হোম সুইট হোম

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

হোম

দুই তিন দিন হলো বেশি করে দেশের কথা মনে পড়ছে। বাবা-মার কথা মনে পড়ছে। ছোটবেলার কথা, গ্রামের কথা, গ্রামের সেই সাথীদের কথাও মনে পড়ছে। লেখারও তেমন মন মানসিকতা নেই। বাসার সবাই বুঝতে পেরেছে আমার মুড অফ।

আজ সন্ধ্যায় টিভি দেখতে বসেছি। প্রোগ্রামের নাম হলিউডে সুইডেনের গৃহবধুরা (Swedish Hollywood Wives)। কিছু সুইডিশ সুন্দরী রমণী (১৮-২০ বছর বয়সী) পাড়ি জমায় গ্ল্যামার এবং রোমান্টিক জীবন খুঁজতে আমেরিকায়।

ফটো মডেল বা তারকা হওয়ার জন্য মূলত তারা সেখানে যায়। যদি তা না হয় তখন গ্ল্যামার জীবন পেতে সটকাট রাস্তা খোঁজে। প্রতিষ্ঠিত এবং আমেরিকার গ্রীন কার্ড পাওয়ার জন্য অনেকে তাদের থেকে দুই তিন গুন বয়সী ধনীদের বিয়ে করে এবং গৃহবধু হিসেবে নতুন জীবন শুরু করে।

এই সব গৃহবধুদের নিয়ে এই টিভি প্রোগ্রাম। কে কত ভালো আছে বা কার স্বামী কত ধনী এসবই এই প্রোগ্রামে দেখানো হয়।

আজকের প্রোগ্রামের মূল বিষয় বস্তু ছিল তাদের নিজ দেশের (সুইডেন) প্রতি কি পরিমাণ টান রয়েছে তার ওপর। হলিউডের গ্ল্যামার জীবনের মধ্যেও তারা তাদের সুইডেনের বাবা-মার বাড়ির কথা ভাবে আমার মত করে।

এটা শোনার পরে ভালোই লাগলো এই ভেবে যে শত গ্ল্যামার জীবন স্বত্বেও ছোটবেলার সেই হোম সুইট হোম এদের হৃদয় থেকে ধুয়েমুছে যায়নি আজও। টিভি প্রোগ্রাম শেষে এমনটিই জানতে পারলাম হলিউডের সুইডিশ গৃহবধুদের মুখ থেকে।

প্রোগ্রামটি দেখার পর আমারও মনে পড়ে গেল ছোট বেলার স্মৃতি, যেখানে কেটেছে আমার শৈশব এবং কৈশোরকাল হোম সুইট হোমে। আমরা যারা দূরপরবাসে বসবাস করছি আমার মনের কথা হচ্ছে,

“গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ

আমার মন ভুলায় রে..”

এমনটিই মনে হয় যখন আমাদের সেই গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়ে।

বাংলাদেশ ছেড়েছি ১৯৮৫ সালে। তারপর দেশে গিয়েছি ১৯৮৭, ৮৯, ৯১, ৯৫ এবং ৯৮সালে। এসময় বাবা-মা বেঁচে ছিলেন। বাড়ি বা দেশে যাওয়া বলতে বাবা-মার কাছে যাওয়া। মায়ের হাতের রান্না খাওয়া ছিল বাড়ি যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ।

এটি ছিল এত গভীর যার কারণে বার বার দেশে যেতে মন চাইতো। তাছাড়া বাবা-মার সঙ্গে সময় কাটানো যা ছিল শুধু ভালোবাসা আর মায়া মমতায় ভরা। পরবর্তিতে অনেক বছর দেশে যাওয়া হয়নি কারণ বাবা-মা সুইডেনে প্রতিবছর বেড়াতে আসতেন। মা সুইডেনে মারা গেলেন ২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বর। বাবা দেশে গেলেন মার মৃত্যুর পর এবং তিনি দেশে মারা গেলেন পরের বছর ২০০৭ সালের ৩১ জানুয়ারি।

