বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদনে নতুন আকর্ষণ হতে পারে বিশ্ববাজারে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

ওষুধ

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক লোকই আছে যারা তাদের কর্মে শুরু থেকে শেষ অবধি জড়িত থাকে। এ ধরনের লোকের সংখ্যা অনেক। তা সত্ত্বেও তাদের সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি না।

কারণ আমাদের সময় নেই, আমরা ব্যস্ত আমাদেরকে নিয়েই। বিশ্বে সিলেক্টিভ কিছু পেশা রয়েছে যেমন কৃষিকাজ। সেখানে পরিষ্কার লক্ষণীয় যে একজন কৃষক তার কর্মে শুরু থেকে শেষ অবধি জড়িত। তাই এদের মধ্যে একটি হোলিস্টিক ভিউ তৈরি হয়। যেমন বীজ বপন থেকে শুরু করে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া, শেষে তাকে জীবকল্যাণে ব্যবহার অবধি একজন কৃষকের সক্রিয় ভূমিকা অপরিসীম।

এদের জ্ঞানের ভাণ্ডারে জড়িত রয়েছে উৎপাদনের শুরু থেকে শেষ প্রক্রিয়া কনসেপ্ট। যা অন্য কোনো পেশায় সচরাচর দেখা যায় না। এরা নিজেরাই কর্মী আবার নিজেরাই বস। বলা যেতে পারে এদের মধ্যে ৩৬০ ডিগ্রি হোলিস্টিক ভিউ অফ ম্যানেজমেন্ট ক্যাপাবিলিটি রয়েছে।

আমার জন্ম গ্রামে তাই দেখেছি কৃষিকাজ। কৃষি কাজে অনেক সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়েছি। অনেক কিছু তখন শিখেছি যার গুণগত ব্যবহার পাশ্চাত্যের শিক্ষা এবং কর্মজীবনে মনের অজান্তে এসে হাজির হয়েছে। যখন দেখা গেছে অন্য শিক্ষার্থীরা জটিলতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে তখন আমি সে সমস্যাগুলো সাধারণভাবে দেখেছি এবং দিব্বি তার সমাধান করেছি।

এই যে বার বার সমাধান খুঁজে বের করা এবং জটিল বা কঠিনকে সহজ উপায়ে সমাধান করা ছিল আমার কর্মজীবনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

যার কারণে আমি ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে হোলিস্টিক ভিউ অফ টোটাল প্রসেস পার্সপেক্টিভস (holistic view of total process perspectives) আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছি। আমার সৌভাগ্য হয়েছে ওষুধের জগতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করার (from discovery phase to finishing products to the customer)। বাংলাদেশের ওষুধ এবং তার উৎপাদন নিয়ে নানা লেখা প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে। ওষুধের নিরাপদ এবং যৌক্তিক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ওষুধ কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনিভাবে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকাও অপরিসীম।

ওষুধ কোম্পানির মূল কাজ শুধু ওষুধ তৈরি করা নয়। মূল কাজ হচ্ছে সঠিক পদ্ধতিতে cGMP (current good manufacturing practices), গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, সংরক্ষণ, বিতরণ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান এবং এর ব্যবহার নির্ধারণ করা।

চিকিৎসকের কাজ ডায়াগনস্টিক উপায়ে রুগীর রোগ নির্ণয় করা। তারপর প্রেসক্রিপশন দেওয়া কোন রোগের কি ওষুধ।

ওষুধ যখন ফার্মাসিতে বা দোকানে বিক্রয়ের জন্য আনা হয়, দোকানের মালিক ওষুধ সংরক্ষণ করবেন ওষুধের ওপর যে নিয়ম নির্ধারিত করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে।

যদি লেবেলিংয়ে লেখা থাকে কোল্ড স্টোরেজ এবং তাপমাত্রা প্লাস ৪-৮ ডিগ্রি তখন তা সেভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এটি করতে হবে ওষুধের গুণগত ফল পেতে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রেহাই পেতে।

ওষুধে যদি রুম টেম্পারেচারে সংরক্ষণ করার কথা লেখা থাকে তাহলে সেটাই করতে হবে।

আমার প্রশ্ন বাংলাদেশে রুম টেম্পারেচার গরমে কতো এবং শীতেই বা কত? যদি ওষুধ তৈরির সময় এ বিষয় খেয়াল করা না হয় তাহলে ওষুধের গুণগতমান বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যে খারাপ হবে না তার কি প্রমাণ রয়েছে? জানতে হবে বা এ ধরনের উত্তর ডকুমেন্ট ওয়েতে থাকতে হবে। (According to cGMP regulations the product must validate, revalidate or qualify, prequalify as required by the authorities and this must be documented and filed)।

যে দেশে খাবারে ভেজাল, মিষ্টিতে কাপড়ের রং মেশানো হয়, সে দেশের ওষুধ শিল্পে কি অবস্থা তা আমার জানা নেই! বড় সখ হয় একবার বাংলাদেশের সব ওষুধ কোম্পানিসহ (ফার্মাসি) ওষুধের দোকানগুলো অডিট করি। সুইডেনে আমার ওষুধ কোম্পানিতে প্রতি বছর সুইডিশ Läkemedelsverket, আমেরিকার FDA (food and drug administration), ইউরোপের The European Pharmacopoeia (Ph. Eur.) এবং জাপানের Japanese Pharmacopoeia 17th Edition- এদের সঙ্গে আমার কর্মজীবনে বেশি যোগাযোগ হতো। নিজের কোম্পানির কর্মীদের চেয়ে এদের সঙ্গে বেশি সম্পর্ক ছিল। কারণ মানবকল্যাণে এবং মানুষের সেবায় ওষুধ তৈরি, তাই সে ওষুধ যেন নির্ভেজাল এবং সর্বজনস্বীকৃত হয়। তাই সবসময় cGMP মেনে ওষুধ তৈরি থেকে তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং ফলোআপ করা ছিল কাজের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বর্তমান পাশ্চাত্যে অনেক দেশ চেষ্টা করছে তার দেশের বাইরে ওষুধ উৎপাদন করতে। লক্ষ্য হলো খরচ কমানো। তার মানে এই নয় যে কম খরচে ওষুধের গুণগত মান কমানো বরং গুণাগুণ ঠিক রেখে লেবার কস্ট কমাতে তাদের এই প্লান। ওষুধ উৎপাদনের ওপর বাংলাদেশ হতে পারে গার্মেন্টসের মতো বিশ্ববাজারে এক নতুন আকর্ষণ।

তাই আমার পরামর্শ সবার দুর্নীতি এবং ভেজালমুক্ত মাইন্ডসেট তৈরি করা। এটি আশু প্রয়োজন। ভাবুন গোটাবিশ্বের ওষুধ তৈরি করার মতো ক্যাপাসিটি এবং ক্যাপাবিলিটি বাংলাদেশে রয়েছে। নেই শুধু মোর‍্যাল ভ্যালু এবং সৎ ও উন্নত চরিত্র। সুতরাং দুর্নীতি আর ভেজাল ছাড়লেই আমরা ওষুধশিল্পে বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারবো এবং দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে আরো একধাপ এগিয়ে যেতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×