কোরবানি দিয়ে কী হবে যদি বিবেক নোংরা থাকে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২০ আগস্ট ২০১৯, ১৯:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

কোরবানি দিয়ে কী হবে যদি বিবেক নোংরা থাকে

ল্যাটিন শব্দ সিন্ডিকাস (syndicus) যার অর্থ একটি ইস্যুর তত্ত্বাবধায়ক। ফ্রেন্স ভাষায় সিন্ডিকেটের (syndicate) অর্থ শ্রমকল্যাণ সমিতি (trade union)। অন্য ভাবে বলা যেতে পারে কোন উদ্দেশ্যে বা স্বার্থে মিলিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সমবায়। রেপ (rape) শব্দের বাংলা অর্থ ধর্ষণ।

করাপশন (corruption) শব্দের বাংলা অর্থ দুর্নীতি। সিন্ডিকেট কি ধর্ষণ বা দুর্নীতির চেয়ে জঘন্য কিছু? হ্যাঁ সিন্ডিকেট সত্যিকার অর্থে সমাজের চোখে এক ধরনের আচরণ বা অপরাধ যা ধর্ষণ বা দুর্নীতির চেয়ে জঘন্য। সিন্ডিকেট হতে পারে একজন ব্যক্তি, একটি স্বতন্ত্র সংগঠন, সংস্থা, কর্পোরেশন বা কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসা পরিচালনার জন্য গঠিত একটি সংগঠন, একটি ভাগের সুদ অনুসরণ বা প্রচার করা।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রুপগুলো তাদের মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে। তবে কথ্য ইংরেজিতে "সিন্ডিকেট" শব্দটির ব্যবহার প্রায়ই অবৈধ কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। সিন্ডিকেট সমাজে নতুন কিছু নয়। গ্রামীণ ব্যাংক এমন কাজ করে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছে। তার মানে বিশ্বে সিন্ডিকেট সর্বজন স্বীকৃত।

প্রসঙ্গত এবারের চামড়া নিয়ে যে সিন্ডিকেট হয়েছে এখানে আভ্যন্তরীণ সমস্যা ছাড়াও কিছুটা গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট জড়িত যেমন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের ধাক্কা সামলাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দেশ দুটি তাদের গত কয়েক মাসের বাণিজ্য যুদ্ধকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে এর উদ্দেশ্য হলো কে কাকে টপকে বিশ্বের প্রযুক্তি নেতায় পরিণত হবে? অর্থাৎ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কে নেতৃত্ব দিবে- যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন? চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক এবারের কোরবানির চামড়ার উপর কিছুটা প্রভাব ফেলেছে।

চীন বাংলাদেশের চাপড়া আমদানি দেশ হিসাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে, যা এবারের ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপরিপক্ব রাজনৈতিক ব্যবহার বাংলাদেশের দরিদ্র এতিমদের জীবনে অন্ধকার ঘনিয়ে আনতেও বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় চীন এক্ষেত্রে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছে।

সিন্ডিকেট নানা ধরনের হতে পারে যেমন অনেক সময় বিপদে পড়ে যদি কেউ ঋণপ্রদানকারীর কাছে এসে সোনার গহনা বন্ধক রাখে ঋণ পেতে, তখন মাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বা কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে সোনার গহনা ফেরত পাওয়া যায় না।

সাধারণত ঋণগ্রহণকারীরা বিবাহ বা সন্তানের শিক্ষার মতো আকস্মিক আর্থিক প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য এই ধরনের ঋণ নিয়ে থাকে। সোনা বিক্রয় করার পরিবর্তে, অনেকে এ ধরনের ঋণের বিকল্প বেছে নেয়। পরে দেখা যায় পুঁজিপতি বিপদ গ্রস্থের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সুদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং সর্বশেষে ঋণগ্রহণকারী সর্বস্বান্ত হয়।

যেখানে যত অরাজকতা সেখানে তত সিন্ডিকেট দেখা যায়। একটি জাতি, একটি দেশ যখন রাষ্ট্র পরিচালনার ভারসাম্য হারাতে থাকে তখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশে ডেঙ্গু, দুর্নীতি, অবিচার, অরাজকতা এবং সিন্ডিকেটের মত ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে শুরু করে। তখন দেশ, দেশের মানুষ হারিয়ে ফেলে মনুষ্যত্ববোধ এবং বিবেকের ভারসম্য।

