খেলার জগতে অলওয়েজ অ্যালোন আবার নেভার অ্যালোন

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০২ জুলাই ২০১৯, ১৮:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

ছবিতে লেখকের ছেলে জনাথান এবং মেয়ে জেসিকা সুইডেনের জাতীয় টেনিস দলের খেলোয়াড়। ছবি: লেখক
ছবিতে লেখকের ছেলে জনাথান এবং মেয়ে জেসিকা সুইডেনের জাতীয় টেনিস দলের খেলোয়াড়। ছবি: লেখক

মাসখানেক বেশ ব্যস্ত ছিলাম। বিভিন্ন দেশ ঘোরাঘুরি শেষে দু’দিন হলো বাড়ি এসেছি। গতকাল দিনটি ভালোই ছিল। সকালে ছেলের সঙ্গে তার টেনিস প্রাকটিসে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ছিলাম। পরে সে গেলো লাঞ্চে আমি গেলাম বাজার করতে।

অনেকদিন পর বড় বাজার করলাম। মাংস একটু বেশি কিনেছি যা কেউ পছন্দ করেনি! কারণ ছেলে-মেয়ে বা বউ কেউ মাংস পছন্দ করে না। তবুও কিনেছি বারবিকিউ করব যখন মেহমান আসবে। যে টাকা দিয়ে মাংস কিনেছি ছোটবেলা একটি গরু কেনা যেত। এখন অবশ্য সেদিন নেই; সব কিছুর দাম বেড়েছে বাংলাদেশেও। সকালে ঘুম থেকে উঠেছি অনেক আগেই। আষাঢ় মাসের মত পিট পিট করে বৃষ্টি ঝরছে। সুইডেনে আষাঢ় মাস, অথচ গাছে আম নেই, কাঁঠাল নেই, পিছলা কাঁদা নেই। এইটা আবার কীসের আষাঢ় মাস? ভাল্লাগছে না!

ঠিক এমন সময় আমার ছেলে জনাথান বললো, বাবা চলো আমার সঙ্গে টেনিসে। চলে এলাম তার টেনিস একাডেমিতে। ওহ! আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। দু’জনই প্রফেশনাল টেনিস খেলোয়াড়। ওরা সুইডেনে সব সময়ই তাদের বয়স ভিত্তিক প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েই খেলে আসছে।

ওরা সুইডেনের হয়ে ইউরোপ এবং আমেরিকায় টেনিস খেলে আসছে সেই ছোটবেলা থেকে। মেয়ে জেসিকা ইউরোপের টপ লেভেলের জুনিয়র খেলোয়াড় সত্ত্বেও হঠাৎ টেনিসে ব্রেক দিয়েছে, বেশ খারাপ লাগছে আমার।

কারণ ১১ বছর এত কষ্ট করে হঠাৎ খেলা ছেড়ে দেয়াটা আমার জন্য মেনে নিতে সময় লাগছে। এখন যদি তার ভালো না লাগে বা মোটিভেশন না থাকে জোর করে তো হবে না। সে এখন তার লেখাপড়ার সঙ্গে এক্সট্রা কাজ করছে এবং সপ্তাহে দুই একবার প্রাকটিস করছে। দেখি সে তার টিনএজ শেষে কী করে!

তবে ছেলে তার টেনিস নিয়ে লেগে আছে। জুনিয়র থেকে সিনিয়র পর্যায়ে আশা আরেক নতুন ধাপ। চলছে কঠিন মোকাবেলা, চলছে প্রতিযোগিতা প্রতিমূহুর্তে। আগামীকাল প্রথম জনাথান এশিয়া ট্যুরে তিন সপ্তাহের জন্য তার ট্রেইনারের সঙ্গে যাচ্ছে চীনে, পরে আশপাশের দেশেও সে খেলবে।

ফুটবল এবং ক্রিকেটের মত টেনিসেরও বিভিন্ন ধাপ এবং নিয়ম কানুন রয়েছে। টেনিস প্রাকটিস যে কোন বয়সেই শুরু করা সম্ভব। তবে প্রফেশনাল খেলোয়াড় যারা হয়েছে তাদের জীবন কাহিনী ঘাঁটলে দেখা যায় ৯৫% খেলোয়াড়রা টেনিস শুরু করেছে যখন তাদের বয়স ৩-৬ বছর। জনাথান টেনিস শুরু করে যখন তার বয়স ছয় বছর।

টেনিস খেলাত বিভিন্ন লেভেল রয়েছে। যেমন কিডস, জুনিয়র এবং সিনিয়র। কিডস আন্ডার ১০, পরে জুনিয়র আন্ডার ১১-১৮ পর্যন্ত সময়। খেলাধুলা সাধারণত সখের মধ্য দিয়ে শুরু হয়; পরে যারা মেধাবী বা খেলায় সখ পেতে থাকে তখন ভাল লাগা। পরে ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা যা পরিষ্কার দেখা যায় খেলাধুলোর জগতে। এখন ভালো লাগলে বা বা ভালো বাসলেই যে প্রফেশনাল হবে তার কোন গ্যারান্টি নেই।

খেলাধুলোই ইনজুরি রয়েছে। প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তার পর সব সময় ভালো পারফরমেন্স করতে হবে। ট্রাভেল করা, ভৌগলিক এবং জিওগ্রাফিক মুভমেন্টস এবং তা পছন্দ করা, সব কিছুর ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ। এখানে প্রচুর মেন্টাল টাফনেসের ব্যাপার রয়েছে।

