শিশুশিক্ষায় পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে মরাল ভ্যালুর সমন্বয় ঘটাতে হবে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

শিশুশিক্ষা

গত সপ্তাহে সুইডেনের ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য ছিল স্কুল জীবনের প্রথম দিন। প্রাইমারি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে তাদের শিক্ষা/প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। ছয়টি বছর তাদেরকে নানাভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এই প্রথম শ্রেণিতে লেখাপড়া শুরু করার জন্য।

সুইডেনে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি অবধি শিক্ষা সবার জন্য ফ্রি এবং বাধ্যতামূলক।

আজ এখানকার এক স্কুলে অনুমতি নিয়ে ক্লাসের শিক্ষা পদ্ধতি জানার জন্য পেছনে বসে সব জানতে চেষ্টা করলাম। শ্রেণীকক্ষে সবাই যার যার চেয়ার-টেবিলে বসে বেশ মনোযোগী। শিক্ষক একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, এরিক বলতো কালো আর সাদার মধ্যে পার্থক্য কি? এরিক বললো, আমাদের বাড়িতে একটি কুকুর আছে তার গায়ের রঙ সাদা কিন্তু আমার দাদা-দাদির যে কুকুরটা তার রঙ কালো। শিক্ষক বললেন তার মানে? এরিক বললো পার্থক্য শুধু রংয়ের স্যার।

শিক্ষকের সঙ্গে যখন আলোচনা চলছে তখন দেখা গেল অন্য সবাই তাদের মতো করে বেশ যুক্তি দিয়ে কালো এবং সাদার পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করছে একে অপরের সঙ্গে। ক্লাস শেষে শিক্ষককে একটু কিউরিয়াস হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার কি অবস্থা শিক্ষার্থীদের? স্যার বললেন এদের প্রিপ্যারেশন (preparation) ভালো এবং এরা এনগেজড (engaged) ক্লাসের আলোচনায়।

আমি আরও লক্ষ্য করলাম মুখস্থ বলে কিছু যে থাকতে পারে তা এদের প্রশিক্ষণের ধরণ দেখে মনে হলো না। কারণ এদের প্রশিক্ষণে ‘জানার জন্য শেখা’ কনসেপ্টের গুরুত্বই বেশি দেখলাম। ক্লাস শেষে সবার সঙ্গে লাঞ্চে গেলাম। আজ লাঞ্চের মেনুতে পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু সুইডিশ প্যানকেক রয়েছে যা সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন শিক্ষার্থীদের জন্য থাকতেই হবে। এছাড়া একসঙ্গে মিলেমিশে লাঞ্চ করা এদের স্কুলজীবনের একটি মধুময় মুহূর্ত।

অনেকেই হয়ত ভাবতে পারে ছয় বছর বয়সে ক্লাস ওয়ানে পড়া বা প্রথম শ্রেণি শুরু করলে লেখাপড়া শেষ হবে কবে? প্রথমত লেখাপড়ার শেষ নেই, এটা নির্ভর করছে কে কি পড়তে চায় তার ওপর। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, রসায়নবিদ বা যাই পড়ুক না কেন ২৫-২৬ বছর বয়সের মধ্যেই লেখাপড়া শেষ এবং পরে চাকরিতে যোগ দেয়া।

যদি কেউ পিএইচডি করতে চায় তখন সময় বেশি লাগতে পারে এবং সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের (Goals and Objects) উপর নির্ভর করছে শিক্ষা প্রশিক্ষণের সময়কাল।

পাশ্চাত্যে শিক্ষার সঙ্গে কর্মের একটি সামঞ্জস্যতা রয়েছে বিধায় কেউ বেকার হয়ে দিনযাপন করে না যা আমাদের সমাজে লক্ষণীয়।

