শুধু অর্থে আর স্বার্থে নয়, এসো বিবেকেও ধনী হই

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১২:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

বিবেকে

বেশ মনে পড়ছে ছোটবেলায় গণিতের সুদ-মূলের হিসাব নিকাশ শেখার কথা। যেমন পাঁচশ টাকার ধান যদি সাতশ পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করি শতকরা কত লাভ হলো অথবা যদি তিনশ টাকায় বিক্রি করি তাহলে কত লস হলো ইত্যাদি। আবার শিখেছি বিভিন্ন দামে জিনিস কিনে তাকে গড় করে বিক্রি করার পর কি পরিমাণ লাভ বা লোকসান হলো তার ওপর।

সব চেয়ে মজার ব্যাপার ছিল শিক্ষার ধরণ। বিয়োগ করার সময় দেখা গেছে ওপরের সংখ্যা ছোট কিন্তু নিচের সংখ্যা বড়, তখন দশকে ধার করা হয়েছে। কিন্তু হিসাব করার সময় জোরে জোরে বলেছি, পাঁচ আর কত হলে বারো হয়, উত্তর সাত, হাতে আমার এক। সংখ্যা দশকে ধার করে দুইকে বারো করেছি, তারপরও বলা হতো হাতে আমার এক। মাঝে মধ্যে ভাবি ধার নেবার পরও হাতে আমার এক কিভাবে থাকে!

সেই কবে দেশ ছেড়েছি। বর্তমানে লেখাপড়ার ধরণ সম্পর্কে কিছু জানিনা। তারপর বিদেশে বিভিন্ন কর্ম এবং সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছি। হিসাব নিকাশ সম্পর্কে খুব একটা ভাবিনা। সময় চলে যাচ্ছে। মাসে একটা ইনকাম রয়েছে আবার খরচ হচ্ছে। কখনও কিছু সেভিংস হয়, কখনও হয়না। কখনও মাইনাস, কখনও প্লাস, এই ভাবে এডজাস্ট করে চলছি।

আমরা ছোটবেলায় গণিত শিখেছি গড়, শতকরা লাভ লোকসান এবং সেভাবে শেখার সঙ্গে চিন্তার সমন্বয় ঘটেছে তখন। মনে পড়ে গেল সেই বহু বছর আগের কথা। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। প্রায় তিন মাস গ্রামেই ছিলাম। বাবা তার চাকরি শেষে নানা ধরনের ব্যবসা শুরু করেছেন। বাজারে বড় বড় গুদাম ঘর রয়েছে। তারপর নহাটা একটি নামকরা জায়গা, নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বড় হাট বসে সপ্তাহে দুবার এখানে।

বাবা বললেন যদি আমি তার ব্যবসার কাজে একটু সাহায্য করি। যদিও উনার কর্মচারী রয়েছে এবং তারা তাদের সাধ্যমত কাজ করে। তবে বাবা জানতে পেরেছেন কেরানি বাবু একটু এদিক ওদিক করেন কাগজে কলমে। ধান পাট কেনা এবং তা গুদামজাত করা, কিন্তু সেই হিসাব নিকাশটা স্কুলের শেখা গণিতের মতো ছিল না। ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। তাই কয়েকদিন কেরানি বাবুর সঙ্গে বসে হিসাবের নিয়ম গুলো জেনে নিলাম।

পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগ পর্যন্ত বাবার ব্যবসায় বেশ আনন্দের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। বিভিন্ন হাট থেকে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান, পাট, মুসুরি, সরিষাসহ নানা ধরনের পণ্যদ্রব্য কিনে তা খুলনায় নৌকায় করে পাঠানো হতো। স্বাভাবিক ভাবেই ১০-২০% প্রফিট হলেই বিক্রি করতাম।

তখন দুটো জিনিস লক্ষ্য করেছি। একটি ছিল পাট, যা অনেক সময় ভালো করে না শুকিয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করেছে অনেকে।

আমি চেষ্টা করতাম পাটের ভেতরে দেখতে যে বেশি নরম কিনা। কারণ ভেজা হলে তা নষ্ট হবে এবং ওজন কমে পরে লস হবে। অন্যান্য পণ্যেও কিছুটা ভেজাল ধরা পড়েছে, যেমন মুসুড়ির মধ্যে দেখা গেছে বাজারি মিশিয়ে বিক্রি করতে, অনেকে ধরা খেয়েছে।

যদি কেও ভেজাল বা পানি মিশিয়েছে এবং ধরা পড়েছে, তখন ঘটনাটি তুমুল আকারে এলাকায় ছড়িয়ে পড়েতো।

সে যে কি লজ্জার বিষয় ছিল তার পরিবার এবং তার জন্য।

যদিও কাঁচা মালের বেচাকেনা সব সময়ই জটিল। কারণ বেশির ভাগ ফ্রেশ জিনিস ওজনে কেনাবেচা হয়। গরমে ওজন কমতে শুরু করে, যার কারণে ক্রেতার থেকে বেশ সস্তায় কিনে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। তবে জিনিসের ওজন কমার জন্য লাভের অংশটা খুব একটি বেশি হয়না।

৪০ বছর আগে ফাঁকি বা ভেজাল দেয়া যে ছিলো না, তা বলা ঠিক হবে না। তবে তার মাত্রা বর্তমানের মতো না। কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করার নাম ব্যবসা। ভেজাল বা বিষাক্ত জিনিস মিশিয়ে কিছু বিক্রি করার মতো মন মানুষিকতা মানুষের তখন ছিলো বলে মনে হয় না।