তারপর সব সিদ্ধান্তে “অলওয়েজ অ্যালোন নেভার অ্যালোন” বলে কথা আছে। যারা জুনিয়র হিসাবে তার দেশ, রেজিওয়ান পরে ওয়ার্ল্ডের বেস্ট পজিশনগুলো ধরে রাখে তারা স্পন্সর পেয়ে থাকে, তাতে করে তাদের জন্য দেশ-বিদেশে ট্যুর করা এবং বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করার সুযোগ যেমন বেশি তেমন খেলোয়াড় হিসাবে টিকে থাকা এবং সাকসেসফুল হবার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

সিনিয়র টেনিসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে- আইটিএফ, এটিপি প্রো ট্যুর এবং এটিপি প্রফেশনাল। জনাথান ধাপে ধাপে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। সে খেলছে এখন এটিপি প্রো ট্যুর লেভেল এবং ইন বিটউইন এটিপি চ্যালেঞ্জার অ্যান্ড এটিপি (মাঝে মধ্যে)।

এখানে ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিংয়ের ব্যাপার রয়েছে। গত বছর জনাথানের এটিপি ওয়ার্ল্ড র‍্যাংক ছিল ৫০০। ইনজুরির কারণে সে র‍্যাংক হারিয়ে সে জিরো থেকে শুরু করেছে। তবে কিছু নিয়ম রয়েছে এখানেও; যেমন ছয় মাসের বেশি সময় ইনজুরি থাকলে শেষের র‍্যাংক ফ্রিজ করা হয়।

ইনজুরি রিকভারি সময় শেষ হলে প্রথম ৮-১০ টা ট্যুরনামেন্টস খেলতে এরা সুযোগ পেয়ে থাকে। টেনিসে বলা হয় প্রোটেক্টিং র‍্যাংক যা ফ্রিজ করা হয়। জনাথান এখন তার প্রোটেক্টিং র‍্যাংকের সাপোর্টে নতুন করে খেলতে নেমেছে ইনজুরির পর। ইতিমধ্যেই সে একটি টুর্নামেন্টে কোয়াটার ফাইনাল এবং আরেকটি খেলায় পুরোটাই উইন করেছে। এশিয়া ট্যুরের পরে জানা যাবে তার পারফরমেন্সের লেবেল এবং নতুন ওয়ার্ল্ড র‍্যাংক।

স্বাভাবিকভাবেই আমরা একটু টেনশনে এবং অ্যাক্সাইটমেন্টের মধ্যে আছি। টেনিস সত্যিকার একটি মেন্টাল স্পোর্টস যার বর্ণনা দেয়াও কঠিন। এখানে হিরো অথবা জিরো কনসেপ্ট, আর উইনার টেকস ইট অল।

মজার ব্যাপার হলো- গত পাঁচ সপ্তাহে জনাথান ট্রেইনার ছাড়া একাই টেনিস ট্যুরে ছিল। এখন একা ট্রাভেল করার কারণে খরচ বেশ কম হয়েছে। সে তার খেলার পারফরমেন্সের কারণে যে অর্থ জিতেছে তার পরিমাণ ছিল চার হাজার ইউরো (প্রায় চার লাখ টাকা) অথচ তার খরচ হয়েছে চার হাজার পাঁচশো ইউরো!

এবছরের ট্যুর প্লানের বাজেটে দরকার এক মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার (প্রায় এক কোটি টাকা), অথচ আমাদের সে পরিমাণ সেভিংস নেই। এখন আমার বাড়ির মাধ্যমে হাফ মিলিয়নের জন্য ব্যাংকে নক করেছি গতকাল। দেখি কী হয়। এশিয়া ট্যুরে তার সঙ্গে ট্রেইনার যাবে বিধায় খরচ হবে বেশি। আবার ভালো করলে অ্যাডজাস্ট হবে, খারাপ হলে অর্থে মাইনাস যাবে তবে শিখবে অনেক নতুন কিছু।

সুইডেনে যে সব পরিচিত বন্ধুরা আছে তারা ইচ্ছে করলে একটু স্পন্সর করতে পারে কিন্তু সবাই চুপচাপ আছে। সময় আসবে যখন জনাথানের ভালো যাবে তখন বিভিন্ন সংবাদপত্রে, টিভিতে তার পারফরমেন্স নিয়ে আলোচনা হবে। তখন অনেকেই হাজির হবে পাশে থাকতে, স্পন্সর করতে। কিন্তু জনাথনের অর্থের প্রয়োজন এখন। যাই হোক আমরা থেমে নেই, “সো মাস্ট গো অন”। ওহ, ভালো কথা। হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনকে দুই বছর আগে নক করেছিলাম। যতটুকু তাদের ইঙ্গিত বুঝেছি টেনিসের ওপর তাদের তেমন আগ্রহ দেখিনি এবং কোন রকমের কোন সাপোর্টিভ প্লানও পাইনি। শেষে সিদ্ধান্তে নিয়েছি আমাদের মত করে এগোতে।

গত বছর জনাথান প্রথম সুইডিশ ডেভিস কাপে যোগ দিয়েছে। তবে তাকে বলেছি যখন সে ভালো করবে, যেমন অলিম্পিকে খেলতে যদি সুযোগ পাই তখন যেন সে লাল সবুজের পতাকার হয়ে খেলে। কারণ আমার সখ বিশ্ব অলিম্পিকে লাল সবুজের পতাকা দেখার।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×