এক বছর হলো মায়ের সঙ্গে কথা হয় না

  আমিনুল ইসলাম, পর্তুগাল থেকে ২০ জুলাই ২০১৯, ০৯:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

মা

দিনটা বেশ আলো-ঝলমলে ছিল। পর্তুগালে গিয়েছি গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনে।

দিন পঁচিশেক থাকবো। পর্তুগিজ এক সহকর্মী চমৎকার একটা ডুপ্লেক্স এপার্টমেন্ট ঠিক করে দিয়েছে।

এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছালাম, অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। ওই সহকর্মী এসেছে তার গাড়ি নিয়ে। আমাকে এপার্টমেন্টে পৌঁছে দিয়ে সে চলে গিয়েছে তার বাসায়।

বিশাল এপার্টমেন্ট। সবকিছু ঝকঝক করছে। নিচতলায় বসার রুম। পাশেই বিশাল রান্না ঘর আর বারান্দা। উপর তলায় দুটো বেড রুম।

একজন মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় সব জিনিস'ই আছে।

এপার্টমেন্টের মালিক দেখছি টেবিলে অনেক রকম ফল সাজিয়ে রেখেছে।

ফ্রিজের উপরের তাক খুলে দেখি পর্তুগালের বিখ্যাত ওয়াইনের প্রায় আট-দশটা বোতল!

খানিক বাদে এপার্টমেন্টের মালিক ফোন দিয়েছে

-কেমন লাগছে তোমার? আমি খুব'ই লজ্জিত তোমার জন্য কোন ওয়ার্ম ফুড রেখে আসতে পারিনি। তবে কিচেনের ঠিক নিচের তাকে অনেক রকম পাস্তা আছে। তুমি চাইলে বানিয়ে খেতে পারো। আমি ফ্রিজে অনেক গুলো ডিম কিনে রেখেছি। সে সঙ্গে আলু-পেঁয়াজ সব কিছু'ই আছে। তোমার যদি কোনো কিছু লাগে, আমাকে একটা ফোন দিলেই হবে, আমি হাজির হয়ে যাবো।

আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ভাবছি এই বিশাল এপার্টমেন্টে আমি একাএকা কিভাবে এক মাস কাটাবো! হঠাৎ মনের মাঝে রাজ্যের শূন্যতা এসে ভর করেছে।

একদম কিছু ভালো লাগছিল না। সঙ্গে সঙ্গে মা'কে ফোন করলাম। তখন বোধকরি বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে তিনটা হবে। ছোট বেলা থেকে বড় বেলা; আমি জীবনভর যখন'ই আমার মন খারাপ কিংবা কিছু ভালো লাগছে না কিংবা রাতে হঠাৎ ভয়ের স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গিয়েছে; আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার মাকে ফোন করেছি।

- হ্যালো মা।

-কিরে ভয় পেয়ছিস নাকি একা বাসায়? খারাপ লাগছে একা একা?

-হ্যাঁ, কিছু ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে এক্ষুনি চলে যাই।

-কাল না তোর দুই ছাত্র আসার কথা। ওরা তো কয়েক দিন থাকবে। তখন ভালো লাগবে।

-আমার এরপরও খারাপ লাগবে মা।

মা এরপর হেসে বলেছে

-কি, প্রিয়জনের কথা মনে হচ্ছে?

-হুম।

এরপর আমি আর মা কতো কি বললাম, সেই সঙ্গে হাসাহাসি। মন খানিকটা ভালো হবার পর ফোন রেখে বিছানায় গেলাম।

পরের দিন আমার শহর থেকে দুই ছাত্র এসেছে ঘুরতে পর্তুগালেই। ওরা এখানে আমার ছাত্র হলেও অনেকটা বন্ধুর মতো। দিন সাতেক ছিল ওরা।

তিন জন মিলে ওই এপার্টমেন্টে কতো কি আড্ডা। গভীর রাতে শুকনা মরিচ পুড়িয়ে আচ্ছা মতো ঝাল দিয়ে নানান রকম ভর্তা, ভাজি, গানের আসর, নানান আদর্শিক আলোচনা, আরও কতো কি।

বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলছিল তখন।পর্তুগাল বাদ পড়ে গেলেও পর্তুগিজ ভাষাভাষী ব্রাজিল দল তখনও খেলছে বিশ্বকাপ। তিনজন মিলে গেলাম খেলা দেখতে বিশাল স্ক্রিনে। কতো কি কেনাকাটা। আটলান্টিক সমুদ্রের পাড়ে ঘুরতে যাওয়া।

সাত দিন খুব দ্রুতই মনে হলো কেটে গিয়েছে। সাতদিন পর ওরা চলে গেল, আমি থেকে গেলাম আরও দিন পনেরোর জন্য।

বিশাল এপার্টমেন্টে আবার একা হয়ে গেলাম। ভাবছিলাম এতো লম্বা সময় কিভাবে কাটাবো একা একা। সেখানকার পার্টনার ইউনিভার্সিটিতে কয়েকটা সামার ক্লাস নিতে হবে। এরপর?

