মেলবোর্নে'র ঝকঝকে রোদ যখন বিবর্ণ, ফ্যাকাশে...

  আফজাল রেজাউল হক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

বিবর্ণ

২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বরের এক সকাল। ঘুম থেকে উঠেই হাতে পেলাম অস্ট্রেলিয়ান অ্যাম্বাসির ইলেকট্রনিক ভিসা সংযুক্ত ই-মেইলটি।

অস্ট্রেলিয়ান ইমিগ্রেইশান নীতির কড়াকড়ি থাকায় অবিবাহিত এবং বয়স কম হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার শংকাই ছিল বেশি। তাই এই অপ্রত্যাশিত পাওয়া যেন আনন্দের মাত্রাটাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।

যাই হোক উত্তেজনার পারদ উচু মাত্রার হওয়ায় দুলাভাই আজিম উদ্দিনের বারণের পরও খুব অল্প সময়ের ভেতরই যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।

১৪ ডিসেম্বর রাত পৌনে দুইটায় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আমাদের নিয়ে থাই এয়ারওয়জের বি.জি. ০০১ ফ্লাইটটি মেলবোর্নের উদ্দেশ্যে রাতের আকাশে ডানা মেলে ধরল।

আকাশ থেকে অবাক দৃষ্টিতে দেখলাম প্রিয় রাজধানী ঢাকাকে। এ যেন এক স্বপ্নপুরী! দিনের বেলায় দেখা দুষিত ঢাকা যেন রাতের আকাশ থেকে সম্পূর্ন অচেনা এক নগরী!

যাই হোক থাই এয়ারওয়েজের বিমানবালা ও ক্রু'দের উষ্ণ আতিথেয়তা আর সেবা বিশেষত খানাপিনার আয়োজন খুবই ভাল লাগল। মাত্র দুই ঘন্টা ৩০ মিনিট পরেই থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের ঘোষনা আসল।

এবার আমার সত্যিকারের আশ্চার্যান্বিত হওয়ার পালা। থাইল্যান্ড বাংলাদেশের চেয়ে খুব একটা আহামরি অগ্রসরমান দেশ হিসেবে যেহেতু পরিচত নয় তাই তাদের বিমানবন্দরও আমাদের শাহজালালের মতই হবে বলে আগে থেকেই ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরনের পরপরই আমার সেই বিশ্বাস চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল!

অত্যাধুনিক সব সুবিধাসম্বলিত বিশাল এই বিমানবন্দর দেখে বুঝার উপায় নাই যে, এটা তৃতীয় বিশ্বের কোনো এক দেশের বিমানবন্দর। দেয়ালে দেয়ালে ইলেকট্রনিক ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত হচ্ছে রাজা ভূমিবলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নানা ফিরিস্তি।

বিমানবন্দরটির আকার এতই বিশাল যে ট্রানজিট শেষে আমার পরবর্তী প্লেনের বোর্ডিং ছিল গেট নাম্বার-৪ । অবতরনস্থল থেকে ৪ নাম্বার গেটে পৌঁছুতে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছিল।

কিছুটা বিষন্নও লাগল এই ভেবে যে স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার হয়ে আসা প্রিয় বাংলাদেশ কি এরকম একটি আন্তর্জাতক মান সম্পন্ন বিমানবন্দর পেতে পারত না?

থাইল্যান্ড ট্রানজিটে দেখা হল এক ঝাক দক্ষিণ কোরিয়াগামী বাংলাদেশিদের সঙ্গে যাদের সবার মাথায় হলুদ ক্যাপ আর টি-শার্ট পরা। কোরিয়া যাচ্ছেন 'ওয়ার্ক পারমিট' বা কাজের ভিসায়।

এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে রাখা ওয়াইফাই ম্যানুয়াল দেখে ইন্টারনেট অ্যাক্টিভেট করে দেশে ভিডিও কলে কথা বলছিলাম, তখনই এদের কয়েকজন আমাকে ঘিরে ধরলেন তাদেরও যেন সেই ব্যাবস্থা করে দেই। আমি মাঝখানে আর চারদিকে ঘিরে ধরা অনেকজন। বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রার উদ্দেশ্যে বসে থাকা বিদেশিরা আড়চোখে বিষয়টা দেখছে টের পেয়ে কিছুটা বিব্রতবোধও করলাম। তবে পরিবার-পরিজন রেখে ভিনদেশে পাড়ি দেয়া এসব রেমিটেন্স যোদ্ধাদের এই

সামান্য উপকারটুকু করতে পেরে অবশ্য ভালই লাগল। যাইহোক, ৫ ঘন্টার যাত্রা বিরতি শেষে থাই এয়ারওয়েজের অপর একটি ফ্লাইটে আমাদের যাত্রা

শুরু হল মেলবোর্নের উদ্দেশ্যে। তবে দুনিয়ার তাবৎ এয়ারলান্সের মত থাই কর্তৃপক্ষও একটি নিয়মের ব্যতিক্রম করল না। আর সেটি হল সেবার মানের ব্যাপক পরিবর্তন। ইতিপূর্বে ঢাকা-লন্ডন যাত্রার অভিজ্ঞতা থেকে দেখলাম সকল এয়ারলাইন্সই এশিয়ার দেশগুলো থেকে ইউরোপীয়ান কোন দেশে যাত্রার ক্ষেত্রে দু’ স্তরের সেবা দান করে। যেমন ধরুন আপনি ঢাকা থেকে লন্ডন যাচ্ছেন। যাত্রা বিরতি হল দুবাই। সেক্ষেত্রে দুবাই পর্যন্ত আপনাকে মোটামুটি মানের যাত্রীসেবা দিলেও দুবাই থেকে লন্ডন রুটে অনেক উন্নত সেবা দেবে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। এটাই অলিখিত নিয়ম।

আর সেই নিয়মের আলোকেই আমাদের থাইল্যান্ড থেকে মেলবোর্ন যাত্রায় থাই কর্তৃপক্ষের দেয়া বাড়তি খাতির-যত্ন উপভোগ করলাম।

অবশেষে প্রায় ১১ ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে হঠাৎ বিমানবলার কণ্ঠে অবতরনের ঘোষণা। সেই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ান ইমিগ্রেশান নীতির কড়াকড়ির ব্যাপারে বারবার ঘোষণা দিতে লাগল।

এবার ল্যান্ডিংয়ের পালা, বিমান তার গতি কমিয়ে একেবারে নিচের দিকে নেমে আস্তে আস্তে রানওয়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকল। আর আমি এই ফাঁকে উপর থেকে দেখলাম সাজানো গোছানো এক অসাধারণ মেলবোর্ন !

প্লেনের জানালা দিয়ে আমি যখন মেলবোর্নের রূপ মাধুর্য দর্শনে মগ্ন এমনি এক সময় রানওয়েতে প্লেনের চাকার স্পর্শে প্রচণ্ড এক ঝাকুনিতে সম্বিত ফিরে পেলাম। খোদাতায়ালার অশেষ কৃপায় কোনো রকম ঝোট ঝামেলা ছাড়াই আমরা ল্যান্ড করলাম। তবে অস্ট্রেলিয়ার ইমিগ্রেশানের কড়াকড়ির ব্যাপারে পরিচিতজনদের কাছ থেকে শোনা গল্প আর বিমানে দেওয়া বারংবার সর্কবাণীর কথা মনে করে কিছুটা ভীতির সঞ্চার হল মনের মাঝে।

ইমিগ্রেশন অফিসার যদি না আবার উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ফিরতি ফ্লাইটে বাংলাদেশের টিকিট হাতে ধরিয়ে দেয়!

মুখস্তের মাঝ থেকে দু-চারটা দোয়া কালাম পড়লাম মনে মনে। ভালোয় ভালোয় যেন ইমিগ্রেশানটা পার হয়ে যেতে পারি!