আর্থিকভাবে যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং সাবলম্বী, প্রায় সকলেই কোরবানি দিয়ে থাকে। এটা আল্লাহর তা’আলার সীমাহীন অনুগ্রহ এবং তাঁর আদেশ পালনের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শন। নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ এবং কোরবানি সবই আল্লাহ তা’আলার আদেশে রাসূল (স)-এর অনুকরণে মুসলিম জাতি পালন করে থাকে।

ইসলামে কোরবানির অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত কোন প্রিয় বস্তু, আল্লাহ তায়ালার দরবারে পেশ করা এবং শরীয়ত-নির্দেশিত পন্থায় তা ব্যবহার করা। কোরবানির ঈদে পশুর চামড়ার একটি ব্যবহারিক তাৎপর্য রয়েছে বিধায় তার থেকেও অনেকে উপকৃত হয়ে থাকে।

কোরবানির চামড়ার একটি মোটা অঙ্কের অর্থ ধর্মীও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এতিমখানায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পশুর চামড়ার আয়ের অর্থ থেকে এতিমখানা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের খাবার থেকে শুরু করে অধিকাংশ সামগ্রী কিনে থাকে। বলতে গেলে এতিমখানার অর্থের প্রধান অংশ আসে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে।

এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম এতটাই নিম্নমুখী যে, কাংখিত অর্থ উপার্জন তো দূরের কথা, চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে যে ব্যয় হয়েছে তাও ওঠে আসেনি। যার ফলে চামড়া নিয়ে কারসাজির কারণে কপাল পুড়েছে এতিমদের।

এখন আমার প্রথম প্রশ্ন: চামড়া শিল্পের ক্ষতি মানে কি শুধু এতিম খানার ক্ষতি? চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে এতিম, দুঃস্থ শিক্ষার্থী ও অসহায়দেরও ভাগ্য নষ্ট হয়েছে। সারাদেশে এবারের ঈদুল আজহায় চামড়ার নজিরবিহীন দরপতন হয়েছে। ন্যায্য মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেক বিক্রেতা এবং বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া রাস্তায়, ডাস্টবিনে, মাটিতে পুতে রেখে প্রতিবাদ করেছে। এটা গেল একটা দিক।

আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন: পশুর চামড়া কি আমাদের জাতীয় সম্পদ নয় যেমন ধান, মাছ, গ্যাস, বনজ সম্পদ বা পাটের মত? তা যদি হয়ে থাকে তাহলে কি করে সম্ভব এত বড় অরাজকতা করার? যেখানে রয়েছে মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার। যেখানে রয়েছে গণতন্ত্রের পরিকাঠামো কাগজে কলমে।

তবে যদি চামড়া শুধু কোরবানির ঈদ উপলক্ষ এবং ধর্মীয় বিষয় হয়, যদি এতিম বা গরীব দুঃখীর সম্বল হয়, তাহলে এ সিন্ডিকেট জাতির মরাল ভ্যালুর (moral value) একটি অধঃপতনের সনদপত্র। দেশকে বহিঃশত্রুর মোকাবেলা করতে সশস্ত্র বাহিনী গঠন করা হয়েছে।

আমার তৃতীয় প্রশ্ন: আভ্যন্তরীণ শত্রুর মোকাবেলায় কোন বাহিনী গঠন করা হয়েছে? যদি গঠন করা না হয়ে থাকে তবে সময় এসেছে তা গঠন করার। বাংলাদেশ যে গণতন্ত্রের প্রাকটিস করছে তাতে করে আমার মনে হয় না দেশের পরিস্থিতির মোকাবেলা করা সম্ভব।

সময়ের সাথে দেশের বিভিন্ন ন্যাসটি এক্টিভিটিস যেমন দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, ঘুষ, আইনের অবৈধ প্রয়োগ সবই এখন ক্ষমতাশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই দেশে যার যা খুশি তাই করছে। এভাবে চলতে থাকলে শেষে এদেরকে বর্জন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব হবে, শেষে দেশ যাবে রসাতলে।

এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে রেহাই পেতে দরকার এডিস মশার মত সানেটাইজ করা পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে, দরকার প্রতিরোধ করা। কোরবানির উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করা। কিন্তু যে কাজ বাংলাদেশে হয়েছে এবারের চামড়া নিয়ে তাতে কি মনে হয় আমরা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি!

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×