বাবার মৃত্যুর পর দেশে একবার গিয়েছিলাম। তিনদিন গ্রামের বাড়িতে ছিলাম বটে তবে হোম সুইট হোমের সে উপলব্ধি আর হয়নি। বাবা-মার হাতে গড়া যে বাড়ি সেখানে সেই অনুভূতি আমি আর খুঁজে পাইনি। তাদের শুন্যতায় এখন বাড়ি যেতে আর মন চায়না। অতীতের যে অনুভূতি রয়েছে হৃদয়ে তা হারাবার ভয়ে এখন যাওয়া হয়না সেই গ্রামে। হয়ত সেই মধুময় দিনগুলো আর ফিরে পাব না, তবুও দূর হতে পুরনো স্মৃতিগুলো ভালোবেসে যাব চিরকাল।

এখন যেহেতু বাবা-মা বেঁচে নেই তাই বাড়ি বলতে সুইডেনের বাড়িকেই বাড়ি বলে মনে করি। কারণ ছেলে-মেয়েকে দেখি তারা যখনই বিদেশ থেকে বাড়ি আসে তখন তারা ঘরে ঢুকেই সব কিছু তছনছ করতে পছন্দ করে। রান্নাঘরে ঢুকে রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজ খুলে যা পায় তাই খায়। তারা তাদের মনের মত করে যদি কিছু রান্না করতে চায় তাও করে।

সব দেখে মনে হয় এটা তাদের হোম সুইট হোম। পার্থক্য একটু আছে তা হলো আমি দেশে মাকে বিরক্ত করতাম কখন রান্না হবে, আর কখন খেতে ডাকবে। আর এখানে আমি রান্না করি, রান্না শেষে তাদের পিছে ঘুরি আর অপেক্ষা করি কখন তারা খাবে। বাবা-মাকে দেখেছি আমি একটু দেরি করে বাড়িতে এলে তারা যেমন চিন্তিত হতো, আমিও ঠিক তেমনিভাবে চিন্তিত হই আমার ছেলে-মেয়ে দেরি করে বাড়িতে এলে।

পৃথিবীর সব দেশেই একটি জিনিস কমন তা হলো সবাই ফিল করে হোম সুইট হোম। কিন্তু লক্ষ্য করেছেন কি বাবা-মার অনুপস্থিতিতে হোম কখনও সুইট হোম হয় না। আমার কাছে যে বাড়ি সুইট হোম ছিলো তা হলো বাবা-মার বাড়ি। যেখানে আমি জন্মের পর তিলে তিলে বড় হয়েছি। আমার ছেলে-মেয়ের কাছে তাদের সুইডেনের বাড়িই হোম সুইট হোম।

সুইডেনের ছেলে-মেয়েরাও মনে করে বাবা-মার হোমই তাদের কাছে সুইট হোম। তবে যদি বাবা-মার মৃত্যুর পর সন্তানরা একই বাড়িতে বসবাস করে তাদের কাছে অনুভূতিটি অন্যরকম হয়। সুইডেনে সাধারণ পরিবার (ব্যতিক্রম বড়লোকেরা) এক জায়গায় সারাজীবন থাকে না। ভাড়াবাড়ি বা বাসা কিনলেও তা বিক্রি করে দেয় যদি কর্মস্থানের পরিবর্তন হয়। বড় লোকদের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে দুজনই বাবা-মার বাড়ি ছেড়ে নিজেদের মত বাড়ি তৈরি করে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন বাড়িতে থাকে, অন্যজন মুভ করে। তবুও অকেশনালি তারা বাড়িতে বছরে দুই একবার আসে এবং মিলে মিশে সময় কাটায়।

বাংলাদেশের মেয়েরা সাধারণত বিয়ের পর বাড়ি ছাড়ে। তাইতো বিয়ের পর তারা বাবা-মার বাড়ি বেড়াতে আসে। কারণ তাদের হৃদয় জুড়ে বাড়ির সেই ছোটবেলার দিনগুলো লতার মত জড়িয়ে থাকে আজীবন। যেখানে কেটেছে তাদের শিশুকাল সেখানে আসতে কতই না সখ হয় তাদের, যে কথা মীরা দেব বর্মণ লিখেছেন;

“কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া

আমার ভাইধন রে কইয়ো

নাইওর নিতো বইলা

তোরা কে যাস কে যাস..”

তাদের নাইওরে (হোম সুইট হোম) যাওয়ার প্রতিক্ষা আর অপেক্ষা আজীবন থেকে যায় তাদের হৃদয়ে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×