সন্তানের মানসিক চাপের কারণ বাবা-মা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৫ মার্চ ২০২০, ১৮:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ

চাপ

যেকোনো দুশ্চিন্তা ব্যক্তির পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভর করে। যেমন বর্তমান করোনাভাইরাস সবার মনে কম বেশি টেনশনের সৃষ্টি করেছে। টেনশন যে কোনও সময় তৈরি হতে পারে। এর উৎসও ভিন্ন হতে পারে। টেনশন মূলত ভয় বা আশঙ্কা যা মানসিক চাপের উৎপত্তিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

যেমন যদি পরীক্ষায় ফেল করি, যদি মারা যাই, যদি চাকরি না পাই ইত্যাদি নানা অজানা ভয় আমাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব তৈরির মাধ্যমে দুশ্চিন্তার পথকে প্রশস্ত করে। তবে সামান্য টেনশন বা চাপ থাকা অনেক সময় ইতিবাচক ফল প্রদান করে। যেমন পরীক্ষা বা খেলা শুরু হওয়ার আগে সামান্য টেনশন মনোযোগী হতে সাহায্য করে।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ সুস্থ বা অসুস্থ শরীর বলে কথা নেই। কারণ চাপ চাপই, তবে শরীরের সুস্থতা নিশ্চিত করে কি পরিমাণ চাপ সহ্য করা সম্ভব এবং তা নির্ভর করে চাপের ধরণের ওপর। চাপের কারণ নির্ভর করে আশা বা প্রত্যাশার ওপর।

নিজের ওপর নিজের চাপের কারণ হলো প্রত্যাশা। নিজে ছাড়া আশা বা প্রত্যাশার ওপর যারা চাপ সৃষ্টি করে তার মধ্যে রয়েছে যেমন বন্ধু/বান্ধবী, বাবা-মা, পরিবার, লেখাপড়া, চাকরি, সমাজ ইত্যাদি।

মানসিক চাপ, বিষন্নতা ও দুশ্চিন্তা- এ তিনটি শব্দ আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও আমরা এর থেকে মুক্তি পেতে পারছি না। স্ট্রেস বা মানসিক চাপের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করানোর কিছু নেই।

প্রতিদিনের বিভিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতি, যেমন কোনও জটিল সমস্যা, চ্যালেঞ্জ, অতিরিক্ত কাজ, প্রত্যাশা ইত্যাদির ফলে আমাদের দেহ ও মনের ওপর যে চাপ পড়ে তাকে আমরা স্ট্রেস বা মানসিক চাপ বলতে পারি।

অর্থাৎ দৈহিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক বা পেশাগত চাপের কারণে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সৃষ্টি হয় এক অস্থিতিশীল অবস্থা, যা পরবর্তীতে হতে পারে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণ।

দীর্ঘকালীন মানসিক চাপ বয়ে আনে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা যা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে, পরিশেষে আমরা হয়ে যাই অসুস্থ। বাংলাদেশে শিক্ষা জীবনের শুরুতে বাবা-মার থেকেই শিশুর ওপর চাপ পড়ছে বেশি।

এ চাপের প্রধান কারণ যা বাবা-মা করতে ব্যর্থ হয়েছে তাই এখন সন্তানকে দিয়ে পূরণ করতে চায়। যার কারণে চলছে বইয়ের চাপ, সিলেবাসের চাপ, পরীক্ষার চাপ, সৃজনশীল শিক্ষার চাপ, জিপিএ-র চাপ। তারপরও কিন্তু সন্তুষ্ট নয় কেউ।

মনপুত ফল না হওয়ার কারণে যেমন কেউ ফেল করছে, কেউ কাঙ্ক্ষিত জিপিএ পেল না বা কারও জিপিএ ভাল তবে জিপিএ গোল্ড হলো না, সে ক্ষেত্রে মন খারাপ। যার কারণে মনের ওপর চাপ।

অনেকের আবার ভালোর ওপর চাপ, যেমন গোল্ডেন এ পেয়েছে তবে মন খারাপ গোল্ডেন এ প্লাস হয়নি বিধায়। আবার দেখা যাচ্ছে সন্তান খুশি কিন্তু বাবা-মা খুশি নয়। সেক্ষেত্রে বাবা-মার মধ্যে চাপ কি হবে, কোথায় ভর্তি হবে বা কি পড়বে ইত্যাদির কারণে।

বড়দের মত শিশুরও আত্মসম্মান বোধ আছে। কোমল সম্মানে আঘাত আসলে তা কিন্তু অসহ্যর হয়। সর্বক্ষণ নিপীড়নের শিকার হলে মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়, যার ফলে অনেকে হাসতে, খেলতে ভুলে যায়, খাওয়ায় অরুচি হয়, কথা বলতে চায় না।