ইমিগ্রেশান অফিসার কেবল কেন এসেছি, আর কার কাছে এসেছি- এ দুটো প্রশ্ন করেই পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে এক্সিটের রাস্তা দেখিয়ে দিল।

লাগেজ সংগ্রহ করে বাইরে আসার প্রায় মিনিট পনেরো অপেক্ষার পর আমাকে রিসিভ করতে আসা আপা দুলাভাইর সঙ্গে দেখা হল। অস্ট্রেলিয়ানদের প্রাথমিক শিক্ষা এবার বাসার দিকে না গিয়ে ভাগ্নে তাহজিবের 'কিন্ডারে'র সমাপনী ও সার্টিফিকেইট প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হবে প্রথমে।

সেখানে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ানদের প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতি আমাকে আরেক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা হলো। ভাগ্নে তাহজিব সার্টিফিকেট নেবে কিন্ডার শেষের, তবে সে কোনও পরীক্ষাই দেয়নি! ছাত্ররা পরীক্ষা না দিলেও ক্লাস টিচাররা একেকজন ছাত্রের সারা বছরের আমলনামার সারসংক্ষেপ বর্ণনা করে এক একটি চারিত্রিক সনদ দিয়ে দিচ্ছেন। এই সনদে একটা শিশুর মেধার মূল্যায়ন করার পাশাপাশি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোরও পর্যবেক্ষণ থাকে। ভবিষ্যতে কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবে বা জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে প্রাথমিক শিক্ষকের এই পর্যবেক্ষন পাথেয় হিসেবে কাজ করে।

জানতে পারলাম অস্ট্রেলিয়াতে জিসিএসই বা আমাদের দেশের এসএসসি সমমান পরীক্ষার আগ পর্যন্ত কোন ছাত্রকে 'পাস', 'ফেল' বা ক্লাসে 'ফার্স্ট', 'সেকেন্ড' এ ধরনের কোন র‍্যাংকিং বা বাৎসরিক পরীক্ষা পদ্ধতির মুখোমুখি হতে হয় না।

অস্ট্রেলিয়ান শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের মানসিকভাবে পরিপক্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত পরীক্ষা পদ্ধতিকে সমর্থন করে না। তারা মনে করে পরীক্ষা পদ্ধত্তি শিশুদের মনের ওপর বাড়তি চাপ দেয় এবং এতে করে শিশুদের মাঝে সৃষ্টিশীলতার পরিবর্তে বরং অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়।

যাইহোক, সবকিছু শেষে বাসায় গিয়ে লম্বা একটা ঘুম দিয়ে বিকেলের দিকে ঘুরতে বাহির হলাম। সকালে গাড়ি থেকে বাইরে আসার খুব একটা সুযোগ না থাকলেও এবার বিকালের মিষ্টি

আবহাওয়াটা দারুণ লাগল। বাতাসে বুনো গন্ধ, নির্মল আকাশ আর বাতাসে ভাসা সজিবতা অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়াকে করেছে অসাধারণ!

হুমায়ূন আহমেদ যখন ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ঘুরে বেড়ালাম মেলবোর্ন শহরের বিভিন্ন জায়গায়। রাত তখন সাড়ে ৮টায়। কিন্তু সূর্য ডুবার কোনো নাম নিশানাই নেই। যেন দ্বি-প্রহর। মনে পড়ল প্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের একটি লেখার শিরোনাম।

তিনি তখন ক্যান্সারাক্রান্ত অবস্থায় নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন। একটি জাতীয় দৈনিকে লিখেছিলেন "নিউয়র্কের আকাশে ঝকঝকে উজ্জল রোদ" শিরোনামে একটি লেখা। পড়েছিলাম সেটি। মনের এই পুলকিত ক্ষণে, প্রিয় কথা সাহিত্যিকের অনুকরণে আমিও ফেসবুকে নিজের তোলা ছবি দিয়ে লিখলাম," মেলবোর্নের আকাশে ঝকঝকে উজ্জল রোদ" !

