ও বাতাস ছেড়ে যেও না

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ৩০ জুলাই ২০১৯, ১৩:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

অনুভূতি

সে আমার অত্যন্ত কাছের। সে বসবাস করছে সারাক্ষণ, প্রতিক্ষণ আমার সঙ্গে। আমি তাকে অনুভব করি মন, প্রাণ এবং হৃদয় দিয়ে। আমি তাকে ছাড়া এক মুহুর্ত থাকতে পারিনা। আমি তাকে ছাড়া বাঁচতে পারিনা। এত কাছে তবুও সে আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমি তাকে চোখে দেখিনি। আমি তার নাম শুনেছি।

এ এক মহা বিস্ময়কর অনুভূতি যা শুধু বেঁচে থাকার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। জীবনের এক প্রতিধ্বনি- যার নাম বাতাস। বড় সাধ জাগে এক বার তাকে দেখি, একবার তাকে ধরি, একবার তাকে আদর করি, কিন্তু না তা সম্ভব নয়। বাতাস আমার মধ্যেই বসবাস করছে। অথচ আমার কিছুই করার নেই তার কর্তৃত্বের ওপর।

আমি অন্ধকার দেখেছি, আলো দেখেছি, পানি দেখেছি, গাছপালা দেখেছি, পশুপক্ষী দেখেছি, আমি মানুষ দেখেছি কিন্তু বাতাস দেখিনি, শুধু অনুভব করি। বাতাস ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই। সে থেমে নেই, সে সর্বত্র। তার দেখা নেই, কিন্তু সে সারাক্ষণ রয়েছে আমার সঙ্গে। হঠাৎ যেদিন সে থাকবে না আমার মাঝে, কি হবে আমার! আমিও থাকব না।

সুইডেনের নাম করা একটি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে কাজ করে আমার এক বন্ধু। সেই বন্ধু জন্মগত-ভাবে সুইডিশ না তবে লেখাপড়া শেষে ডাক্তার হয়েছে এখানে। পরে চাকরি এবং বিয়ে করে সুইডেনেই বসবাস করছে। বহু বছর পর বন্ধুর বাবা এসেছেন বেড়াতে। সুইডেন ঘুরছে বেশ মনের আনন্দে, চলছে তার ছুটির দিনগুলো ভালোই।

হঠাৎ একদিন গভীর রাতে শ্বাস প্রশ্বাসে তার সমস্যা দেখা দেয়। বন্ধু তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুলেন্স কল করে। অ্যাম্বুলেন্স এসে তাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়। এ সময়ে তাকে কৃত্রিম উপায়ে নাকের ভেতর দিয়ে অক্সিজেনের দিয়ে অবজারভেশনে রাখা হয়। আধ ঘণ্টা পর তার সমস্ত চেক আপ শেষে তাকে সুস্থ ঘোষণা করে বাড়িতে পাঠাবার অনুমতি দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বন্ধুর বাবার রিলিজের সময় কর্তৃপক্ষ বন্ধুর হাতে তার চিকিৎসার বিলটাও ধরিয়ে দেয়।

বন্ধুর বাবা জানতে চায় বিলটি কতো হয়েছে। ছেলে বলে বাবা না তেমন বেশি না দশ হাজার ক্রোনারের মতো। শুনতেই বাবা হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করেন। বন্ধু বেশ লজ্জায় পড়ে, বলে বাবা তুমি কাঁদছ কেনো? সামান্য কিছু টাকা গেছে তাতে কি হয়েছে? তুমি কি আমার টাকার অভাব দেখেছ বাবা?

বাবা কাঁদছেন আর বলছেন মাত্র আধ ঘণ্টা আমি নরমাল ভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারিনি, তার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দশ হাজার টাকা নিলো? বন্ধু বলছে হ্যাঁ। বাবা আরও উচ্চস্বরে কাঁদছেন। কি ব্যাপার! সবাই অবাক এবং কিছুটা বিরক্তি বোধ করছে। বন্ধু একটু রেগে গিয়ে বলছে বাবা তুমি আমাকে আর ডুবিও না, দোহাই তোমার। বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, আমি কাঁদছি তোর টাকার কারণে নয়, আমি কাঁদছি আশিটি বছর বিনা খরচে নিঃশ্বাস নিয়েছি অথচ কোন বিল দেয়নি। আজ হঠাৎ বিবেক নাড়া নিয়েছে। কি জানি এত বছরের বিলটি কত হয়েছে এবং কিভাবে তা শোধ করব তা তো ভাবিনি কখনও এর আগে!

যে বাতাস প্রতিক্ষণ আমাকে বিনা পয়সায় সব দিয়েছে। আজ হঠাৎ আধ ঘণ্টা আমার সঙ্গে সে ছিল না যার জন্য দশ হাজার ক্রোনার গেল! তাই কাঁদছি বাবা। এবার হাসপাতালের সবাই বাবার কথা জানতে চাইল, কি বললেন উনি? বন্ধু ঘটনার অনুবাদ করে সব জানাল। সবাই শুনে নিস্তব্ধ নিরব হয়ে গেল। বন্ধুর বাবার রিফ্লেকশনে সেদিন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল অনেকের জীবন।

পৃথিবীতে আমরা বাতাসের মতো অনেক কিছু প্রতিদিন বিনা খরচে, না চাইতে যেমন পাচ্ছি তেমন দেদারছে ব্যবহার করছি। ভেবেছি কি কখনও এ পাওয়ার পিছনে কি রহস্য রয়েছে? সবকিছু কি আমরা এখনও জানতে পেরেছি? না পারিনি। কারণ জানার অনেক কিছু রয়েছে বাকি যা হয়তো জানা যাবে না কোন দিনও। বাতাস, তুমি আমার হৃদয়ে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি আর স্মৃতি দিয়ে ঘেরা এক মুহুর্ত যা ঝরে যাবে কোন এক সময়, জানা হবে না সব অজানাকে। সব কথা বোঝা যাবে না, তবুও এ অবুঝ মন একদিন হয়তো খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে যাবে। কর্মময় বাস্তব পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো সব ফেলে, যেদিন তুমি থাকবে না আমার সঙ্গে। পারব কি তার আগে আমার অনুভূতি দিয়ে জীবন চলার সব রহস্য বুঝতে!

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×