সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জার্মান ভ্রমণের দিনগুলো

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৪ আগস্ট ২০১৯, ১০:০১ | অনলাইন সংস্করণ

ভ্রমণ

২৬ বছর পর আবার জার্মানির ফ্রাইবুর্গে এসেছি। ফ্রাইবুর্গ- ব্ল্যাক ফরেস্টের পাদদেশে ফ্রাইবুর্গ শহরটির ‘চার্ম’ আলাদা। বিশেষ করে শহরের পুরনো অংশে পথের ধারে ছোট ছোট নালাগুলো দিয়ে পানি বয়ে চলছে, এই নালাগুলো খুব সম্ভবত শহরের ময়লা পানি নিষ্কাশন প্রণালীর অঙ্গ বিশেষ।

ফার্মাসিয়া বায়োটেকের আমন্ত্রণে বায়োটেকনোলোজি কনফারেন্সে অতীতে আলবার্ট লুডভিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি দুই বার। শহরটির সব কিছুই তখন ভালো লেগেছিল। তারপরও এবারের ভ্রমণে বেশ কিছু অনুভূতি এবং আশপাশের শহরের স্মৃতি যেমন জার্মানির ফ্রাইবুর্গ এবং সেখান থেকে ফ্রান্সের কোলমার (Colmar) ভ্রমণ ছিল অন্যতম।

আমাদের ছেলে জনাথান হায়ার্ড প্লেয়ার হিসাবে সুইডেন থেকে খেলতে এসেছে জার্মান বুন্ডেসলিগানে (German bundersligan)। সে খেলছে কোলন (Köln), ভেটজলার (Wetzlar), ভাইনহেম (Weinheim) এবং মিউনিখে (Munich)।

মারিয়ার (আমার স্ত্রী) ছুটি তাই প্লান করলাম দুজনে মিলে ছেলের টেনিস খেলা দেখতে যাব। প্লেনে ওয়ান ওয়ে টিকিট কেটে রওনা দিলাম স্টকহোম টু জুরিখ ভায়া হামবুর্গ। যথাসময়ে জুরিখ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলাম। সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত অন্য দুটি শহর হলো জুরিখ এবং জেনেভা। বার্ন সুইজারল্যান্ডের রাজধানী। জুরিখের দিকের লোকেরা জার্মান এবং জেনেভার দিকের লোকেরা ফরাসি ভাষায় কথা বলে।

বিশ্বের পর্যটকদের জন্য এটি বিশেষ আকর্ষণীয় একটি দেশ। দেশটির কোন নিয়মিত সেনাবাহিনী নেই। দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা ভারসাম্যমূলক ও অত্যন্ত সুস্থির। সুইস সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিবছর ১ জানুয়ারি তাদের রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন হয়। ছয় বছরের জন্য গঠিত মন্ত্রীপরিষদের একেকজন মন্ত্রী পালাক্রমে এক বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে নয়; তবে সেনজেন কান্ট্রির সঙ্গে জড়িত। সুইস জাতি তাদের নিজেদের গতিতে চলছে। তাদের জীবনের মান নিঃসন্দেহে উন্নত, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় এবং এখানকার সবকিছু খুবই এক্সপেন্সিভ তুলনামূলকভাবে।

আমরা জুরিখে কিছুক্ষণ সময় ঘোরাঘুরির সঙ্গে আর্লি লাঞ্চ সেরে জুরিখ থেকে ট্রেনে প্রথমে সুইজারল্যান্ডের বাসেল, পরে আমাদের গন্তব্য স্থল ফাইবুর্গে এসে পৌঁছালাম সন্ধ্যা আটটায়।

হোটেলে ঢুকে জিনিষপত্র রেখে ডিনারের উদ্দেশ্যে শহরে বেরিয়ে পড়লাম। সেই ২৬ বছর আগে যেসব জায়গা ভালো লেগেছিল সেসব জায়গা ঘুরে দেখা এবং শেষে ডিনার সেরে ফিরে এলাম হোটেলে।

দ্বিতীয় দিন

সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে এবং সারাদিনই হবে। ওয়েদার খারাপের কারণে আমাদের প্লান পরিবর্তন করলাম। স্টেশনে এসে ফ্রাঙ্কফুর্টের উদ্দেশ্যে টিকিট কিনতে দেখি সামারে ট্রেনে ভ্রমণ করা খুবই এক্সপেন্সিভ! কি করি ভাবছি! হঠাৎ মারিয়া বললো গাড়ি ভাড়া করতে।

