লাগে নাকি এতো দেরি?

বছর খানিক পরে, হাতে পেল ভিসা আহ! কি কালার ভিসার কাগজে? আরবিতে লেখা কোম্পানির নাম, কতই না সুন্দর। মেডিকেল করে বন্ধু বান্ধব নিয়ে শেষবারের মতো পার্টির আয়োজন করে চলে এলো কুয়েতে, এয়ারপোর্টে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা, মামার (দালালের) খোঁজ নেই, কল দিলেই বলে মন্দুব আসছে তোমায় নিতে, চিন্তা করো না বাবা।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে তখন গরমের সময়, শুনেছিলাম কুয়েতে অনেক গরম, কিন্তু এতো দেখি আগুনের তাপ! থাকবো কি করে এখানে?

কোম্পানির ফোরম্যান গাড়ি থেকে সোজা নিয়ে গেল ব্রাকে রুমে ঢুকতেই দেখে তার মতই আগে থেকেই এক রুমে ১৫ জনের মত দলাদলি করে বসে আছে, সবার সিট আলাদা আলাদা একজনের উপরে আরেকজন ঘুমায়, আমি তো ভাই দেশে একা ঘর ছাড়া ঘুমাতাম না? কি করে ঘুমাবো এখানে? আর খাবার দাবারের ব্যাবস্থাই কি?

করিম ভাই, অনেক পুরাতন দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কাজ করে এই কোম্পানিতে, কোন প্রোমোশন নেই, কোম্পানির দালাল ধরে কাজ পাইছে সিগনালে, আছে বড্ড ভালই, কিন্তু নতুন লোক আসায় কোম্পানিতে আগের মত সুবিধে না থাকায় তাই বেশি ভাল নেই, কোম্পানির নতুন লোকদের উপর একটু মাতাব্বরি করেই চলছে দিনের পর দিন।

আজ দীর্ঘ ৩ মাস, আকামা লাগছে না, ডিউটি হচ্ছে না, খাবার টাকা নেই, দালাল ফোন উঠাচ্ছে না, কি যে বিপদ, আর সবাই বলে এটা নাকি আকদ হুকুমার ভিসা? এই ভিসায় নাকি ক্লিনার কোম্পানি ছাড়া কোথাও কাজ করা যায় না? তাহলে মামা যে বলেছিল? ২ বছর পরেই ট্রান্সফার করে দিবে ভাল কোম্পানিতে? সব মিলিয়ে সেই ছেলেটি পরিস্থিতির স্বীকার, হাতে ঝাড়ু আর টিনের তেলের পাত্র দিয়ে বানানো ময়লা।

উঠানোর বেলচা, দেশে চলে গেলে বাবার ঋন আর সুদের টাকা কিভাবে দেবে? বোনের গয়নার জন্য প্রায় বাড়িতে এসে কান্নাকাটি করে, এদিকে আবার বছর ফুরিয়ে আসছে, শুনেছি আবার আকামা লাগাতে লাখ টাকা লাগবে, না হলে আবার অন্য কোম্পানিতে যেতে হবে, আর অন্য কোম্পানিতে গেলে লাগবে ২/৩ লাখ।

কুয়েতের বিশিষ্ঠজনেরা মনে করছেন, ২০১৬ সালের পর থেকে যারা বিভিন্ন ফ্রী ভিসা নামের ভিসায় কুয়েতে প্রবেশ করেছেন তারা আকামা ও কাজের সংকটে পড়বে। কারন বাংলাদেশি কিছু দালালের কারণে বাংলাদেশিদের ভিসাগুলো ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় কুয়েতিরা সেটা জানে। আগে যেখানে ফ্রী ভিসার ২ বছরের আকামা লাগাতে সাড়ে ৩শ দিনার থেকে সর্বোচ্চ ৫শ দিনার নিতো কুয়েতিরা, বর্তমানে তারা ৬শ দিনার থেকে এক হাজার দিনার পর্যন্ত নিচ্ছে।

দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে বলে রিলিজ নিতে অন্য কফিল দেখতে শুরু হয় নানা ভোগান্তি। আবার নতুন শ্রমিক বৃদ্ধির ফলে কমেছে শ্রমের মজুরি। স্থানীয় আইনে ফ্রী ভিসা অবৈধ পুলিশ আতংকে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×