মোদের গর্ব মোদের আশা আমাদের ভালোবাসা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৭ জুলাই ২০১৯, ১১:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ

ভালোবাসা

মা তার বিশ বছরের ছেলেকে হারিয়েছে। অনেক শোকে কাতর হয়ে নিস্তব্ধ নিরবে বসে আছে শান্ত হয়ে তার ঘরের এক কোনায়।

ছোট মেয়ে সুজান বলছে তার মাকে, কাঁদতে যদি না চাও তুমি হাসতে শুরু করো, আমাকে আদর করে একবার জড়িয়ে ধরো। বলতে বলতে মা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন।

আকাশ মেঘে ঢাকা, কোন সাড়া শব্দ নেই। সব কিছু যেনো গম্ভীর হয়ে অন্ধকারে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ গুড়ুম করে আকাশের মেঘ গর্জন করে উঠতেই মুষলধারে বৃষ্টি, তারপর আকাশ পরিস্কার হয়ে উঠল। সঙ্গে সূর্যের কিরণ দেখে যা দেখে মনে হলো নতুন পৃথিবীর দেখা পেলাম। ঠিক তেমন মনে হয়েছিল মাকে দেখে সেদিন, সুজান আজ হঠাৎ তার মনের গভীরের কথাগুলো আমার সঙ্গে শেয়ার করলো।

সুজান আমার কর্ম জীবনের এক কলিগ। বাড়ি স্টকহোমে, বিবাহিত এবং দুই সন্তানের মা। গতকাল সুইডিশ ‘ফিকা’ মানে চা কফির এক আড্ডায় এক সঙ্গে কিছুক্ষণ তার সঙ্গে সময় কাটাতে এসব কথা আলোচনা হয়। সে জানে আমি ইদানীং লিখালিখি করি তাই শুরুতে তাকে বলেছি ঘটনাটি লিখব তবে সরাসরি নাম ঠিকানা উল্লেখ করব না।

গল্পের সুজান, এরিক এবং হাসান পরিবারের লোকেরা চরিত্রের আসল নাম নয়।

এরিকের মৃত্যু সাধারণ মৃত্যু নয়, ছিল ভালবাসার অপরাধে মৃত্যু। আরব কালচারে একে বলে অনার কিলিং (সুইডিশে বলা হয় হেডেরসমোর্ড)। সে আবার কি? ইজরাইল এবং লেবাননের যুদ্ধে অনেক আরব দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে ইউরোপের অনেক দেশে। হাসানের পরিবার ( স্ত্রী, মেয়ে নাদিয়া এবং ছেলে কাশেম) সুইডেনে আশ্রিত রেফুজি। স্বল্প সময়ের মধ্যে হাসান পরিবার স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পেয়ে সুইডেনে বসবাস করতে শুরু করে। নাদিয়ার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে তার পরিবার তাকে বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগে যায়।

নাদিয়া এরিকের প্রেমে পড়েছে দুই বছর ধরে যা এরিকের পরিবার জানে তবে নাদিয়া তার পরিবারকে এর কিছুই বলেনি। নাদিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে লেবাননে, তাকে যেতে হবে সেখানে। নাদিয়া লেবাননের ছেলেকে চেনে কারণ ছোট বেলা তারা পাশাপাশি বসবাস করত কিন্তু যুদ্ধের কারণে প্রায় দশ বছর তাদের ভেতর কেনো যোগাযোগ নেই।

সে নতুন জীবন শুরু করেছে সুইডেনে। ভুলে গেছে অতীতের কথা এবং পুরনো স্মৃতিগুলো। পরে জানা গেলো হাসান তার লেবাননের বন্ধুকে ছোটবেলায় কথা দিয়েছিল, নাদিয়া বড় হলে তার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে। হয়তো সব কিছু ঠিক মতো থাকলে, হয়ত দেশ না ছাড়লে কথার সঙ্গে কাজের মিল এবং ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তাই হতো।