বর্তমানে যে যত ফাঁকি দিতে পণ্ডিত, বা যে যত ভেজাল মেশাতে পারে, সেই তত পারদর্শী। এই চিন্তা চেতনা বাংলাদেশে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কি কারণ থাকতে পারে এর পেছনে? লোক সংখ্যা বেশি? কিন্তু উৎপাদনও তো হচ্ছে বেশি।

আমার মনে পড়ে যেমন জমিতে বছরে এক থেকে দুই ধরনের ফসল হতো তখন। নদী, নালা, খাল, বিল এবং কিছু কিছু লোকের পুকুরে সাধারণত যে মাছ পাওয়া যেত তাই ছিল যথেষ্ট। একটি উন্নত মানের গাভীতে বড় জোর দুই থেকে তিন কিলো দুধ হতো। তার পরও দুধ কিনতে সমস্যা হতো না বা দোকানে ভেজাল মিষ্টি পাওয়া যেত না।

বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সব কিছু তৈরি হচ্ছে বহুগুনে বেশি এবং মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে, এ সত্বেও মানুষ জেনে শুনে ভেজাল বা ফাঁকি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু কেন? শিক্ষিত লোকের পরিমাণ বেড়েছে, সচেতনতা বেড়েছে, অথচ দুর্নীতি কমেনি বরং বেড়েই চলেছে।

আমি ছোট বেলায় গ্রামে মাসে একবার পুলিশের আনাগোনা দেখেছি বলে মনে হয় না। এখন গ্রামে গ্রামে পুলিশের ফাঁড়ি, তারপরও অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক উন্নতি হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, বিদেশে লেখাপড়া, চাকরীর সুযোগ হয়েছে। প্রশাসন জনগণের কাছে এসেছে। প্রত্যেকটি নাগরিক একেকজন সাংবাদিক। কারণ গণমাধ্যমের সাহায্যে যার যা খুশি তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। তারপরও সারাক্ষণ সমস্যা আর সমস্যা। এর পেছনে কি কারণ থাকতে পারে!

অন্যদিকে আরেকটি জিনিস খুব ভীষণভাবে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, তা হলও ধর্মীয় আচরণ। আমি ছোটবেলায় দেশের যে সব স্কুলে পড়েছি, সেখানে মেয়েদের মার্জিত পোশাকে দেখেছি। কিন্তু এখন একটি মেয়েশিশুর মুখ পর্যন্ত দেখা যায় না।কারণ তাকে শিশুকাল থেকেই বোরকা পরানো হচ্ছে। তার পরও এত পরিমাণ ধর্ষণ বিশ্বের অন্য কোথাও হচ্ছে কিনা তা এই গণমাধ্যমের যুগেও শুনিনি। সর্বোপরি শিক্ষক এবং ধর্মীও শিক্ষকের ছোবলে পড়ে যে পরিমাণ ধর্ষণের খবর শুনছি তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। এদিকে খুন, ঘুষ, দুর্নীতি, ভোট কারচুপি এসবও কিন্তু আগের তুলনায় বেশি বেড়েছে।

হঠাৎ কেন আজ এসব কথা? কারণ একটাই তা হলো আমাদের বিবেকের অবক্ষয় হয়েছে। একটি উদাহরণ দিই, একটি জন্মদিনের কেক দিয়ে শুরু করি। একটি পরিপূর্ণ সুন্দর বড় কেক হঠাৎ যদি তার এক বা দুই পিস কেটে সরিয়ে ফেলা হয়, বা খেয়ে ফেলা হয় এবং পরে যদি তা জন্মদিনের পার্টিতে সার্ভ করা হয়, তখন সবার নজর পড়বে কেকের মিসিং অংশের উপর। কি পড়বে না? অবশ্যই পড়বে। তেমনি একটি উদিয়মান দেশের পরিকাঠামোতে যদি নৈতিকতা, মানবতা, বিবেক, সুচিন্তা, সুভাবনা, সরলতা, আন্তরিকতা, মনুষত্ব্যবোধ বা সুশিক্ষা না থাকে তখন দেশের পরিকাঠামোয় অপরিপূর্ণতা থেকে যায়।

বর্তমান বাংলাদেশে সব থাকতেও যে জিনিসটার অভাব মনে হচ্ছে, তা হলো আমরা আমাদের বিবেকের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছি। আমি রেগে যাব, আমি মন খারাপ করব, আমি কাঁদব, আমি হাসব, আমি মানুষের কথা ভাবব। আমি সোনার বাংলার কথা ভাববো। আমি শুধু অর্থে আর স্বার্থে নয় আমি মানসিক ভাবেও বড় লোক হব। আমি বিবেককে সঙ্গে রেখে চলব। আমি একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়বো।

আজ বিবেক দূরপরবাস থেকে মনে করিয়ে দিল রবি ঠাকুরের কিছু কথা-

“খোলো খোলো দ্বার, রাখিয়ো না আর

বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে।

দাও সাড়া দাও, এই দিকে চাও

এসো দুই বাহু বাড়ায়ে॥”

তাই এসো হে বন্ধু এসো, আজ সেই অপরিপূর্ণতাকে (বিবেকের ভারসাম্য, যা হারিয়ে ফেলেছি) পূরণ করার অঙ্গীকার করি এক সঙ্গে।

এসো মনের দ্বার খুলে সেই হারানো বিবেককে আমরা ফিরিয়ে আনি আমাদের হৃদয়ে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×