সমস্যার সমাধান হয়নি আজও

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

সমস্যা

মানুষ, মানবতা এবং স্বাধীনতা। মানবতা এবং স্বাধীনতার জন্য মানুষ তার জীবন ও জীবিকা উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। শরীরের রক্ত ঝরে এই স্বাধীনতার কারণে।

অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরে মানুষ স্বাধীনতা লাভ করে বিশ্বের নানা অঞ্চল ও দেশ মহাদেশে। শুধু কি ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্য এত বিসর্জন, এত আত্মাহুতি? যদি নৈতিক ও আদর্শিক স্বাধীনতা না আসে তবে এই দুঃখের কি শেষ আছে? যদি স্বাধীন দেশের মানুষ তাদের জীবনের জন্য নির্ধারিত সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত জীবন বিধানের ভিত্তিতে জীবন গড়ে তুলতে না পারে তবে সকল দুঃখ এবং না পাওয়ার মর্মজ্বালা বুলেট দিয়ে হত্যার চেয়ে কঠিন কষ্টের শিকার হতে হয় ভুক্ত ভোগীকে।

এরচেয়ে কঠোর নিষ্ঠুরতা বোধহয় এই পৃথিবীতে মেলা ভার। যুদ্ধ কখনও শান্তি আনতে পারেনি। যুদ্ধ করে বহিঃশত্রু তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করা এবং সেই স্বাধীনতাকে উপভোগ করা আর গৃহযুদ্ধে তিলে তিলে ধ্বংস হওয়া এক নয়। গৃহযুদ্ধের কারণে সব ছেড়ে ভিন দেশে আশ্রয় নেয়া এবং সব কিছু ভুলে নতুন জীবন শুরু করা কঠিন ব্যাপার। সব কিছু হারিয়ে দেশান্তর হওয়া একটি মেয়ের জীবন কাহিনীর ওপর কিছু বর্ণনা করব।

বাগদাদ শহরে রাতের আঁধারে বাবা-মা এবং ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জায়েদার পরিবার ইরাকের কুর্দি জাতির লোক এটাই ছিল অপরাধ। ২০০৬ সালের কথা, জায়েদার বয়স তখন ১৯ বছর। জীবন বাঁচাতে পাশের দেশ নয় সোজা চলে আসে সুইডেনে এবং সুইডিশ সরকার কুর্দি জাতির লোকদের সুইডেনে বসবাস করার অনুমতি দেয়। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, পরিবার হারা জায়েদা দিনে দিনে মানিয়ে নিতে শুরু করে সুইডেনের পরিবেশ। একইসঙ্গে মানুষিকভাবে দিনের পর দিন দুর্বল হতে থাকে। কোন এক সময় সুইডিশ এক বান্ধবী আনেলির সঙ্গে জায়েদার হৃদ্যতা গড়ে উঠে। আনেলি জায়েদার হারানো পরিবারের ঘটনায় মর্মাহত হয় এবং জায়েদাকে পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে।

কয়েক বছর পর জায়েদা চাকরি নিয়ে সুইডেনের নর্থ থেকে মুভ করে স্টকহোমে চলে আসে। আনেলির সঙ্গে জায়েদার সম্পর্ক বিলীন হতে থাকে। আনেলি তার নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কয়েক বছর পার হয়েছে হঠাৎ সংবাদপত্রের মাধ্যমে আনেলি জানতে পারে স্টকহোমের এক হোটেলে জায়েদার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু শয্যায় ২.৫ কোটি টাকা একটি ব্যাগের ভেতর পাওয়া গেছে।

পুলিশ চেষ্টা করছে খুঁজে বের করতে জায়েদার কোনো আত্মীয় স্বজন আছে কি যার কাছে টাকাগুলো হস্তান্তর করবে। সুইডেনের নিয়মে যথাযথ প্রমাণ ছাড়া ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা জমা নেবে না বিধায় পুলিশের হেফাজতে টাকাগুলো রয়েছে। সুইডিশ কর্তৃপক্ষ এও চেষ্টা করছে জানতে, কিভাবে এতগুলো টাকা (নগদ ক্যাশ) জায়েদার কাছে এলো এবং কে এই টাকার উত্তরাধিকার হবে এখন।

জায়েদা কি তাহলে অবৈধ অর্থ পাচার, নাকি নেশাকর (নারকোটিক) ড্রাগ বা মাদক দ্রব্যসমূহের চোরাচালানের (স্মাগলিং) সঙ্গে জড়িত ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লেগেছে সুইডিশ পুলিশ।

সুইডিশ সরকার জায়েদার জীবনের দায়িত্ব নিয়েছিল একদিন ঠিকই, পরে জায়েদা তার নিজের দায়িত্বে নতুন জীবন গড়তেই কি এই পথ বেছে নিয়েছিল, যার জন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছে।

জায়েদার মৃত্যু হয়েছে ২০১৭ সালে অথচ আজও জানা যায়নি জায়েদার মৃত্যুর আসল রহস্য। পৃথিবীতে এখনও অনেক ঘটনা ঘটে চলেছে যার উত্তর কেউ জানেনা। মানুষ জাতি বড্ড রহস্যময়, যত সহজে তাকে চেনা যায় তত সহজে তাকে জানা যায় না। আমার এ ঘটনা শেয়ার করার পেছনে একটি কারণ রয়েছে, তা হলো আমারা আমাদের অনেক কাছের মানুষের অনেক খবরই জানিনা। পরিবেশ পরিস্থিতির মোকাবেলায় কখন কে কিভাবে এবং কোথায় জীবনযাপন করছে তাও আমাদের অজানা। যে বা যারা হয়ত একদিন অতি কাছের ছিল পরে অনেক দুরে সরে চলে গেছে হৃদয়, মন এবং প্রাণ থেকে।

পৃথিবী বড় আজব জায়গা। এই আজব জায়গায় দুটো পথ রয়েছে ভালো এবং মন্দ। একটিকে গ্রহণ এবং অপরটিকে বর্জনের সুযোগ এবং স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। সুতরাং এত সুবর্ণ স্বাধীনতা প্রদানের পরেও আর কোনো স্বাধীনতা পাওয়া চাওয়ার কি কোনো যুক্তি অবশিষ্ট থাকে? আমাদের অবিরাম সাধনা বা কঠিন অর্জন যা হতে পারে জায়েদার মত বা স্যার ফজলে হাসান আবেগের মত, সব কিছুই একদিন বর্জন করে চলে যেতে হবে। মৃত্যু শয্যায় জায়েদা ২.৫ কোটি টাকা রেখে গেছে (যে টাকার সঠিক তথ্য নেই) এটাই কি তার অর্জন? নাকি দারিদ্র্য বিমোচনসহ এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্যার ফজলে হাসান আবেদের অবদান যা তিনি রেখে গেলেন সমাজের কল্যাণে সেটাই তাঁর অর্জন!

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×