এদের শিক্ষার পরিকাঠামোতে লং রেঞ্জ প্ল্যান (long range plan) রয়েছে। এরা সবকিছু বিবেচনা করে শিক্ষা এবং কর্মীর সংখ্যা নির্ধারণ করে থাকে। যেমন কি পরিমাণ লোক আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে রিটারমেন্টে (retirement) যাবে। কি ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ হবে সারাদেশে। কোন ধরনের দক্ষ কর্মীর দরকার তার জন্য। তারপর প্রযুক্তির যুগে বহির্বিশ্বে কি পরিমাণ কোয়ালিটি বেইজড (quality based employee) কর্মী রপ্তানি হবে বা কি পরিমাণ আমদানি করা দরকার হতে পারে ইত্যাদি বিষয়ে এদের যথেষ্ট সচেতনতা রয়েছে।

আমার এই লেখার উদ্দেশ্য হলো এদেশের শিশুশিক্ষার পদ্ধতিকে তুলে ধরা। কেন ছয় বছরের আগে এরা শিশুকে গুরুতরভাবে স্কুল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে না? আর কেনোই বা ভিন্নভাবে শিশুকে এরা প্রস্তুত করে? এরা শিশুশিক্ষার শুরুতে হাতেনাতে সবকিছু শেখায়। আবার খেলাধুলার মাধ্যমে নানা বিষয়ের ওপর নানাভাবে সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে শিশুকে গড়ে তোলে। কারণ এরা মনে করে শিশুর ক্রিয়েটিভিটি এবং সে কি পছন্দ করে বা ভবিষ্যতে সে কি হতে চায় এর জন্য দরকার প্রস্তুতির। তাকে ছকে (ফর্মেটে) না ফেলে বরং সুযোগ করে দেয়া হয় যাতে করে তাদের মধ্যে ন্যাচারাল ট্যালেন্টের বিকাশ ঘটে।

এটা একটি শিশুর জন্য বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার পরবর্তী দিকনির্দেশনার জন্য। কারণ জোর করে কিছু করানো আর নিজের থেকে কিছু করার প্রবণতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে তা এদেশের শিক্ষাপদ্ধতির ধরণ দেখলে বোঝা যায়। শিক্ষকদেরকেও ঠিক একইভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যাতে করে তারা তাদের প্রশিক্ষণকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।

একটি শিশুকে তার মতো করে গড়ে তুলতে সাহায্য করা এবং সেই ধরণের পরিবেশ সৃষ্টি করা আশু প্রয়োজন দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সুইডেনের মানুষের মরাল ভ্যালু (moral value) এবং তাদের বিবেকের বহিঃপ্রকাশে একটি জিনিস লক্ষণীয় আর তা হলো এরা মানুষের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম সারিতে। মানবতা এবং মনুষ্যত্বে এরা অসাধারণ। এর পেছনে যে গোপন সত্য জড়িত তা হলো এদের প্রশিক্ষণে ‘আদর্শ বা সুশিক্ষার পদ্ধতি বা তার ধরণ’। এদের শিশুশিক্ষার শুরুতে এরা মিশন, ভিশন, পলিসি এবং সর্বোপরি মরাল ভ্যালুর উপর যেমন গুরুত্ব দেয় তেমনি তার প্রতিফলন ঘটাতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা মেনে চলে।

আমি যতটুকু আমার সুইডিশ শিক্ষাজীবন থেকে শিখেছি তারপর এত বছর কর্মের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, প্রশিক্ষণে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা শিক্ষা নয়, দরকার মানবতা, সহনশীলতা, পরোপকারিতা, মরাল ভ্যালু এবং বিবেকের সমন্বয় ঘটানো।

লেখাপড়া শিখে যদি মনুষ্যত্বের অবক্ষয় ঘটে তবে সে শিক্ষা সুশিক্ষা নয়। তাই আমি মনে করি বড় এবং ভালো মনের মানুষ হতে দরকার সুশিক্ষার। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুইডিশ ওয়ে অফ লার্নিং সিস্টেম চালু করা সম্ভব। শিশুশিক্ষার ধরণের পরিবর্তন এনে সুশিক্ষাকে বরণ করার জন্য দেশের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে আমন্ত্রণ এবং নিমন্ত্রণ জানাচ্ছি দেশ ও জাতির স্বার্থে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×