সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সিদ্ধান্ত নয় দরকার অনুপ্রাণিত করা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

পরিকল্পনা

সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বাবা মা কি চায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় বরং সন্তান নিজে কি হতে চায় সেটার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এখন অনেকেই বলবে ছেলেমেয়ে যখন ছোট তারা কি জানে কোনটি ভালো বা কোনটি মন্দ? সন্তান যখন ছোট তাদেরকে গড়ে তোলা এবং ভালোমন্দের দায়ভার নেয়া বাবা মার দায়িত্ব।

এ কথা কিছুটা সত্য তবে মনে রাখতে হবে দুটি বিষয়। একটি হলো সন্তানকে গড়ে তোলা আরেকটি হলও গড়ে তুলতে সাহায্য করা। আমরা যখন আমাদের চিন্তাধারাকে শিশুর ওপর চাপিয়ে দেই তখন তাদের নিজেদের চিন্তাশক্তি (ক্রিয়েটিভিটি) লোপ পেতে থাকে।

একই সঙ্গে পরনির্ভরশীলতাও বাড়তে থাকে। যার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় মুখস্থবিদ্যা বা অন্যকে অনুসরণ করা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়ে থাকে। এর ফলে দেখা যায় শিশুর নিজের মধ্যে যে নিজস্ব দক্ষতা এবং প্রতিভা রয়েছে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে না।

নিজস্ব দক্ষতা হলও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগ তা হ্রাস পেতে থাকে। শিশুর ব্যক্তি সচেতনতা, আবেগের নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস এবং উৎসাহের অঙ্কুরে বিনাশ ঘটে যা তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দাড়ায়।

সব ফুলের কুঁড়ি যেমন ফুল এবং ফল দিতে পারে না, সব শিশুর জীবনও ঠিক তেমনি বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার কারণে পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। প্রশ্ন উঠতে পারে আজীবন আমরা এই ভাবেই তো সব কিছু করে এসেছি, এখন কেন অন্যভাবে করতে হবে? যুগের অবকাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর্মের ধরণ এবং পদ্ধতিরও পরিবর্তন আনতে হবে।

আমাদের ফিঙ্গার প্রিন্টে প্রমাণিত হয় যে আমরা একে অন্যের থেকে ভিন্ন। সুতরাং শিশুর ইন্ডিভিজুয়াল আইডেন্টিটির বহিঃপ্রকাশ যেন ঘটে সে বিষয়ে যেমন বাবা মার দায়িত্ব রয়েছে তেমন দায়িত্ব স্কুলের শিক্ষকদেরও।

দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে একটি বিষয় বেশ কমন দেখা যায় তা হলো বাবা মা সব সময় তাদের সন্তানদের পুশ করছেন যাতে তারা এমন ধরনের শিক্ষা বেছে নেয় যেখানে চাকরির নিশ্চয়তা বেশি। সন্তান কি হতে চায় তার প্রতি মনযোগী না হয়ে বরং নিজেরা যেটা ভালো মনে করছেন সেটাই সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।

যদিও বাবা মার এ ধরনের চিন্তাধারার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে সন্তানের জীবন গঠনে পুশ এবং পুল তত্ত্বের ওপর বেশি জোর না দেয়া শ্রেয়। ছোটবেলা থেকেই সন্তানের দিক নির্দেশনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া আশু প্রয়োজন তাদের মঙ্গলের জন্য।

আমি একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরব যা আমি দেখেছি আমার জীবনে। ১৯৮৭ সালের কথা, ফিনল্যান্ডের একটি মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।

সে ফিনল্যান্ডের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় সেদেশের মেধা তালিকায় শীর্ষ স্থান পেয়েও ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে অর্থনীতি পড়বে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। আমার বড় ভাই তখন সুইডেনে পিএইচডি স্টুডেন্ট। লাঞ্চে আমরা তার সঙ্গে দেখা করি।

বড় ভাই মেয়েটিকে কিছুটা বাংলা স্টাইলে ইন্টারভিউ নিলেন যেমন বাবা মা কি করেন, ভাই বোন কয়জন ইত্যাদি। পরে তার লেখাপড়ার পারফরমেন্সের ওপর আলোচনার এক পর্যায়ে মেয়েটিকে বেশ মোটিভেট করতে চেষ্টা করলেন যেন সে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়।

মেয়েটি বড় ভাইকে সেদিন বলেছিল আমরা যেটা পছন্দ করি সেটার ওপর গুরুত্ব দেই। কে কি বললো বা ভাবলো তার ওপর নয়। আমি অর্থনীতি পছন্দ করেছি অতএব এটাই আমার সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবেগের চেয়ে যুক্তি ও বাস্তবতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে যা শিখেছিলাম সেদিন।

