হৃদয় আছে যার সেই তো ছবি আঁকে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

ছবি

জোহানেস পিটোক (Joannes Ptok) পরিবারের ছয় ভাই বোনের মধ্যে পঞ্চম। বাবা-মা তৎকালীণ বার্লিনের নাম করা ডাক্তার। অ্যাডলফ হিটলারের জন্ম এপ্রিল ২০, ১৮৮৯ এবং মৃত্যু হয় বার্লিনে এপ্রিল ৩০, ১৯৪৫ সালে। জার্মান দুই ভাগে বিভক্ত হয় ১৯৪৯ সালে ইস্ট এবং ওয়েস্টে। জোহানেসের বাব-মার বসবাস ওয়েস্ট বার্লিনে তবে দুইজনই ইস্ট বার্লিনের নাম করা হাসপাতালে কর্মরত তখন।

বার্লিন ওয়াল বানানোর কারণে বিভক্ত হয় বার্লিনও ইস্ট এবং ওয়েস্টে। তাই পিটোক পরিবার ইস্ট ছেড়ে ওয়েস্ট বার্লিন বেছে নেয়। জোহানেসের বয়স তখন মাত্র ৮ বছর। পিটোক নামের সঙ্গে পোল্যান্ডের বেশ মিল রয়েছে, প্রশ্নে জোহানেস উত্তর দিল তার দাদার বাড়ি পোল্যান্ডে ছিল। যাইহোক পুরো পরিবার উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ছয় ভাইবোনের মধ্যে শুধু জোহানেস বেছে নিয়েছে চিত্রকলা।

বেসিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষার্থে প্রথম দুই বছর ভিয়েনা (Vienna) এবং পরের দুই বছর স্টুটগার্টে (Stuttgart) চিত্রকলার ওপর প্রশিক্ষণ নেয়। প্রশিক্ষণ শেষে বিদেশ ভ্রমণে বেশ কয়েক বছর সময় দিয়েছে সে, তার মধ্যে ইন্ডিয়া ভ্রমণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সুদীর্ঘ একবছর সময় ব্যয় করে ইন্ডিয়ার বিভিন্ন জায়গায়।

পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার একটি গ্রাম নাম মায়াপুর, সেখানে পরিচয় ঘটে সুইডিশ চিত্রশিল্পী এভা বের্গের (Eva Berg) সঙ্গে। দুজনে দুজনার ভালোবাসার জালে সেই যে আটকে আছে, তার আর ছাড় হয়নি আজ অবধি। আমি এভা এবং জোহানেসকে চিনি ২৫ বছর যাবত। তাদের বসবাস স্টকহোমের অদূরে, আলমবি (Almby) নামে ছোট্ট একটি গ্রামে।

আলমবি সুইডেনের সাধারণ গ্রামের মত নয়, কিছুটা ভিন্ন। এ গ্রামের আশেপাশে স্কুল, দোকান, বাস চলাচল ব্যবস্থা কিছুই নেই। তবে রয়েছে প্রচুর জঙ্গল, সুন্দর একটি লেক, সঙ্গে ছোট ছোট সুইডিশ সামার কটেজ। এভা এবং জোহানেস বছরের বারো মাসই আলমবিতে বসবাস করে। এরা পৃথিবীর আর দশজন চিত্র শিল্পীর মত নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন। অসাধারণ কারুকাজ এবং ভিন্ন চিন্তা চেতনায় গড়ে ওঠা শিল্পীর হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ যা দেখা যায় এদের চিত্রকর্মে।

গৌরীপ্রসন্ন মুজমদারের কথাগুলো নচিকেতা ঘোষের সুরে মান্নাদের কন্ঠে শুনেছি আমরা- যদি কাগজে লেখো নাম কাগজ ছিড়ে যাবে, পাথরে লেখো নাম পাথর ক্ষয়ে যাবে, হৃদয়ে লেখো নাম সে নাম রয়ে যাবে। মজার ব্যাপার হলো এভা এবং জোহানেস কাগজে নয়, কাঠ এবং পাথরের ওপর ছবি আঁকে। আমার জানামতে জোহানেস পৃথিবীর একমাত্র শিল্পী যে বেছে নিয়েছে পাথরে ছবি আঁকা। ছোট ছোট কাঠ এবং পাথরের ওপর আঁকা কখনও পাখি, কখনও কাঠবিড়াল আবার কখনও বা একগুচ্ছ ফুলের তোড়া, হৃদয়ছোঁয়া এক শিল্পকাজ যা দেখলে মনপ্রাণ ভরে যায়।

আমি এভা এবং জোহানেসের চিত্রকলার পারদর্শিতায় মুগ্ধ। আমার বাসার দেয়াল ঘুরলে তাঁদের হাতের কারুকাজের ছোঁয়া মিলবে। তাঁরা এসেছে বহুদিন পরে আজ আমাদের বাড়িতে। সন্ধ্যার ডিনার শেষে কিছু কথা তাঁদের সঙ্গে। সেই কবে জার্মান ছেড়ে এভার হাতে হাত মিলিয়ে বসবাস করে চলছে সুইডেনে।

ছবি আঁকার জগতে মুগ্ধ হয়ে আছে তাঁর হৃদয়-মন-প্রাণ। জোহানেসের বাবা-মা বেঁচে নেই, আছে তিন বোন ও এক ভাই এবং তাঁরা জার্মানের বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং অন্য শহরে বসবাস করছে। জোহানেসের চিত্রকর্ম দেখলে মনে হয় হৃদয় আছে যার মধ্যে, ভালো তাকে বাসতে হবে তাঁর আঁকা প্রতিটি ছবি। পাথরে আঁকা প্রতিটি ছবি যা দেখলে মনের মধ্যে নতুন চেতনার সৃষ্টি হয়, বেঁচে থাকার আকাঙ্খা বেড়ে যায়। জোহানেস সুইডেনের চিত্রকলা জগতের এক ভিন্ন মানের নাম।

গোটা বিশ্বে তাকে অনেকে চেনে যদিও এখনও সে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেনি। তবে কোন একদিন হঠাৎ করে হয়তো শোনা যাবে তাঁর একটি চিত্রকর্ম গোটা বিশ্বের মানুষের মন কেড়ে নিয়েছে। হয়তবা আগামী ১০০ বছর পরে জোহানেসের পাথরে আঁকা ছবিগুলো মোনালিসার মত খোদাই করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিউজিয়ামে ঝুলিয়ে রাখা হবে। সে সময় সে থাকবে না।

সময়ই বলে দেবে এই প্রতিভা কখন পৌঁছে যাবে সারাবিশ্বে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হয়ে গেল। বিদায়পর্ব শেষ হল। একা ঘুরে ঘুরে দেখছি আমার ঘরের দেয়ালে ঝোলানো এভা এবং জোহানেসের অসাধারণ চিত্রকর্মগুলো এবং ভাবছি, নতুন প্রজন্মের মধ্যে কে বা কারা বেছে নেবে এই নতুন চিন্তা চেতনায় ভরা ভিন্নধর্মী এই দুই তারকার চিত্রকর্মকে! কার মধ্যে খুঁজে পাবো এভাকে? কেইবা হবে নতুন আর এক জোহানেস!

জানা গেলো না, শেখা হলো না, দেখাও হলো না -হঠাৎ যদি অন্ধকার নেমে আসে জীবনে, কী হবে যদি নতুন আলো জ্বলে না ওঠে! এভা এবং জোহানেসের অসাধারণ চিত্রকর্ম যা ভালোবাসা দিয়ে আঁকা হয়েছে কাঠ এবং পাথরে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×