ইউরোপে লিভিং, মুভিং এন্ড লাভিং

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০২ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

ইউরোপে লিভিং, মুভিং এন্ড লাভিং

ট্র্যাডিশন, কালচার, ধর্ম, ক্লাইমেট, ভাষা এসব জন্মগত সূত্রে আমাদের জন্য বিশেষ করে বাংলাদেশে হেরিটেজ। ইউরোপে বিষয়টি ভিন্ন। কারণ কর্মের কারণে এরা এক শহর থেকে অন্য শহরে মুভ করে জীবনে কয়েকবার। খুব কম পরিবার রয়েছে যাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষদের একটি স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে।

ব্যতিক্রম আছে তবে আমি আমার লিখায় বর্ণনা করব ৯০% মানুষের জীবনের বসতবাড়ি এবং বাসস্থানের উপর। তার আগে বলে নেই আমার জীবনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় আমার বাসস্থান। বাংলাদেশে বিভিন্ন শহরে বসবাস করলেও আমার জন্মস্থান নানাবাড়িতে, গ্রাম, চারিখাদা, জেলা নড়াইল। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম পোস্ট নহাটা, জেলা মাগুরা। এ ঠিকানা বাংলাদেশী হিসাবে চিরদিনের।

সুইডেনে স্থায়ী ঠিকানার বিষয়টি অন্যরকম। যেমন আমার প্রথম ঠিকানা ছিল লিনসোপিং-এ, যেখানে আমি লেখাপড়া করেছি পাঁচ বছর। পরে সেখান থেকে মুভ করেছি স্টকহোমে। লিনসোপিং-এ পড়েছি বিধায় শহরটি মনের মাঝে স্থান পেয়েছে, প্রথম শহর বা ঠিকানার কারণে নয়।

আবার স্টকহোম থেকে ৮০ কিলোমিটার দুরে ছয় বছর থেকেছি যে শহরে তার নাম স্ট্রেংন্যাস (Strängnäs)। এই শহরে বাড়ি কিনেছি, গাছপালা লাগিয়েছি, আমার মেয়ের জন্ম হয়েছে স্বত্বেও এখন স্টকহোমেই আমাদের নতুন ঠিকানা। বেশির ভাগ সুইডিশ আমার মতই ঠিকানা পরিবর্তনে অভ্যস্ত। তবে এদের পাসপোর্টে জন্মস্থানের শহরটির কথা উল্লেখ থাকে। যদিও বাকি জীবনের কোন সময় হয়ত সেই শহরের সাথে কোন সম্পৃক্তই থাকে না।

বসতবাড়ির জন্য ভাড়া, কেনা বা সম্পূর্ণ নতুন করে বাড়ি তৈরি করার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এমনটি করে বাংলাদেশের অনেকেই বসবাস করছে বর্তমানে। তবে বেশ পার্থক্য রয়েছে তা হলো বাংলাদেশে সবারই একটি স্থায়ী ঠিকানা থাকে যা সাধারণত উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষদের বাড়িকেই বোঝায়।

কিন্তু ইউরোপে এরা যেখানে করে মুভ করে সেখানেই এদের নতুন ঠিকানা হয়। এখানে কেও নতুন করে বাসাবাড়িতে মুভ করলে বেশির ভাগ ক্রেতা তা একটু রেনুভেট (renovate) করে। এরা আবার সুন্দর এবং মনের মত করে বাসাবাড়ি ডেকোরেট (decorate) করতে পছন্দ করে। পছন্দ করা বাড়িতে যতদিন দরকার ততদিন থাকে। বলতে গেলে চলমান ফেরিওয়ালার জীবন।

আমি আমার বর্তমান বাসায় ১৫ বছর যাবত বসবাস করছি। ছেলে-মেয়ে বড় হয়েছে। তারাও তাদের মত করে নতুন বাসাবাড়ি খুঁজবে বা হয়ত পৃথিবীর অন্য কোথাও মুভ করবে কোন এক সময়। তখন আমাদের জন্য এ বসতবাড়ি সাইজে দুজনের জন্য বড় হবে। সে ক্ষেত্রে খরচ কমাতে হয়ত আমরাও মুভ করব ছোটখাটো বাসাবাড়িতে। এটাই ইউরোপের বসতবাড়ি এবং জীবন যাপন পদ্ধতি।

এখন আমি এবং আমার স্ত্রী খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছি স্পেনে ছোটখাটো একটি কটেজ (cottage) কেনার জন্য। সাগরের ধারে, পাহাড়ের কোলে থাকবে একটু জায়গা যেখানে শাকসবজি, ফলমূল লাগানোর ব্যবস্থা থাকবে। বাইরে বারবিকিউ গ্রিল (barbecue grill) করার সঙ্গে সাগরের ভিউ (view) একদিকে অন্যদিকে পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য মনকে উতাল করে তুলবে।