যাইহোক মেয়েটির সঙ্গে আমার যোগাযোগ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তবে কিছুদিন আগে ফিনান্স ওয়ার্ল্ড পত্রিকায় দেখলাম তার বাওগ্রাফি। সে তার লেখাপড়া শেষে নোকিয়ার Senior Financial Analyst-হিসেবে কাজ করেছে এবং বর্তমানে মাইক্রোসফটের Finance Manager-NDS Business Intelligence বিভাগে উচ্চ পদে কর্মরত।

জানিনা পরিবার বা পারিপার্শ্বিক চাপে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হলে সে তার কর্মজীবনে এত শীর্ষে উঠতে পারত কিনা! যা সে পেরেছে আজ তার ভালোলাগার সাবজেক্ট পড়ে।

সুইডেনে এ ধরনের হাজারও উদাহরণ রয়েছে যা একের পর এক তুলে ধরার মত। আরেকটি ঘটনা, দশ বছর আগের কথা। বাবা মা দুজনেই সুইডেনের নাম করা প্রফেসর। একজন KTH -এর (Royal Institute of Technology) পদার্থ বিজ্ঞানে, অন্যজন KI-এর (Karolinska Institute) বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের নাম করা প্রফেসর। তাদের একমাত্র ছেলে জন কপিল (Jan Kopil) বেছে নিয়েছিল পড়াশুনার সঙ্গে টেনিস।

টেনিসে সে তেমন ভালো খেলোয়াড় হতে পারেনি তবে তার সখ ছিল সে টেনিস আম্পায়ার (tennis umpire) হবে।

বাবা মার বেশ মন খারাপ হয়েছিল প্রথমে কথাটি শুনে। যেখানে তারা দুজনই দেশের মস্ত বড় প্রফেসর অথচ ছেলে হবে আম্পায়ার! তারা মনে মনে বিষয়টি পছন্দ না করলেও ছেলেকে টেনিস আম্পায়ার হতে ১০০% সাহায্য করেছিল।

গতকাল ডেভিস কাপ খেলা ছিল সুইডেনের সঙ্গে ইসরাইলের। আমাদের ছেলে জনাথান সুইডেনের হয়ে খেলছে বিধায় আমরা সেখানে ছিলাম। হঠাৎ জন কপিলের বাবা মার সঙ্গে দেখা। প্রথমে ভেবেছি তারা হয়ত খেলা দেখতে এসেছে, তবুও জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার দুজনই এখানে! উত্তরে বললো জন কপিল আজকের এই ডেভিস কাপ খেলার মেইন আম্পায়ার। সে এখন দেশ বিদেশে এই দায়িত্ব পালন করছে এবং মজার জীবন যাপন করছে। কথা বলার সময় তাদের চোখে মুখে যে আনন্দের বার্তা দেখলাম তাতে মনে হলো তারা বেশ গর্বিত বাবা মা।

আমাদের দেশে এখনও দেখা যায় যখন ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ হলো না তখন বাধ্য হয়ে অন্য সাবজেক্টে ভর্তি হয়। এক্ষেত্রে মোটিভেশন নয় বলতে গেলে কোন উপায় না দেখে লেখাপড়া করা। কিন্তু সুইডেনে দেখেছি সম্পূর্ণ উল্টো।

এখানে কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে তা তারা খুঁজে বের করে। পরে চর্চার মাধ্যমে সেই দুর্বলতা দূর করে নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলে। আমরা সমস্যা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি। সমস্যা নিয়ে ভাবতে ভাবতে শেষে সমাধান নিয়ে ভাবনার সুযোগই পাই না। তাই দরকার শিশুশিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অবধি সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে জানা।

যে ভাবনাগুলো আমাদের আলোড়িত করে, সেগুলো শুধু মাথার ভেতর না রেখে প্রয়োগ করে দেখতে হবে। তাহলেই আমরা শক্তি ও দুর্বলতাগুলো জানতে পারব। সর্বোপরি জীবনে আমরা কতটা সফল হতে চাই, তা নির্ভর করছে আমাদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার ওপর। হৃদয় মন প্রাণ যে কাজের সঙ্গে জড়িত সে কাজের মধ্যে মধুময় সম্পৃক্তির সৃষ্টি হয়।

হাজারও প্রমাণ তুলে ধরা যেতে পারে এ বিষয়ের ওপরে। জীবনে ভালোবেসে যা কিছুই করা হোক তা সব সময় আনন্দের হয়ে থাকে। বড় চাকুরী করে দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে কি লাভ যদি সে স্টোরি শেয়ার করা না যায়! জীবন আমাদের একটাই এবং তা একবারই আসে।

তাই সত্যিকার লাভ স্টোরি তৈরি করলে ক্ষতি কি! সন্তানের জীবনে আমাদের ভূমিকা বাবা মা হিসেবে যেন বিরল হয়ে থাকে সেই ভাবে কাজ করতে আমরা যেন সক্ষম হই। আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের জীবনের গল্প হোক বর্তমান এবং ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা যা জানলে এবং শুনলে সবাই উপকৃত হবে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×