তুরস্ক ভ্রমণের দিনগুলো

  রহমান মৃধা, আলানিয়া (তুরস্ক) থেকে ২৫ জুন ২০১৯, ২১:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

ছবিতে লেখক রহমান মৃধা ও তার সহধর্মীনী মারিয়া
ছবিতে লেখক রহমান মৃধা ও তার সহধর্মীনী মারিয়া

এসেছি তুরস্ক ভ্রমণে, স্বাভাবিক ভাবেই এদেশ সম্পর্কে কিছু লেখার কথা। কিন্তু না, যখনই কিছু ভাবতে চেষ্টা করছি আমার মোটিভেশন অন্য দিকে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে সেই পঁচিশ বছর আগে এখানে এসেছি। তখন যা দেখেছি যেমন এদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, এখন সেই পরিবর্তনের মাত্রা অনেক বেশি বেড়েছে।

বিশেষ করে জিনিষ পত্রের দাম বেড়েছে। শিক্ষার মানও কিছুটা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ভদ্রতা এবং রেসপেক্ট সম্পর্কেও সচেতনতা বেড়েছে। ধর্মীও দিক দিয়ে মহিলাদের চলাচলে তেমন বাধাবিঘ্ন দেখা যাচ্ছে না। হোটেলের অনেক কাজেই মহিলারা কর্মরত। সমাজ গঠনে তাদের বিশেষ ভূমিকা দেখা যাচ্ছে । তারা মার্জিত পোশাকে চলাফেরা করছে।

তবে এখানে যাদের পরিবর্তন বেশি দেখছি তারা হলো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নাগরিকবৃন্দ। যারা কোন এক সময় দেশের বাইরে ভ্রমণে যেতে পারতো না। এদেরকে এখন দেখা যাচ্ছে সর্বত্র। প্রেসিডেন্ট মিখাইল গোর্বাচেভের আগে সবার ধারণা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন একত্রে না থাকলে তারা ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবে না। তাই তাদেরকে পৃথিবীর থেকে আলাদা রাখা হয়েছিল।

মনে পড়ে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা সরকারি স্কলারশিপে পড়াশুনার সুযোগ নিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, হাঙ্গেরি, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া এসব দেশে আসত। তখনকার সময় এমন কেউ ছিল না যারা বিয়ে করেনি ওসব দেশে গিয়ে।

ওসব দেশের মেয়েরা বিশেষ করে দেশ ছাড়তে সব কিছু করতে প্রস্তুত ছিল। কারণ তারা জানতো এ সব শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় ভালো। এদেরকে বিয়ে করতে পারলে দেশ ছেড়ে বিশ্বের অন্য দেশে বসবাস করার সুযোগ হবে। বর্তমানে নিশ্চয় অনেক বাংলাদেশি এসব দেশে পড়াশুনা করছে, কিন্তু বিয়ে-শাদি তেমন হচ্ছে না। কারণ কি? কারণ একটাই তা হলো এসব দেশ এখন স্বাধীন হয়েছে।

এরা গড়ে তুলছে এদের দেশকে সুন্দর করে। এখন তুরস্কের আলানিয়ায় যেখানে চোখ যায় দেখছি শুধু সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষদের। এরা তুরস্কে এসেছে শুধু ঘুরতে নয়, সংসার করা থেকে শুরু করে বড় বড় ইনভেস্টমেন্টে এদের অবদান রাখছে প্রচুর। এরা এদের নিজেদের পাসপোর্টে মনের আনন্দে দেশ বিদেশ ঘুরছে।

রাশান জাতি বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশেই বসবাস করছে এবং তাদের চলাফেরাতে কোন বাঁধা নেই। বেশিদিন আগের কথা নয়, রুটি, আলু আর ভতকা ছিলো যাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। আজ তারা তাদের পছন্দের গাড়ি, বাড়ি, খাবার, পোশাক যা দরকার তাই উপভোগ করছে। কারণ এরা কমিউনিজমকে ঘৃণা করত তখন। তবে এখন স্বাধীনতার সাধ পেয়েছে তাইতো এনজয় করতে শিখেছে এদের জীবনকে।

