পৃথিবীর আরেক নাম বাংলাদেশ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ

বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশিক্ষণের প্রাথমিক স্তরে শারীরিক শিক্ষা একটি আবশ্যকীয় বিষয়। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবিষয়ে কোন পাঠ্যপুস্তক নেই। কাজেই প্রত্যেক শ্রেণির জন্য আলাদা আলাদা শিক্ষক নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে মূলত শিক্ষকদের জন্য।

পঞ্চম শ্রেণির বইটি আমি পড়েছি। চমৎকার ভাবে বর্ণনা সহ সব ধরণের উপকরণ রয়েছে এর মধ্যে। বেসিক শিক্ষা, জীবন চলার পথে যা দরকার তার সব কিছুই সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের দশটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে তার মধ্যে শারীরিক শিক্ষা সম্বন্ধে বেশ ভালো বর্ণনা দেয়া আছে।

শিক্ষক নির্দেশিকা বইখানা জানার জন্য পড়া এবং তাও শিক্ষকদের জন্য। তাঁরা নিজেরা জেনে পরে সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শেখাবেন এটাই উদ্দেশ্য। আরও জেনেছি এর উপর শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা হয় ২৫ নম্বরের।

আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেলো তাই দেশের কয়েকটি স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম বিষয়টি সম্পর্কে জানতে। শিক্ষকরা বললেন মাঝে মধ্যে যখন অন্য স্কুলের সঙ্গে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার প্রতিযোগিতা থাকে তখন শিক্ষার্থীরা সে খেলায় যোগদান করে থাকে। শিক্ষক নির্দেশিকার নীতিমালা অনুযায়ী থিওরি সম্বন্ধে শিক্ষকরা শ্রেণি কক্ষে শিক্ষা প্রদান করে থাকেন।

আমি এও জিজ্ঞেস করলাম বাংলা, ইংরেজি বা গণিতের মত কি শিক্ষার্থীদের শরীর চর্চার উপর কোন প্রাকটিস হয়? তাঁরা বললেন হয় না কারণ আমাদের শরীর চর্চার উপর কোন নির্ধারিত শিক্ষক নেই।

জিজ্ঞেস করলাম হাইস্কুলের কি অবস্থা? উত্তরে বললেন শিক্ষক আছেন তবে শরীর চর্চা নিয়মিত হয় না কাই তিনি অন্য বিষয়ের উপর সাধারণত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তবে যখন খেলাধুলার উপর প্রতিযোগিতা হয় অন্য স্কুলের সঙ্গে তখন ক্রীড়া শিক্ষক সরাসরি এ বিসয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন। শিক্ষা প্রশিক্ষণের ধরণ জানার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা কাগজে কলমে এত সুন্দর অথচ বাস্তবে তার কোন বেস্ট প্রাকটিস নেই বললে ভুল হবে না। শুধু থিওরি রয়েছে অথচ প্রাক্টিক্যাল নেই বললেই চলে। ওন দি জব ট্রেনিং বলে একটি কথা রয়েছে। প্রাকটিস মেকস এ ম্যান পারফেক্ট। এখন যদি প্রাকটিস না করা হয় তবে হবে কি শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য সফল? হবে না। শুধু থিওরি ভিত্তিক শিক্ষার কারণে শিক্ষার এই দুরবস্থা।

দেশের শিক্ষা পরিকাঠামোর উপর সুন্দর করে বর্ণনার দেয়া হয়েছে “শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও সুস্থ দেহ-মন গঠনের জন শারীরিক শিক্ষা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু বিষয়টির জন্য নির্দিষ্ট কোন পাঠ্যপুস্তক নেই সেহেতু শিক্ষকের জন্য নির্দেশিকাটি পাঠদান ও বিভিন্ন এক্টিভিটিস পরিচালনায় ব্যাপক সহায়তা করবে। শিক্ষার্থীদের অর্জন উপযোগী যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে শিখন শিখানো কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য শিক্ষককে কতগুলো বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।”

পাঠ্যপুস্তকের পরিকাঠামো পড়ে আমি যেমন মুগ্ধ হয়েছি। একই সাথে হতাশও হয়েছি বেশ। এতো সুন্দর পরিকল্পনা থাকা স্বত্বেও কেনো শিক্ষার এই অধঃপতন? কারণ একটাই তা হলো পুঁথিগত মুখস্থ বিদ্যার মাঝে শিক্ষার্থীকে ঢুকিয়ে তার নিজস্ব চিন্তাশক্তির বিলীন ঘটানো হয়েছে। যার কারণে থিওরিতে শিক্ষার্থীরা পাকা হলেও বাস্তবে তার সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে না।

এখন বুঝতে পারছি শিক্ষার্থীরা কেনো ভালো রেজাল্ট করার পরও বিদেশে এসে বিশেষ করে সাইন্সের সাবজেক্ট গুলোর প্রাক্টিক্যালের উপর ভালো করতে পারছে না। থিওরিতে সবাই পাকা, তবে হাতে নাতে কিছু করতে বললে পারছে না। কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশিক্ষণ শুধু থিওরি ওরিয়েন্টেড।

সবাই নিশ্চিত জানে ফুটবল খেলার সব ধরনের নিয়ম কানুন, কিন্ত যদি বলা হয়, বল নিয়ে বিপক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠকিয়ে গোল দিতে, তখন তা সম্ভব হবে না। কারণ বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরা হয়ত জীবনে বল ধরেই দেখেনি, গোল দেওয়া তো দুরের কথা। বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জে এমন কোন স্কুল নেই যেখানে খেলাধুলার জন্য একটু জায়গা নেই।

প্রত্যেকটি প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন সাঁতার কাটা, ফুটবল খেলা, দৌড়াদৌড়ি করা অবশ্যই প্রয়োজন। প্রত্যেক স্কুলে একজন ক্রীড়া শিক্ষক নিযুক্ত করা দরকার, যার কাজ হবে শিক্ষক নির্দেশিকা বইয়ের উপর পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মনোযোগী হওয়া এবং তার বাস্তবায়ন করা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে। একই সাথে শিক্ষক নির্দেশিকাকে অংক বা বাংলার মত বাধ্যতামূলক করতে হবে। যাতেকরে থিওরি এবং প্রাক্টিক্যালের সামঞ্জস্যতা থাকে।

পৃথিবীর নাম করা শিক্ষাঙ্গনে এবং ধনী দেশ গুলোর শিক্ষা পরিকাঠামো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শিক্ষক নির্দেশিকা শুধু শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, বরং তা শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যার কারণে সুশিক্ষার সমন্বয় ঘটেছে পাশ্চাত্যে যা বাংলাদেশের শিক্ষায় ঘটেনি আজ অবধি।

প্রশিক্ষণের সর্বস্তরে শিক্ষক নির্দেশিকা চালু করা হোক বাধ্যতামূলক ভাবে এবং তা হতে হবে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মাঝে। আমাদের শিক্ষার ধরণ পাল্টাতে হবে। মাইন্ডসেটের পরিবর্তন করতে হবে। মাইন্ড সেট পরিবর্তন মানে চিন্তাচেতনার সুযোগ্য ব্যবহার করা যা এখন এক অনুকূল সময় সবার জন্য। এ সুযোগ গ্রহণ করা জাতির জন্য হবে আশির্বাদ। কারণ আমরা শুধু বাংলাদেশি নয়, বিশ্ব নাগরিক হতে চাই তাই সেই ভাবেই আমাদেরকে তৈরি হতে হবে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×