ইচ্ছে হলে সাগরে গিয়ে একটু সাঁতরানোর ব্যবস্থা থাকবে। আবার রোদ্রে কিছুক্ষণ গাছপালা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাইলে তাও করা সম্ভব হবে। জীবনের শেষের দিকে এমনটি পরিকল্পনা থাকতেই পারে। ইউরোপের জীবনের এই চলমান ঠিকানা যা এখনও বাংলাদেশের মানুষের মনের দরজায় আসেনি।

এখানকার, বিশেষ করে সুইডেনের মানুষের মধ্যে আবার প্রায় ৪০% লোক সিঙ্গেল (single) জীবন যাপন করে। এখন ভাবনায় ঢুকেছে আমার তা হলো চলমান ঠিকানার জীবন পদ্ধতি কি সিঙ্গেল লাইফের জন্য কিছুটা দায়ী? আমার মনে হয় হ্যাঁ কিছুটা দায়ী। যেমন পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে যে সময়ের প্রয়োজন অনেক সময় তা সম্ভব হয়ে উঠে না বিধায় অনেকেই সিঙ্গেলই থেকে যায়।

ইউরোপের এভারেজ (average) চলমান ঠিকানা ৪-৮ বার হয়ে থাকে। চলমান ঠিকানার কারণে একা একা বসবাস করার প্রবণতা এদের জীবনে একটু বেশি। যার কারণে এরা একা থাকতেও অভ্যস্ত। নতুন মানুষের সঙ্গে ইন্টিমেট সম্পর্ক না হবার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে নতুন পরিবেশ একটি। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা আরেকটি। তারপর কারো উপর নির্ভরশীল না থাকাও আরেকটি কারণ।

দুটি মন এক হলেই দুজন দুজনার হবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ কম পক্ষে দশটি প্যারামিটারের সামঞ্জস্যতা থাকতে হবে সিঙ্গেল থেকে টুগেদারনেস হতে হলে। লিভিং টুগেদার কনসেপ্টে যে জিনিষগুলোর গুরুত্ব এরা বেশি দিয়ে থাকে তার মধ্যে বিশ্বাস, আন্ডারস্ট্যান্ডিং (understanding), টলারেন্স (tolerance), সিম্প্যাথি ( sympathy), প্যাশন (passion), ভালোবাসা, মিউচুয়াল রেস্পেক্ট (mutual respect), আর্থিক স্বাধীনতা।

সব কিছু থাকার পরও সংসারে ভাঙ্গন লাগাতে পারে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে। শেষে আবার সেই সিঙ্গেল লাইফে ফিরে যাওয়া স্বাভাবিক হয়ে পড়ে জীবনে। স্যোসাল মিডিয়া যেমন ইন্সট্রাগ্রাম, টুইটার, ফেসবুক ডেটিং, সুইপ নাইট সিঙ্গেলদের যোগাযোগের মাধ্যম হলেও নাইট ক্লাব, ডিস্কেটেক, অ্যারেঞ্জ পার্টি বা বন্ধু বান্ধবীর মাধ্যমে এরা নতুন সাথী খুঁজে পেয়ে থাকে।

এভারেজ ৫–৮ বার ডেইটিংয়ের পর, যদি ইন্টিমেট সম্পর্ক হয় তখন যৌন মিলন, বিয়ে-সাদি পরে সন্তানের কারণে এরা একসঙ্গে বসবাস করার জন্য যৌথ বসতবাড়ি খুঁজতে শুরু করে। নূতন করে বসতবাড়ি খোঁজার সময় দেখা যায় ভিন্ন মতামতের উদয় হয় তখন কম্প্রোমাইজে না এলে দেখা গেল সম্পর্ক টিকল না।

কারণ এই নতুন বসতবাড়িতে একত্রে বসবাস করতে অনেক সময় পছন্দ অপছন্দের কারণে নতুন সমস্যা জীবনে আসতে পারে বা এসে থাকে। যেমন কারো পছন্দ এক ডিজাইন, কারো বা অন্য, কারো জন্য রান্না ঘরের গুরুত্ব বেশি, আবার কারো জন্য ভিউ (view)। অথবা কারো জন্য সুইমিং পুল (swimming pool) হতে পারে একটি বিষয়।

সুইডেনে এরা বলে থাকে ছোট বাচ্চা ছোট সমস্যা, বড় বাচ্চা বড় সমস্যা “små barn små problem större barn större problem” ঠিক তেমনি যার বা যাদের জীবনে যত সুযোগ সুবিধা রয়েছে তার বা তাদের আবার অসুবিধাও রয়েছে তেমনি। তার মানে বিলাস বহুল জীবনেরও উত্থান বা পতন থাকতে পারে। তার পরও জীবন থেমে নেই। থেমে নেই পরিবর্তনের, থেমে নেই সুখী সংসারের, থেমে নেই ভালোবাসার বন্ধনের। এ স্বত্বেও মনে হয়- “We still haven't found What we’r looking for...”

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×