গতকাল সামারার (মস্কো থেকে ৬৫৫ মাইল দূরে ইউরোপের ভোলগা নদীর তীরে এই শহর অবস্থিত) এক বন্ধুর (অ্যালেক্স) সঙ্গে আলোচনায় অনেক কথা জানলাম যা সত্যি আমাকে অনুপ্রেরিত করেছে। বন্ধু অ্যালেক্স সাদা মনের বড় মানুষ। হাসি তামাশা থেকে শুরু করে কোন কিছুতেই ছিল না তার কৃপণতা।

তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি আর আমার জানা অজানা সব ভাষার মিশ্রণে তৈরি আমাদের সম্পর্ক। অথচ দেখা যাচ্ছে মানুষ তার নিজের দেশেই একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করতে ভুলে যেতে শুরু করছে! যাইহোক ইস্ট ইউরোপের মানুষ এখন পাশ্চাত্যে বসবাস করতে শুরু করেছে।

তুরস্ক মুসলিম দেশ। এরা মাল্টি কালচারের সঙ্গে বেশ মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। তুরস্কের খাবারে সাধ পাওয়া দুষ্কর হয়েছে বিশেষ করে আমার কাছে। আমি নিজে রান্না করি তারপর বাংলা খাবারের পাগল বিধায় এসব দেশের খাবার সব সময় আমার পছন্দ মত পাওয়া মুশকিল। এখানকার তাপমাত্রা এ সময়ে ৩০ডিগ্রী +/-। ভূমধ্যসাগরের পানি খুবই লবণাক্ত এবং পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২৫ডিগ্রী+/-। এই প্রথম তুরস্কের আলানিয়ায় এখনও কোন বাংলাদেশির দেখা মেলেনি।

রাত বেশ হয়েছে হোটেলের লবিতে চলছে লটারি খেলা। এই ফাঁকে আমি আমার লেখাটি নিয়ে বসেছি। শেষ করে ঘুমোতে যাব, কাল সকালে বোটে করে আলানিয়া ট্যুর দিব ভাবছি। এমন সময় হঠাৎ পেছন থেকে এক রমণী ঘাড়টা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরল এবং সঙ্গে জিজ্ঞেস করল “রহমান কেমন আছো”?

একটু ঘাড়টিকে নাড়িয়ে উপরের দিকে চোখ তুলতেই দেখি এক চেনা মুখ, আরে এতো দেখছি আগাতা! আজ থেকে ২৭ বছর আগে পোল্যান্ডের ক্রাকো শহর থেকে সামারে স্টকহোমে সামার জব করতে এসেছিল সে । কই হোটেলে যেখানে আমিও সামার জব করতাম।

এতটা বছর পার হয়েছে কোন যোগাযোগ নেই। হঠাৎ আমাকে এত বছর পর দেখে চিনতে পারল কী করে? আমি একটু অবাক কিছু বলতেই সে বললো আমি নাকি সেই আগের মতই আছি। সে দূর হতে আমাকে কয়েকদিন ধরে ফলো করছে।

মারিয়া মেয়েটিকে দেখেছে, সে আমার ঘাড়ের উপর তার হাত রেখে দিব্যি কথা বলে যাচ্ছে। মারিয়া (আমার স্ত্রী) কাছে এসে হাত বাড়িয়ে পরিচিত হলো। হ্যালো হ্যালো, আমার নাম মারিয়া, সেও বললো তার নাম- আগাতা।

সবাই কিছুক্ষণ একসঙ্গে আলাপ আলোচনার শেষে আগাতা বললো সকালে তাকে উঠতে হবে কারণ তার ফ্লাইট ভোর পাঁচটায়। আগাতাকে বিদায় দিয়ে আমি এবং মারিয়া রুমে চলে এলাম। ভেবেছিলাম মারিয়া অনেক কিছু জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। শুধু বললো আগাতা একটি ভালো মনের মানুষ। আমরা তাকে বলেছি পোল্যান্ডে আসলে যোগাযোগ করব। নতুন করে একজন পুরনো বন্ধু পাওয়া গেলো।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস আলানিয়া তুরস্ক থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×