কিন্তু নাদিয়া গড়ে উঠেছে পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে যেখানে ভালোবাসার স্বাধীনতা রয়েছে। সে এখন বিষয়টি মেনে নিতে পারছে না। শেষে সাহস করে পরিবারকে জানিয়ে দেয় তার ভালোবাসার কথা, তার প্রিয় সঙ্গী এরিকের কথা। আরবের মেয়ে সুইডেনে বড় হয়েছে তবে হাসানের পরিবারের ধারণা মেয়ে নাদিয়া সেই আগের মতই আছে। এরিক এবং নাদিয়ার প্রেমে হাসানের পরিবার থেকে বড় রকমের বাধা পড়েছে বিধায় এদের প্রেমের গভীরতা দেখা দিয়েছে আরো বেশি।

নাদিয়ার পাশে রয়েছে তার সব সুইডিশ বন্ধু- বান্ধবীরা। হাসান এবং তার পরিবার নাদিয়াকে জোর করে লেবাননে নিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় নাদিয়া এরিকের সঙ্গে সুইডিশ কোর্টে বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে এরিকের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করে।

হাসানের পরিবার কিছুতেই ভিন্নধর্মী এবং ভিন্ন সংস্কৃতি মেনে নিতে নারাজ, অথচ সে সমাজে তাদের বসবাস! কোন এক সময় রাতের আঁধারে এরিক এবং নাদিয়ার জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে দেয় হাসান যা আরব দেশের কালচারে বলে অনার কিলিং।

এমন মর্মান্তিক ঘটনার কারণে এরিকের মার জীবনে সেদিন অন্ধকার নেমে এসেছিল। স্বাভাবিকভাবেই এমন অসভ্য বর্বর মৃত্যু পৃথিবীর সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়, তাই হাসানের পরিবারের যারা এই অনার কিলিংয়ের (হেডেরসমোর্ড) সঙ্গে জড়িত ছিলো, তারা সুইডেনের সর্বোচ্চ্য কঠিন শাস্তি ভোগ করছে।

অনেক বছর পর সুজানের জীবনে পুরনো ঘটনার স্মৃতি এসে হাজির হয়েছে। সুজানের মেয়ের বয়স এখন ১৬ বছর। সে প্রেমে পড়েছে নাম না বলা আরব দেশের এক ছেলের। সুজান ভালোবাসার ট্রাজেডি দেখেছে অতীতে। আজ নতুন করে তার বড় আদরের মেয়ের জীবনের প্রথম ভালোবাসা, যা হয়েছে আরব দেশের এক ছেলের সঙ্গে। এ ভাবনাকে সে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছে না।

আমি বলেছি সুজানকে কথা বলতে ছেলের পরিবার, সুইডিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। যেনো পুরনো কাহিনীর পুনরাবৃত্তি না হয়, যেনো কারো জীবন আবার ধ্বংস না হয় ভালোবাসার কারণে।

আজ সুজানের সঙ্গে কথা শেষ করে বাড়িতে ফিরতে মনে পড়ছে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার কথা। বাংলাদেশেও চলছে সুজানের পরিবারের মতো মর্মান্তিক ঘটনা যা আরো বেদনাদায়ক, কারণ সেখানে নেই বর্ণ বা ধর্মের ব্যবধান। হয়তো থাকতে পারে দারিদ্র্যতার ছোঁয়া। তবুও ঘটছে জীবনের অবসান। নিভে যাচ্ছে ভালোবাসার জ্বলন্ত প্রদীপ প্রতিদিন।

ভালোবাসা মানব জীবনের এক স্বাধীন অধিকার। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু হয়েছে। মার্টিন লুথার কিংয়ের মৃত্যু হয়েছে। গান্ধীর মৃত্যু ঘটেছে। হিটলারের মৃত্যু ঘটেছে কিন্তু ঘটেনি মৃত্যু ঘৃণার, ঘটেনি মৃত্যু হিংসার, ঘটেনি মৃত্যু প্রতিহিংসাপরায়ণতার। একই সঙ্গে চলছে সংগ্রাম ভালোবাসাকে জয় করার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার, ভালোবাসার সেতু তৈরি করার। সুখের সংসার গড়ে তোলার।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×