এমন কাকতালীয় ঘটনাও ঘটে!

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১৮:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

ছবিতে মধ্যখানে বেনেডেট
ছবিতে মধ্যখানে বেনেডেট

ইউরোপ ট্যুরে আছি। ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্টে এসেছি। জার্মান ব্রেকফাস্ট সবই আছে মোটামুটি। কফির মেশিনে গিয়ে ক্যাফে ল্যাটের জন্য মেশিনে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করছি আমার কফির জন্য। সাইড থেকে একজন মহিলা কথা বলতে শুরু করল।

- হ্যাই গুড মর্নিং। হাও আর ইউ?

বললাম ভালো, তো সাত সকালে তোমার আবার কী মতলব বলে একটু হেসে দিলাম।

- মতলব তেমন কিছু না; তবে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি এখানে বেড়াতে এসেছ, তাই ভাবলাম তোমাকে বলি আজ আমাদের শহরে বিশাল মেলা বসবে। সেখানে যাবে কি?

বললাম, মেলা বসবে, কোথায় তা জানতাম না তো! তা কী হবে সেখানে? - গানবাজনা, নাচ ইত্যাদি।

ও তাহলে তো যেতে হবে। বেশ ভালো, আমরা তাহলে এক সঙ্গে যাব।

- আমরা মানে?

তোমার স্ত্রী, আমার স্বামী, তুমি এবং আমি।

- আমার নাম বেনেডেট। আমি জার্মান তবে বসবাস করি প্যারিসে।

এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলছি। হঠাৎ আমার স্ত্রী মারিয়া এসে বললো, এই দেখো তুমি সেই এসেছ কফি আনতে অথচ খোঁজ নেই। বললাম খোঁজ থাকবে কি করে দেখো না পড়েছি কার পাল্লায়! পড়েছি মানে? তাকে তো আমি চিনি, গতকাল পরিচয় হয়েছে। আমি বললাম সমস্যা তো ওখানেই, তাইতো ভদ্রতার খাতিরে কথা বলতে হচ্ছে।

এবার সবাই এক সঙ্গে বড় টেবিলে বসে সকালের ব্রেকফাস্ট, সঙ্গে পরিচয় পর্ব সেরে নিলাম। বেনেডেট প্যারিসে থাকে। বড় লোক বাবা-মার এক মাত্র মেয়ে। জার্মানে সব থাকতেও প্যারিসে বসবাস। তার ধারনা ফ্রান্সের মানুষ জার্মানদের ফ্যাসিস্ট বলে এখনও মনে করে। দীর্ঘ ১০ বছর বসবাস করছে সেখানে অথচ তাদের সঙ্গে এডজাস্ট করে চলতে পারছে না।

আমি যে সুইডেনে থাকি এবং আমার তেমন অনুভূতি আছে কি এ বিষয়ে, তার জানার খুব সখ হয়েছে। শেয়ার করলাম আমার অভিজ্ঞতা। বেনেডেট বয়সে আমার ছোট হবে। চেহারা দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। সোনালী চুল, নীল রংয়ের চোখ, স্লিম গঠন। চোখে মুখে হাসি খুশিতে ভরা।

তার স্বামীর নাম পেয়ারস। টিপিক্যাল ফ্রেন্স। এদের কোন ছেলে-মেয়ে নেই। সব কিছুতে বেশ রাজকীয় ছোঁয়া। তবে মন বেশ খোলামেলা। আমাদের আড্ডা জমেছে ভালোই। সবাই একসঙ্গে শহর ঘুরে দেখা, লাঞ্চ করা পরে চা কফি শেষে বেনেডেট বললো, আজ সন্ধ্যায় তার বাবা-মার ওখানে ডিনারের দাওয়াত রয়েছে, তো আমরা কি তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারি?

