আর অজুহাত নয় দরকার সমাধান

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৩ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

সমাধান

দেশে বর্তমান এমন অবস্থা বিরাজ করছে যেখানে উচ্চশিক্ষিত (বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়) হতে যত বছর সময় লাগছে চাকুরি পেতে সেই শিক্ষার্থীকে তার চেয়েও বেশি সময় অপচয় করতে হচ্ছে।

বর্তমানে চাকুরির যে সামান্য সুযোগ দেশে রয়েছে তার দিকে চেয়ে আছে লাখ লাখ বেকার যুবক। চাকুরিতে লোক নিয়োগ হবে একজন, হাজার প্রার্থী তাতে আবেদন করছে। দেশে কোটা সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও হচ্ছে কি চাকুরি সবার? যারা চাকুরি পাবে না তাদের কর্মসংস্থানের জন্য কী ভাবা হচ্ছে? দেশে লাখ লাখ বেকার তৈরির এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কি কোনো জবাবদিহিতা আছে? এখনও চলছে সেই সনাতন শিক্ষাদান পদ্ধতি, যা বয়ে আনছে দেশে শুধু অন্ধকার ও বেকারত্ব। বর্তমানে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারা জানে না কি ধরনের শিক্ষা দেয়া দরকার।

আমরা জানি, শিক্ষকদের সক্ষমতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দরকার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। সেক্ষেত্রে দরকার শিক্ষকদের পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি করা এবং সময়ের সঙ্গে যুগোপযোগীকরণে সহায়তা প্রদান করা। শিক্ষকদের মধ্যে ব্যক্তিত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি জাগ্রত করা, নতুন নতুন শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হওয়া, দক্ষতা ও কৌশল বৃদ্ধি করা, দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতন থেকে কার্যসম্পাদনের জন্য শিক্ষকদের উৎসাহিত করা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ধারার একমাত্র বাহক শিক্ষক সমাজই যদি মজবুত না হয়, শিক্ষার্থী নামক অভিযাত্রীরা কি নির্বিঘ্নে শিক্ষা নামক বৈতরণী পাড়ি দিতে পারবেন? সে প্রশ্ন সব নাগরিকের, সব অভিভাবকের এবং আমার।

শিক্ষাঙ্গনে বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণ প্রদানে উদ্বুদ্ধ হবে শিশুদের প্রারম্ভিক জীবন। শিশু বিদ্যালয় শিশুদের জন্য অনুকরণ এবং অনুসরণের জায়গা সেক্ষেত্রে সেখানে থাকা দরকার শিশু মনোবিজ্ঞানি, নার্স, সমাজকর্মি, ক্রীড়া শিক্ষক এবং শিক্ষানীতি। শিশুদের ১-১৫ বছর বয়সের মধ্যে সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরকে আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে হলে মানসম্পন্ন পরিবেশের মধ্যে শিক্ষা প্রদান করতে হবে। আছে কি বাংলাদেশের শিশু বিদ্যালয়ে এমন কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাপদ্ধতি চালু, যেখানে চর্চা হচ্ছে এমন মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা?

অথবা সেইভাবে তৈরি হচ্ছে কি তেমন শিক্ষক যারা পারবেন মোকাবেলা করতে এই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা? যদি না থাকে তাহলে কি আমরা যেভাবে আছি ঠিক সেভাবেই থাকব? নাকি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মকে শুধু বাংলাদেশি নয় গোটা বিশ্বের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলব সুশিক্ষার মাধ্যমে! বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে ঊর্ধ্বমুখী এক দেশ। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ও সময়ের স্রোতে এ দেশের সব সেক্টরেই লেগেছে আজ ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। কিন্তু আমাদের ধ্যান-জ্ঞানে এ ছোঁয়া আজও লাগেনি।

দুঃখের বিষয় দায়িত্ব ও দায়সারাগোছের এই শিক্ষা ম্যানেজমেন্টের কারণেই আজ শিক্ষার এই অধঃপতন। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা এই অবনতিকে শনাক্ত করতে পেরেছি, অতএব এখন সমাধানের সময়। এখন নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এবং প্রত্যেকটি শিক্ষককে জানতে হবে চাহিদাগুলো কী এবং তার জন্য কী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও নিবিড় প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেশে সুশিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমি একাধিক আধুনিক ধারণা দিয়েছি।

যেমন বর্তমান বিশ্বে চলছে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং গোটা বিশ্বের শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি তাকে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে এখন আজীবন চাকুরি বলে কিছু নেই। চাকুরি আছে ততদিন, যতদিন কাজ আছে এবং কাজ আছে ততদিন যতদিন চাহিদা আছে। শেয়ার মার্কেট নির্ধারণ করছে বর্তমান কর্মসংস্থান ও চাকুরির স্থায়িত্ব। শেয়ারহোল্ডার, রাজনৈতিক, ক্লাইমেট পরিস্থিতি- এসব বিশাল আকারে প্রভাব বিস্তার করছে শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে। শিক্ষা ও শিক্ষার মান নির্ভর করছে গ্লোবাল চাহিদার ওপর এবং তাও হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট লেভেলে। সে ক্ষেত্রে নিশ্চিত করে বলা কঠিন কী পড়লে সারাজীবন চাকুরির গ্যারান্টি মিলবে। তবে সারাজীবন টেকসই ইন্ডাস্ট্রি প্রভাইডার এবং যোগ্য নাগরিক হিসাবে বেঁচে থাকতে হলে দরকার সময়োপযোগী শিক্ষা। উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার যে, বাংলাদেশে সুশিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ফলোআপ খুবই জরুরি। দেশে তার জন্য পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

