কর্মক্ষেত্রে: বাংলাদেশ বনাম সুইডেন

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ৩১ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

কর্মক্ষেত্রে: বাংলাদেশ বনাম সুইডেন

জীবনে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে কর্মের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করতে যে প্রশিক্ষণ তার নাম শিক্ষা। যারা সারাজীবন শুধু জানার জন্য প্রশিক্ষণে মগ্ন তার নামও শিক্ষা। আবার যারা পুঁথিগত বিদ্যা নয় বরং কর্মের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করে তার নামও শিক্ষা। সংক্ষেপে বলা যেতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা কিছু শিখি তাই শিক্ষা। এখন এই দৈনিক শিক্ষা আবার হতে পারে “কু বা সুশিক্ষা।”

সমাজে সব ধরনের কর্মের জন্য দরকার দক্ষ কর্মীর। দরকারি সব কর্মের গুরুত্ব অপরিসীম সত্ত্বেও আমরা বিভিন্নভাবে নানা কর্মের কর্মীদের নানাভাবে বিচার করে থাকি। আমরা যে কাজগুলো নিজেরা করতে পারি না বা জানি না তার গুরুত্ব বাংলাদেশে কেমন তা বলার আগে বরং যে দেশে (সুইডেনে) আমি বহু বছর ধরে আছি সেই দেশের সম্বন্ধে কিছু বলি।

সুইডেনে সবাইকেই (মুচি, মেথর, কামার, কুমার, নাপিত, ধোপা, জেলে, বাবুর্চি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, কেমিস্ট, শিক্ষক, এমপি, সচিব, নার্স, ক্লিনার, মটর ম্যাকানিক, পুলিশ ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত) বাধ্যতামূলক ভাবে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করতে হয়।

যারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কেমিস্ট ইত্যাদি হবে তারা আরও তিন বছর বেসিক লেখাপড়া শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শুরু করে। আর যারা নবম শ্রেণি শেষে সরাসরি কর্মে নিয়োজিত হতে চায় (যেমন নাপিত বা বাবুর্চি) সেক্ষেত্রে তারা দুই থেকে চার বছরের বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি কর্মে নিযুক্ত হয়ে থাকে।

এখানে সবাই ট্যাক্স পে করে এবং সবাই ভালো বেতনে চাকরি করে। সুযোগ-সুবিধা সবার জন্যই বেশ ভালো এবং জীবনের মূল্য এক এবং অভিন্ন। দেশের পরিকাঠামো এতই উন্নত যে কর্মজীবনে একজন তরুণ বা তরুণী নাপিত হতেও আগ্রহী হয়ে থাকে। তবে তাকে অবশ্যই নবম শ্রেণি পাস করতে হয়।

কিন্তু যদি প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সংখ্যক তরুণ-তরুণী এই পেশায় যেতে চায় তখন সৃষ্টি হয় প্রতিযোগিতার। আর সেক্ষেত্রে যারা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় তাদের চেয়েও যারা নাপিত হতে আগ্রহী তাদের পরীক্ষার ফলাফল ভালো করতে হয়। চাহিদা বেড়ে গেলে প্রতিযোগিতাও বেড়ে যায়।

ডাক্তার বা কেমিস্ট হতে হবে বলে কোনো কথা নেই। তবে কথা আছে যখন কেউ কিছু না হতে বা কিছু না করতে চায়, তখন সমাজ বিষয়টি খুবই খারাপ চোখে দেখে। এখানে নিজেরা কি হতে চায় তার পছন্দের ওপর এদের গুরুত্ব বেশি, যা আমাদের সমাজে বাবা-মার মেনে নিতে কষ্ট হবে, যদি কেউ ভালো রেজাল্ট করেও বলে “আমি নাপিত হব।” কিন্তু কেন এই কষ্ট এবং এর কারণই বা কী?

আমাদের সমাজে কি কল্পনা করাও সম্ভব যে একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সচিবের ছেলে বা মেয়ে নাপিতের কাজ করবে? না। বরং দুর্নীতিবাজ, লম্পট, মাতাল, মাস্তান বা বেকার হয়ে সমাজে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। দেশের ক্ষতি করবে, মানুষ সেটা মেনে নেবে, তবুও নাপিত হওয়াটা কেউ মেনে নেবে না।

কী এমন দেমাগ রয়েছে আমাদের মাঝে যে আমরা এখনও একজন ছোট মানের কর্মীকে মানুষ বলে গণ্য করতে ঘৃণা করি! দেশের মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক লোক রয়েছে, যারা সমাজের পরিবর্তন হোক তা চায় না। কী কারণ থাকতে পারে এর পেছনে?

সমাজের পরিবর্তনের ফলে যদি চরম বৈষম্য দূর হয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে ওইসব লোকের সমস্যা হবে। কারণ তারা অন্যায়ভাবে অধিক অর্থ উপার্জন করতে পারবে না। সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দিতে পারবে না, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঋণখেলাপি হতে পারবে না।

ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে সমাজে দাপিয়ে বেড়াবে, ধরাকে সরা জ্ঞান করবে, এসবই তাদের লক্ষ্য। যার কারণে এরা বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী। নাগরিকের সমান অধিকার অভাবের জন্য দায়ী দুর্বল পরিকাঠামো।

লো ইনকামকারীদের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না আমাদের সমাজে, যদিও তারা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো দিনের পর দিন করে যাচ্ছে। সমাজের লো ইনকামের কাজগুলোকে ছোট করে দেখা বিবেকের নৈতিক অবক্ষয় মাত্র। সুস্থ চিন্তাচেতনা এবং জ্ঞানের অভাব থাকার কারণেই এসব সম্ভব হচ্ছে।

কারণ সেই ছোট কাজগুলো কারো না কারো করতে হবে পরিবেশ সুস্থ রাখতে, তা ভুলে গেলে চলবে কি? শুধু সুইডেন নয়, পুরো পাশ্চাত্যে ছোট কাজ বলে কোনো কথা নেই, বরং যদি কেউ সমাজের জন্য কিছু না করে তাদেরকে ঘৃণা করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে এখনও দেখা যায় পরিবারে হয়তো একজন টাকার পাহাড় জমিয়েছে বাকিরা দিব্বি বসে বসে বাবার হোটেলে খাচ্ছে। অন্যদিকে মুচি, মেথর, নাপিত, ধোপা যাদেরকে আমরা ছোট করে দেখি তারা কিন্তু দেশের এবং নিজের স্বার্থে কাজ করছে।

ধনী বলে কাজ করা নিষেধ এবং শুধু গরীব লোকই কাজ করবে, এই যদি শিক্ষা হয় তবে সে শিক্ষাকে ধিক্কার জানাই। যে শিক্ষায় সৃজনশীলতা আছে, সেই শিক্ষাই আসল শিক্ষা এবং যে কর্মে আত্মার তৃপ্তি আছে সেই কর্মই আসল কর্ম।

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নয়, বরং ভেদাভেদ হোক সু এবং কুকর্মে, ভেদাভেদ হোক সু এবং কুশিক্ষার মধ্যে। আমাদের পেশা নয় বরং আচরণের ওপর আমরা বিচার করতে শিখি, যে বিচার বিবেককে প্রতিক্ষণ সজাগ এবং সঠিক রাখে।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×