আজও আমি ‘আঞ্চলিক ভাষা’ প্রেমে মুগ্ধ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

আজও আমি ‘আঞ্চলিক ভাষা’ প্রেমে মুগ্ধ

বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে রয়েছে হৃদ্যতা। ভাষার মধ্যে যে হৃদয়ের ছোঁয়া রয়েছে তা বোঝা যায় যখন কেউ তার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। আমার মনে হয় আঞ্চলিক ভাষা হচ্ছে আমাদের মাতৃভাষা। আর সর্বজনীন বাংলা যা বইতে লেখা রয়েছে তা হচ্ছে জাতীয় ভাষা।

‘ডিবেট’ তৈরি করার জন্য এ লেখা নয়, শুধু শেয়ার করতে চাই আমার অনুভূতিকে যখন আমি নহাটার (নড়াইলের) ভাষায় কথা বলি। আমি জানি এবং শুনেছি অনেকেই বলাবলি করে আমি পচা বাংলা বলি এবং শুনলে অনেকেই নাকি লজ্জা বোধ করে।

কিন্তু কেন জানি না, সেই ছোটবেলা থেকেই জিদ চেপেছিল মনে, যে যা বলুক আমি আমার মত করেই কথা বলব। আমি অনেক সময় লক্ষ্য করেছি একটি পরিবার যখন একত্রিত হয় দিব্যি সবাই তাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। কিন্তু পরিবারের বাইরে বা নতুন পরিবেশে কথা বলতেই তাদের ভাষার পরিবর্তন দেখা যায়।

এমনটি উপলব্ধি করেছি দেশে থাকতেও। তবে বিদেশে আসার পর যখন এদেশের উপভাষার (dialect) সঙ্গে পরিচিত হই তখন অনুভূতিটা আরও বেশি বেড়ে যায় নিজ দেশের আঞ্চলিক ভাষার ওপর।

জানি না যারা আমার মত দেশের বাইরে বসবাস করছে তারা আমার সঙ্গে একমত হবে কিনা, তবে আমি বেশ মজা পাই গ্রামের ভাষায় কথা বলে। আমাদের এলাকায় ছোট ভাইকে বলি ‘ভাইডি’ এবং বোনকে বলি ‘বুন্ডি’। জানি না দেশের সবাই ভাইডি বা বুন্ডি কথাটিতে অভ্যস্ত কিনা!

তবে সুইডেনে বুন্ডি বলে সরাসরি কোন শব্দ নেই। তবে যদি সত্যিই কাউকে বুন্ডি বলতে শখ হয় তবে ‘লিল্লা ছোতা ব্লোম্মা (lilla söta blomma) বলা যেতে পারে। এটা নির্ভর করে বয়স এবং পরিস্থিতির ওপর। ভালো কথা সব সময় এবং সবাইকেই বলা সম্ভব।

সুইডেনে এরা সবাই এক ভাবেই লেখে কিন্তু কথা বলার সময় সবাই তাদের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে। এখানে এরা এদের আঞ্চলিকতায় পরিচিত হয় যেমন বাংলাদেশে সিলেটি, ঢাকাইয়া আর সুইডেনে তেমন স্টকহোলমারে (Stockholmare), স্কোনিং (Skåning) ওস্টইয়োটারে (Östgötare) ইত্যাদি।

জানি না ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এর কোন মিল আছে কিনা তবে আমার কাছে ভালোই লাগে আমার মত করে গ্রামের ভাষায় কথা বলতে। গত বছর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় আমার বোন জলিদের বাড়িতে হঠাৎ হাজির। কয়েকদিন যেতে তার বাড়িতে ‘বেবি শাওয়ার পার্টির’ ব্যবস্থা করেছে। দশজন হবে সেই পার্টিতে যোগদান করেছে।

সবাই তাদের বাড়ি থেকে কিছু না কিছু রান্না করে এনেছে। মজার ব্যাপার হলো দশজনের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই প্রথমবারের মত মা হতে চলেছে। জলির উদ্যোগে এমনটি অনুষ্ঠান লস এঞ্জেলসের উডহীলে অনুষ্ঠিত হয়।

দশজন মেয়েই বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার থেকে দূরপরবাস আমেরিকায় বসবাস করছে এবং এদের সবাই-ই পেশায় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। যাইহোক তাদের খাবার টেবিলে সবাই যখন বেশ মজার সঙ্গে খেতে মগ্ন, ঠিক তখন আমি একটু ভিডিও করতে শুরু করলাম।

পুরো ‘বেবি শাওয়ার পার্টির’ বিষয়টি বেশ চমৎকার মনে হচ্ছিল। কথা প্রসঙ্গে কয়েকবারই আমি ‘বুন্ডি’ শব্দটি ব্যবহার করি। কারণ তারা সবাই যেহেতু আমার ছোট বোনের বান্ধবী। এখন বুন্ডি শব্দটি মনে হোল তাদের কারও কাছে পরিচিত নয়। তারা আমার বোন জলিকে জিঙ্গেস করতে শুরু করল বুন্ডি মানে ভাইয়া কি মিন করছেন? জলি তখন তাদেরকে ব্যাখ্যা দিলো যে আমাদের গ্রামে ছোটবোনকে বুন্ডি বলে। সবাই হাসাহাসির সঙ্গে শব্দটির মধ্যে যে একটি ভালোবাসার ছোঁয়া রয়েছে তা তারা নাকি বেশ উপলব্ধি করেছিল সেদিন।

আমাকেও বেশ আপ্লুত করেছিল তাদের হৃদ্যতা দেখে। যাইহোক আমি এ শব্দটি সচারচর ব্যবহার করে থাকি সুইডেনেও। অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করে বুন্ডি মানে কী আর কেনই বা বুন্ডি বলি ইত্যাদি। সুইডেনের বুন্ডিদের খবরাখবর জানতে হলে গ্রীষ্মে আসতে হবে এখানে।

জানার যেমন শেষ নেই দেখারও শেষ নেই। তেমন শেষ নেই নতুন কিছু শেখার। সবাইকে এটাই বলতে চাই তা হলো ধরে রাখুন গ্রামের ভাষাকে। কারণ ছোটবেলার ভাষাই প্রকৃত মাতৃভাষা যা দেশকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখায়।

আমার বাবা-মা মারা গেছেন। কেউ আর আদর করে বলবে না ‘বাবা তুই কবে আসবি বাড়িতে’। গতকাল গ্রাম থেকে একটি ছেলে হঠাৎ ফোন করেছে। ফোন ধরে হ্যালো বলতেই বলে, ভাইডি তুই কেমন আছিস? আমি বললাম ভালো, তা তুমি কে চিনতে পারলাম নাতো! বললো ভাইডিরে আমি তোর পতিতদা।

শুনেছি পতিতদা নাকি আমাদের জমিজমা দেখা শোনা করে। সে আমার বয়সে বড়, বহু বছর তার সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই। হঠাৎ তার কথা শুনে ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছিলাম। মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে গেল “..ওরে মুখ-পোড়া ওরে রে বাঁদর। গালি-ভরা মার অমনি আদর, কতদিন আমি শুনি নারে ভাই...”।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×