মারিয়া বললো হ্যাঁ যাওয়া যেতে পারে। শুনেই সে বেশ খুশি হয়ে তার বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিল ব্যাপারটা। আরও ঘণ্টা খানেক শহর ঘোরাঘুরির পর বেনেডেট বললো চলো বাড়িতে যাই। লাক্সারি পোর্সে গাড়ি চলতে লাগলো পাহাড়ের দিকে। পরে আধা ঘণ্টা ড্রাইভের পরে হাজির হলাম এক রাজকীয় প্রাসাদে।

ভাবতেই বিশ্বাস হচ্ছে না এই ভেবে, হঠাৎ পরিচয় হোটেলে পরে এত অল্প সময়ে এত কিছু ঘটে চলেছে দ্রুততার সঙ্গে, কিছুটা মিরাকেলের মত মনে হচ্ছে। বেনেডেটের বাবা ল্যান্ড লর্ড। তিনি গর্বিত জার্মান। মেয়ে বেনেডেট বিয়ে করেছে ভালোবেসে পেয়ারসকে এবং সে ফ্রান্সের আরেক জমিদারের ছেলে। বলতে গেলে ধনীতে ধনীতে মেলামেশা, ওঠাবসা। বেনেডেটের বাবা-মার প্রাসাদ, বাগান সব ঘুরে দেখার পরে যোগ দিলাম গালা ডিনারে। আয়োজন করেছে বিশাল। সব দেখে লাগছে মন্দ না। তবে আমার ভাবনায় ঢুকেছে কি রহস্য থাকতে পারে এর পেছনে? মারিয়াকে একবার জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কী? মারিয়া বললো সব সময় ব্যাপার নিয়ে ভাবার দরকার নেই।

ডিনার শেষে বেনেডেটের বাবা-মার থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। লবিতে কিছুক্ষণ বসে কথা প্রসঙ্গে আমি জিজ্ঞেস করলাম বেনেডেটকে- আমি কি তোমাকে এর আগে কোথাও দেখেছি? বা তুমি কি আমাকে চেন? ও বললো কি মনে হয় তোমার? বললাম কোথায় যেন দেখেছি কিন্তু সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারছি না।

২০১৭ সালে লন্ডন Knightsbridge এর Brompton Road এর ওপর লন্ডনের দোকানপাটের মধ্যে সবচেয়ে নামকরা দোকান হচ্ছে হ্যারোডস। মারিয়ার জন্য একটি ড্রেস কিনব। ড্রেসটি আমার বেশ পছন্দ হয়েছে কিন্তু সাইজটা নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েছি। হঠাৎ একটি মেয়েকে দেখলাম পাশে, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ড্রেসটি যদি ট্রায়াল দেয় তাহলে আমার জন্য কিনতে সহজ হবে।

মেয়েটি বেশ রাজি হয়ে গেল। তাকে বেশ মানিয়েছিল ড্রেসটি। তখন আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় দেই এবং ড্রেসটি মারিয়ার জন্য কিনি। বেনেডেটের সঙ্গে গতকাল রাতে মারিয়ার দেখা হয়েছে এবং ঠিক তখন মারিয়ার গায়ে সেই ড্রেসটি এবং একই সঙ্গে মারিয়ার সঙ্গে সে আমাকে দেখেছে। তাই সে মারিয়াকে ড্রেস কেনার ঘটনাটি খুলে বলেছে যা আমার জানা নেই।

তারা বিষয়টি গোপন রেখেছে তাদের মাঝে। বেনেডেট অবাক হয়েছিল এই ভেবে যে একটি অপরিচিত মেয়েকে হ্যারোডসে জিজ্ঞেস করা একটি ড্রেস ট্রায়াল দেয়ার জন্য! সে আমাকে ভালো মত অবজার্ভ করেছিল সেদিন যা আজ বুঝতে পারলাম দীর্ঘ তিন বছর পর।

জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে তবে এমনটি বিস্ময়কর ঘটনা জানি না আর কারও জীবনে ঘটেছে কিনা! তবে ঘটেছে আমার জীবনে। বেনেডেটের সঙ্গে মারিয়ার বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। আমরা তাদের প্যারিসের ঠিকানা নিয়েছি এবং স্টকহোমে নিমন্ত্রণ করেছি। আবার দেখা হবে তাদের সঙ্গে তবে জানি না কোথায়- প্যারিস, জার্মান নাকি স্টকহোমে!

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×