মেলবোর্নের তরতাজা সামুদ্রিক মাছ চার পাঁচ দিন মাঝে মাঝে শপিং মল আর ফাস্ট ফুডের দোকানগুলো পরিদর্শন ছাড়া তেমন

কোথাও গেলাম না। বরং বাসায় বসে, ঘুমিয়ে আর খাওয়া-দাওয়ার মধ্যেই কাটিয়ে দিলাম।

বিশেষত মেলবোর্নের তরতাজা সামুদ্রিক মাছগুলোর কথা মনে হলে এখনো জিভে জল আসে।

এবার পরিকল্পনা হলো সমুদ্র দর্শনে যাওয়ার। সেই মোতাবেক পরদিন সকালেই আপা দুলাভাই

আর উনার কলিগদের কয়েকজনের পরিবারসহ রওনা দিলাম 'এপলো বে' নামক সী বিচে।

এই যাত্রার বিশেষত্ব হল প্রায় ২০০ কি.মি. দূরের যাত্রা পথে রয়েছে 'গ্রেট অশান রোড' । এর এক দিকে আছে আকাশ আর অপর দিকে সমুদ্র। প্রকৃতির এই অপরুপ সম্মিলনে নিজেকে হারিয়ে ফেলা ছাড়া গতি নেই।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রামে দৃশ্য

এছাড়া উপভোগ করলাম অস্ট্রেলিয়ার কান্ট্রি সাইড বা গ্রামাঞ্চলের আসাধারণ দৃশ্যগুলি।

মাইলের পর মাইল কোনো বাড়িঘরের অস্তিত্ব নাই। মাঝে মাঝে কিছু ফার্ম চোখে পড়ল। কিছুদূর পরপর দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো ভেড়া আর গরু।

দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন মস্ত আকারের একেকটি প্রস্তর খন্ড। মজার বিষয় হল এসব ফার্মের মালিকরা মাঝে মাঝে ট্রাক ভর্তি করে খাবার দিয়ে নাকি চলে যায়। আর যেসব পশুদের মালিকানা নেই তাদের বিভিন্ন পশুপ্রেমী ব্যক্তি বা সংগঠন এসে খাবার দিয়ে যায়।

বাংলাদেশে আমরা যখন প্রতি বর্গ কি.মি.-এ এক হাজার একশত বাষট্টি জন লোক বাস করে একজনের কাঁধের উপর আরেকজনের নিঃশ্বাস ফেলছি ঠিক তখন অস্ট্রেলিয়ানদের ভাগ্য বসবাস ছিল প্রতি কি.মি. মাত্র তিন দশমিক তিন! ভাগ্য বটে!

মাঝখানে হালকা বিরতির পর দুপুর ২টার দিকে আমরা পৌছুলাম গন্তব্যস্তল এপোলো বীচ। যেহেতু গ্রীষ্মের দুপুর ছিল তাই পর্যটকদেরও ছিল উপচে পড়া ভিড়। আমরা সমুদ্রে নেমে গোসলের প্রস্তুতি নিলাম।

আরেকটা বিষয় হল সতর্ক না থাকলে অস্ট্রলিয়ায় সূর্যের সাথে তাপ আপনাকে খুব সহজেই ধোকা দেবে। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালে রোদের তেজ এতটা অনুভূত না হলেও

ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আপনার চামড়া পুড়ে যাবে।

গাড়ি থেকে নেমে সূর্যের তাপ বাংলাদেশের তুলনায় খুব একটা বেশি অনুভূত হল না। তাই

পাত্তা না দিয়ে সমুদ্রে নামতে গেলাম। আপা ধমক দিলেন যেন কোনভাবেই সানস্ক্রিন লোশান না

দিয়ে বীচে না নামি। তার পরও হাতের অংশ খোলা ছিল বলে পুড়ে গেল।

সাধারণত পারিবারিক ভ্রমণে বাচ্চা-কাচ্ছা সাথে থাকলে অনেক সময় বড়দের আনন্দে ভাটা পড়ে। তবে আমরা তিনটি পরিবার একসাথে গিয়েছিলাম। সাথে অনেকগুলো বাচ্ছা থাকলেও সামলাতে কোন কষ্ট হল না। কারণ আমরা যে জায়গাটাতে গিয়েছিলাম সেখানকার স্থানীয় লোকজন তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফ্রি খাবার দাবার ও বাচ্ছাদের জন্য ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করেছিল। একজন একটা স্পিকারে ধারাভাষ্যও দিচ্ছিল। বাচ্চাদের সাথে অনেক বুড়োরাও যোগ দিলেন।