একাকিত্বের শূন্যতা এসে হাজির হচ্ছিলো প্রতিদিন। এর মাঝেও আমি একটা নিয়ম করে ফেললাম।

সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে ব্যায়াম করে পাশের রেস্টুরেন্টে যেতাম, সেখানে গিয়ে দিন তিনেক একই অর্ডার দেয়ার পর চতুর্থ দিন দেখি আমাকে আর অর্ডার দিতে হচ্ছে না! যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খাবার নিয়ে হাজির হচ্ছে। একদিন ওদের জিজ্ঞেস করলাম

-এতো তাড়াতাড়ি বানাচ্ছ কি করে খাবার?

ওরা মনে হয় আমার এই প্রশ্নে বড় রকমের অবাক হয়েছে। উত্তরে বলেছে

-তুমি তো প্রতিদিন একই সময়ে আসছো। একটুও এদিক-ওদিক হচ্ছে না।

হঠাৎ মায়ের কথা মনে হলো। ছোট বেলা থেকে সব কিছু নিয়ম মেনে, সময় মেনে করার এক অদ্ভুত শিক্ষা আমার মা আমাকে দিয়েছেন। আমার বাবাকেও দেখেছি সব সময় সবকিছু নিয়ম মেনে চলতেন।

সেদিন'টা বেশ আলো-ঝলমলে ছিল। ইউরোপিয়ান সামার একদম মাঝপথে। পর্তুগালের যে শহরে আছি, মনে হচ্ছে সবার মন প্রফুল্ল হয়ে আছে। কিন্তু আমার মন ভালো নেই। আগের দিন শুনেছি মায়ের শরীরটা একটু খারাপ।

মাকে ফোন করলাম। ফোন ধরেই খুব নিচু গলায় মা বললেন

-কিরে তোর গলা এমন শুকনা লাগছে কেন? ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করছিস তো?

-হ্যাঁ মা। তোমার শরীর এখন কেমন?

-আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে একদম চিন্তা করবি না। জগতের কারো বাবা-মাই আজীবন বেঁচে থাকে না।

আমি পরিস্কার বুঝতে পারছিলাম আমার মা'র কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। এর মাঝেও মা বলছে

-কিন্তু তোর গলা শুনে তো মনে হচ্ছে তোর মন খুব খারাপ। একদম মন খারাপ করবি না। ঘুরে বেড়া। যা করতে ইচ্ছে করে, করে বেড়াও। মন খারাপ করা যাবে না। প্রিয়জনের কথা মনে উঠলে সোজা ফোন দিয়ে বস। মান-অভিমান করে কি লাভ।

আমি মাকে বললাম

-মা, তোমার এই শরীরেও তুমি কেবল আমার কথাই চিন্তা করছো?

এরপর ফোনটা কেটে গিয়েছে। দিনটা ছিল ঠিক এক বছর আগের এই দিন। জুলাই মাসের ১৯ তারিখ। পরের দুই দিন মার সঙ্গে আর কথা হয়নি। পর্তুগালের ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে হয়েছে দুই দিন। সকালে গিয়ে রাতে ফিরতাম। ততক্ষণে দেশে অনেক রাত, তাই আর ফোন দেয়া হয়নি।

জুলাই মাসের ২২ তারিখ, বিশাল এপার্টমেন্টে একা বসে আছি। একাকীত্বের শূন্যতা এসে ভর করেছে। নিজের ভালোলাগা, ভালোবাসার মানুষজনদের কথা মনে হচ্ছে; সে সঙ্গে একাকীত্বের শূন্যতাও বেড়ে চলেছে। একদম কিছু ভালো লাগছিল না। এমন হলে আজীবন যা করেছি- মার সঙ্গে কথা বলেছি। আমার মা ছিলেন আমার সর্বক্ষণের বন্ধু। যাকে এ জীবনে বলিনি, এমন কোন কথা নেই।

ভাবলাম মা'কে ফোন করবো। হঠাৎ দেখি আমার বড় বোন ফোন করেছে।

কাঁদতে কাঁদতে বলছে- মা আর নেই।

অচেনা একটা দেশে কাউকে চিনি না, বিশাল এপার্টমেন্টে একা বসে শুনতে হয়েছে মায়ের মৃত্যুর খবর। চারপাশে কোথাও কেউ নেই।

মাকে আর শেষ কথাটা বলা হয়নি আমার। আমার পুরো পৃথিবী বদলে গেল সেদিন।

এখনও মাঝে মাঝে গভীর রাতে ভয় পেয়ে জেগে উঠি, এখনও একাকীত্বের শূন্যতা এসে ভর করে, এখনও মাঝে মাঝে প্রচণ্ড মন খারাপ হয়; কেবল মা নেই। গভীর রাতে ঘুমের মাঝে ফোন পেয়ে একটুও বিরক্ত না হয়ে বলবে

-কিরে খারাপ লাগছে? এইতো আমি পাশে আছি।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×