ফলে প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে আলাদা আলাদাভাবে কিছু শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেগুলো দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা বিস্তারে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাছাড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে দেশে দিনে দিনে শিক্ষিতের হার বাড়লেও বাড়ছে না শিক্ষার মান। তাই দেশের জনশক্তিকে দ্রুত জনসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। অতএব সময় এসেছে ভেবে দেখার মানুষ গড়ার কারিগর হতে হলে কী দরকার। দরকার মিশন, ভিশন ও পলিসি। সঙ্গে ডেডিকেশন, প্যাশন, মোটিভেশন, গোলস ও অবজেকটিভস এবং দরকার যারা জানে তাদের থেকে শেখা এবং সেসব নিয়মকানুন প্রয়োগ করা।

দেশের সব শিশুশিক্ষা বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সবস্তরের শিক্ষকবৃন্দ প্রশিক্ষণ প্রদান ও গ্রহণের একটি সমন্বিত কার্যক্রমের আওতায় থাকবে। যেখানে দেশ-বিদেশের বড় বড় কোম্পানি বা সংস্থার মালিক বা সিইও, কর্মকর্তা, গবেষক, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকবৃন্দ একত্রিত হয়ে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষকদের পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি ও যুগোপযোগীকরণে সহায়তা প্রদান করবে।

এছাড়া শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি জাগ্রত করা, নতুন নতুন শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষতা ও কৌশল বৃদ্ধি করা হবে এই বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য। তা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষকদের মধ্যে বুনিয়াদি, কার্যকর ও আধুনিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার এক নতুন চিন্তা সরকার ও দেশবাসীর কাছে উপস্থাপন করেছি। এ লক্ষ্যে আমি সরকারকে অনুরোধ করেছি যেন “আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এক অগ্রণী চিন্তায় আমার পৃথিবী উদ্ভাসিত হয় আমার জ্ঞানের আলোকে।” এই শিক্ষা হবে আমাদের উপার্জনের হাতিয়ার।

এমতাবস্থায় শিশু শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নিবিড় নজরদারি চালু রাখতে হবে। কী শিক্ষা, কেন শিক্ষা, শিক্ষার উদ্দেশ্য কী এবং তা কীভাবে মনিটরিং করতে হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সব সময় সচেতন থাকতে হবে। প্রশিক্ষণের সর্বস্তরে পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলতে হবে সুশিক্ষার সার্বিক অবকাঠামো, যেখানে থাকবে জানার থেকে শেখা কনসেপ্ট। কোনো প্রকার দুর্নীতি বা অনিয়ম যেন কলুষিত করতে না পারে শিক্ষক বা শিক্ষা প্রশাসনকে। একই সঙ্গে গণতন্ত্রমনা ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে নিরাপদে ও গর্বের সঙ্গে দায়িত্বকর্তব্য পালন করবে এবং মতামতের ভিন্নতা সত্ত্বেও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে তারা সামাজিক ঐক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। একটি বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে তা হল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো স্তরেই যেন এমন কিছু শিক্ষাদান করা না হয়, যাতে ছাত্রছাত্রীরা ধর্ম-বর্ণ, জাতি, সম্প্রদায়ের বিভেদ জ্ঞানে কলুষিত হয়ে পড়ে। জ্ঞানদান যেন এমন হয় যে সবকিছু জানার মাধ্যমে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঐক্য ও ভাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রদবদল করতে হবে প্রথমে এবং জনগণের মনোনীত প্রার্থী ও স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে এ কাজ শুরু করতে হবে।বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সব শ্রেণির শিক্ষককে সুশিক্ষার আওতায় আনতে ও তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। তাই আর দেরি না করে এই বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তৈরি করতে হবে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মানসম্পন্ন প্রয়োজনীয় শিক্ষার মাধ্যমে তৈরি করতে হবে সুশিক্ষিত জাতি।

যেখানে জাতি তার উত্তর খুঁজে পাবে -কী পড়তে হবে, কতটুকু পড়তে হব, কতজনকে পড়তে হবে, দেশের চাহিদা কতটুকু ইত্যাদি। সুশিক্ষার কারিগর পেতে হলে এবং মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে হলে দরকার এই বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্টে জানতে হবে, জানতে হলে শিখতে হবে, শিখতে হলে পড়তে হবে, আর পড়তে হলে চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে, তবেই হবে প্রশিক্ষণের সার্থকতা আর শিক্ষক হবে সুশিক্ষার কারিগর। শিক্ষাঙ্গনে এই বিরাট পরিবর্তনের জন্য চাই সংশ্লিষ্ট সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×