পর্যটক আকর্ষনের কি সুন্দর আয়োজন! ক্যাঙ্গারু দর্শন, আপেল পিকিং, আর তাহজিব,রাইফা ও নব্য পৃথিবীতে আগত ওয়াফাকে নিয়ে

মেলবোর্নের দিনগুলো স্বপ্নের মতই চলে যাচ্ছিল। ২৯ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় ভাগ্নে মারুফের ক্ষুদে বার্তা পেলাম যে আম্মার শরীর মোটেও ভাল

না। তাড়াতাড়ি ক্লিনিকে নেয়ার পরামর্শ দিলাম। হসপিটালের বেড থেকে ভিডিও কলে দেখলাম আম্মা শুয়ে আছেন। দুর্বল লাগছিল দেখতে। তবে

কথা বলছিলেন স্পষ্ট। ফোন রেখে দেয়ার সময় মনে হল ভাল করে দেখে নেয়ার চেষ্টা করছেন।

তখনো একবারের জন্যও মনে হয়নি এটাই আম্মার সঙ্গে শেষ কথা আমার।

পরদিন থেকেই আম্মার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকল। এটা শুনে টিকিট এগিয়ে সেদিনই দেশে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বাংলাদেশে তখন রাত হওয়ায় ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হল না। প্রতি মূহূর্তেই খবর নিচ্ছিলাম। অবনতি হচ্ছিল। রাত ১টার দিকে

ডাক্তার জানাল কোনো মিরাকেল ছাড়া আম্মাকে বাঁচানো সম্ভব নয়,কারণ উনার প্রেশার খুবই নেমে গেছে,আর হার্টের ছিদ্র থাকার কারণে প্রেসার তোলার জন্য কোনো ঔষধ প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

আম্মা আমাদের সকল ভাইবোনকে একটি অঙ্গিকার করিয়েছিলেন। মনে পড়ল সেই অঙ্গিকারের কথা। আম্মা আমাদের অনুরুধ করেছিলন যে শুক্রবার সামনে রেখে আমার যদি মৃত্যু হয় তবে জুমার নামাযের আগে যেন আমাকে দাফন করা হয়।

মহান রাব্বুল আলামীন আম্মার সেই দোয়া কবুল করে নিয়েছেন বলেই মনে হয়েছিল।রাত ৪ টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ থেকে ফোন পেলাম প্রিয় মা আমার চলে গেছেন মহান প্রভুর ডাকে।

আমার চারিদিকে এত আলো! তবু যেন অন্ধকার সবকিছু! নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না ঘরের ভেতর। দম যেন আটকে আসছিল।

আম্মাকে দাফন করা হয়ে গেলেও আমি আর এক মুহূর্ত অস্ট্রেলিয়ায় থাকলাম না। পরদিন টিকিট ম্যানেজ হলো। থাই এয়ারওয়েজের ফিরতি ফ্লাইটে আমি চললাম বাংলাদেশের পথে।

বাসা থেকে এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে দেখলাম মেলবোর্নের সেই রোদ্রজ্জল আবহাওয়া।

কিন্তু আমার কাছে কেন যেন মনে হচ্ছিল এ যেন এক বিবর্ণ ফ্যাকাশে মেলবোর্ন !

বিমানে বসে ভাবছিলাম হায়! মাত্র কদিন আগে অস্ট্রেলিয়াগামী ফ্লাইটটি কতই না মধুর ছিল! জীবনের সেরা একটা দিন মনে হয়েছিল। আর ফিরতি ফ্লাইটটি ঠিক ততটাই বিষাদময়! মা যাদের হারিয়েছে কেবল সেই ভুক্তভোগীরাই এই অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×