গাড়ি ভাড়া করলাম ফ্রাইবুর্গ থেকে সরাসরি ফ্রাঙ্কফুর্ট যেতে। ইউরো কার (Euro car) অফিসে বসে আছে এক ভদ্রলোক হঠাৎ নিজের থেকে এসে পরিচয় দিয়ে বললো “হাই, আমি মাইকেল, এটা আমার শহর। দুঃখিত যে তোমরা চলে যাচ্ছ, কাল এখানের ওয়েদার ভালো হবে। চলে যখন যাচ্ছই এবং তোমাদের যখন গাড়ি আছে তাহলে ফ্রান্স হয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট যাও। পথে নতুন কিছু দেখতে পারবে এবং তোমাদের কোন এক্সট্রা সময় নষ্ট হবে না”।

মাইকেল থাকে আমেরিকায়। জার্মানি থেকে আমেরিকায় চলে গেলেও তার বাবা-মা এখনও ফ্রাইবুর্গেই থাকে। তাই সে প্রতি বছর এ সময় বাড়িতে বেড়াতে আসে। গাড়ি ভাড়া করার সময় সে আমাদের কথা শুনে জানতে পেরেছে আমরা স্টকহোম থেকে এসেছি তাই তার কৌতূহল জেগেছে আমাদের সঙ্গে পরিচিত হবার। যাইহোক মাইকেলের সাজেশন অনুযায়ী ফ্রান্সের কোলমার হয়ে যাত্রা শুরু করতে রাজি হয়ে গেলাম। কোলমার (Colmar)। এটি স্ত্রাসবুর (Strasbourg) শহর থেকে ৬৮ কিলোমিটার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে, রাইন নদী থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে ফ্রান্স-জার্মান সীমান্তের কাছে অবস্থিত।

ফ্রান্সের একটি ছোট্ট সুন্দর শহর যাকে ক্ষুদ্র ভেনিস বলা হয়। আঙ্গুর চাষ এবং ওয়াইনের তৈরির জন্য বিখ্যাত। নিউ ইয়র্ক শহরের বিখ্যাত স্ট্যাচু অফ লিবার্টির (Statue of Liberty) অর্থাৎ “মুক্তির মূর্তি”-র ভাস্কর ফ্রেদেরিক ওগুস্ত বার্তোল্দি (Frédéric-Auguste Bartholdi) ১৮৩৪ সালে কোলমার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কোলমার একটি নদীবন্দরও। এটি অনেকগুলো খালের মাধ্যমে রাইন নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। কোলমার ভ্রমণ শেষে ফ্রান্সের ভেতর দিয়ে গাড়িতে করেই পরের শহর সেলেস্তাত (Selestat) এবং শেষে স্টার্সবুর্গ (Starsburg) আসতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। লাঞ্চ সেরে জার্মানের কার্লসরুহে (Carlsruhe) হয়ে মানহেইম (Mannheim) তারপরে ফ্রাঙ্কফুর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

বেশ লম্বা ভ্রমণ। তবে মজার ব্যাপার হলো, ফ্রান্স এবং জার্মানির বর্ডারে তেমন কোন চেকিংয়ের ব্যবস্থা নেই, দিব্যি ঢুকে গেলাম এক দেশ থেকে অন্য দেশে; আবার বেরিয়ে গেলাম কোন কন্ট্রোল ছাড়াই। সারাদিন গাড়িতে বসে ফ্রান্স এবং জার্মানির ছোট বড় অনেক নতুন শহর দেখতে দেখতেই সময় পার হয়ে গেল। যাইহোক সারা দিনের জার্নি শেষে হাজির হলাম ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে। ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেন স্টেশনের কাছে হোটেল বুকিং দিয়েছি বুকিং ডটকমের মাধ্যমে। কিন্তু গলিতে ঢুকতেই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। কারণ রাস্তার দুই পাশে পতিতাদের আনাগোনা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বুকিং বাতিল করে অন্য একটি হোটেলে ঢুকে গেলাম।

নতুন হোটেল বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। হোটেলে ঢুকে চেকিংয়ের পর্ব সেরে চলে গেলাম ফ্রাঙ্কফুর্টের মাইন নদীর ধারে। সুন্দর সুন্দর অনেকগুলো ব্রিজ দেখতে পেলাম। নদীর এপার-ওপারের মধ্যে অপূর্ব এক যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছে এই ব্রিজগুলো। নদীর দুইধার দিয়ে যেমন শহর গড়ে উঠেছে তেমনি হেঁটে যাবার জন্য সত্যি এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

মারিয়া আর আমি হাঁটতে হাঁটতে বহুদূরে চলে এলাম। বলতে গেলে হারিয়ে গেছি বিশ্ববিখ্যাত মাইন নদীর মাঝে। প্রসঙ্গত রাইন এবং মাইন (Rhine and Main river) এই দুই নদী জার্মানির কবলেনজ (Koblenz) শহরে মিলেছে, তারপর তাদের মিলিত ধারা ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের মধ্য দিয়ে মাইন নদী নামে বয়ে চলেছে এবং শহরটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তৃতীয় দিন

আজ আমাদের ছেলে জনাথানের খেলা। তাই সকাল হতেই রওনা দিলাম ভেটজলারের উদ্দেশ্যে। ভেটজলার- ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর থেকে ৭০ কিলো মিটার দূরে। ৪০ মিনিট ড্রাইভের পর এসে পৌঁছে গেলাম ভেটজলার টেনিস ক্লাবে। জনাথানের খেলা শেষে বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরতে।

জার্মানির এক শহর থেকে অন্য শহরের বেশ তফাত নানা বিষয়ে। গ্রীষ্মের সময়ে প্রতিদিনই কোন না কোন মেলা বসে এখানকার বিভিন্ন শহরে। এদের মেলার ধরণ দেখে ছোটবেলায় বাংলাদেশের মেলার সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পেলাম। যেমন নেই কোন দ্বন্দ্ব, নেই পুলিশ, কিংবা নেই কোন গোলমাল, বেশ মধুময় মিলন মেলা, যা দেখে সত্যিই মন ভরে গেল।

চতুর্থ দিন

ভেটজলার ছেড়ে চলে এলাম ভাইনহেমে। ভাইনহেম- এদের অপূর্ব ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। জার্মানদের সঙ্গে জমে উঠল আমাদের আড্ডা। সুইডেনের প্রতি জার্মান জাতির সব সময় আলাদা একটা দুর্বলতা রয়েছে যা আমি এর আগেও লক্ষ্য করেছি।

সুইডেন সম্পর্কে জানতে তাদের আগ্রহের শেষ নেই। এদিকে ভাইনহেমের আবহাওয়া কিন্তু ঠিক বাংলাদেশের মতই, বিশেষ করে সামারে। যা এই শহরে ঢুকতেই অনুভব করেছি। ভাইনহেম শহরটি ফুলে ফলে ভরা। জার্মানরা শুধু টেকনোলজি নয়, ফার্মিংয়ের ওপরও এদের যথেষ্ট পারদর্শিতা রয়েছে। তার প্রমাণ এই শহরেই দেখলাম। বিশাল আয়তনের এই দেশ যেখানে কোন কিছুরই অভাব নেই বলে মনে হলো। দেশ গড়ার পেছনে এদের অবদান দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।

পঞ্চম দিন

আমাদের ছেলের খেলা শেষ। সে আজ মিউনিকে চলে গেল; সেখানে তার আরেকটি খেলা রয়েছে। আর আমরা ফিরে এলাম ফ্রাঙ্কফুর্টে। ফ্রাঙ্কফুর্ট- ফ্রাঙ্কফুর্টই জার্মানির একমাত্র শহর যা প্রথম দশটি ‘আলফা ওয়ার্ল্ড সিটি’র একটি। মাইন নদীর তীরে গড়ে উঠা মেলার শহর ফ্রাঙ্কফুর্ট যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় "ইন্টারন্যাশনাল মোটর শো", পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বই মেলা এবং সঙ্গীতের বিভিন্ন সরঞ্জাম, লাইটিং, রেকর্ডিং এবং সাউন্ড রিইনফোর্সমেন্ট ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মেলা তাই এখানে চলছে আনন্দ আর উৎসব, যা দেখে আমার কিছুটা হিংসা হলো। কারণ এরা এত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছে অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই এখনও মানুষের খাবার জোটেনা।

দেশ-বিদেশ ভ্রমণে এতটুকু বুঝেছি, সেটা হলো জীবনে কিছু পেতে হলে দরকার কঠিন পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা, সুশিক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সর্বোপরি দেশের পরিকাঠামো এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা একটি বিশেষ দিক যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে সব জাতি সব বিষয়ে বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে, তাদের মধ্যে একটি জিনিসের খুব মিল, তাহলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। জাপান, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি উল্লেখযোগ্য।

ভ্রমণের শেষ দিনে ফ্রাঙ্কফুর্টের মাইন নদীর স্রোতের সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে বাংলাদেশের নদীগুলোর পরিবেশ যদি এমনটি হতো! কোন নোংরামির চিহৃ মাত্র নেই। নদী ঝলমল পানি টলমল এক পরিষ্কার নদীর দৃশ্য যা মনে করিয়ে দিল ছোটবেলার নবগঙ্গাকে, যেখানে সাঁতার কেটেছি প্রতিদিন। তবে সত্যিই মাইন নদীকে দেখে মন ভরে গেল।

এবার বাড়ি ফেরার পালা। আজ ঈদুল আজহার দিন। কোরবানি আমাদের জীবনের সব নোংরামি, হিংসা, গ্লানি দূর করুক; একই সঙ্গে পরিষ্কার করুক আমাদের মন এবং প্রাণকে ভালোবাসার মাধ্যমে, তেমনটি প্রত্যাশায় সবাইকে ঈদ মোবারক।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×