উচ্চাকাঙ্খী বাবা-মা, শিক্ষক, স্কুল আর রাষ্ট্রের সম্মিলিত চাপে নিষ্পেষিত শিশুর মেজাজ যায় রুক্ষ্ণ হয়ে। শেষে তার নতুন ঠিকানা হয় ডাক্তারের ক্লিনিক। অনেকে বেছে নেয় মাদক, কম্পিউটারের নেট সাইটের জগত। ঘুম হয় না রাতে বিধায় সারাদিন ঘুমায়, ফলে এসব পরিবেশগত বিষয়ের প্রতিক্রিয়া থেকে সৃষ্টি হয় স্ট্রেসের। বিশ্রামহীন বা অতিরিক্ত কাজ করার অন্যতম একটি কারণ স্ট্রেস বর্তমান সময়ে।

এ পরিবর্তনগুলো মানসিক, শারীরিক বা আচরণগত, বা তিনটির সংমিশ্রণও হতে পারে। এখনকার ব্যস্ত জীবনে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্যস্ততা আর উদ্বেগ মিলিয়ে মনের ওপর বেশ চাপ যাচ্ছে। যার ফলে মনে প্রশান্তি আনার সুযোগ মিলছে না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়লে শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর একধরনের প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। আর এভাবে তৈরি হচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম।

আমার বর্ণনায় শুধু বাংলাদেশের প্রজন্মদের কথা নয় এটা গোটা বিশ্বের প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি। এখন যদি আমরা মনে করি এভাবে চলতে দেয়া যাবে না তাহলে কি করণীয় রয়েছে আমাদের? প্রথমত আমাদের এক্সপেক্টেশন সন্তানের ওপর যাতে মানসিক চাপ না সৃষ্টি করে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

হটাৎ করে এমন একটি পরিবর্তন বাবা-মার জন্য এক নতুন চাপ। সন্তানের ওপর লেগে থাকা থেকে বিরত থাকা এ চাপ সহ্য করতে বাবা-মাকে কিছু কাজ করতে হবে। যেমন সন্তানের খাবারের দিকে নজর দিতে হবে, যে খাবারে পুষ্টি উপাদানগুলো রয়েছে যা স্নায়ুকে শীতল রাখতে সহায়তা করে, সাময়িকভাবে হলেও তা কিছুটা মানসিক চাপ কমায়।

এ খাবারগুলো যেন বাসায় থাকে সে বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে। শরীর সুস্থ রাখার জন্য খেলাধুলা ও শারীরিক অনুশীলন খুবই কার্যকর। এগুলো মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে সহায়তা করে। যদি খেলাধুলা হয় যাস্ট ফর ফান। ঘুম মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে।

আর তাই প্রতি রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। খেলাধুলা করলে মানসিক চাপ অনেকাংশে কমে যায়। ফুটবল থেকে শুরু করে সব ধরনের খেলাধুলার ওপর দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করা দরকার।

নিজেরা খেলুন এবং অন্যকেও উৎসাহিত করুণ। বাবা-মার উচিত হবে শুধু সন্তানের ওপর না লেগে বরং নিজেরা বাড়ির কাজ করুন, আপনার বাড়ির বিভিন্ন ধরনের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।

এ কাজগুলো আপনাকে আনন্দ দেবে। আর এ কারণে মানসিক চাপও কমে যাবে। সন্তানের সঙ্গে আপনিও নানা ধরনের ফলের রস পান করুন, পুষ্টিকর জুস পান করলে মানসিক চাপ কমবে। বাড়ির কাজ করুন আর মনের আনন্দে গলা ছেড়ে গান করুন, কারণ গলা খুলে গান গাইলে তা আপনার মানসিক চাপ অনেকাংশে কমিয়ে দেবে। সময় পেলে হাঁটার চেষ্টা করুণ, মানসিক চাপ কমানোর অন্যতম একটি উপায় হলো হাঁটা।

প্রকৃতির কাছাকাছি হাঁটলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়, আমি নিজে প্রতিদিন হাঁটি। সক্রিয়ভাবে খেলাধুলা করা, ঘাম-ঝরানো বা কায়িক পরিশ্রম যে শুধু শরীরের উপকার করে, তা নয়, পরিশ্রমের ফলে শরীরের অন্তর্নিহিত বিশেষ রাসায়নিকগুলি ক্ষরিত হয়। এদের মধ্যে এন্ডরফিন (endorphin) রাসায়নিকটি বিশেষভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্নঅংশে কাজ করে যা আমাদের হাসি খুশি রাখতে ও স্ট্রেস-মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

এটা যোগব্যায়াম-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সবশেষে যা উল্লেখ করা অবশ্যই প্রয়োজন তা হলো ভালো বন্ধু যোগাড় করুন, যে শুধু নিতে নয় দিতে জানে। ভালো বন্ধু মানে প্রভাবশালী কেও নয়, একজন সৎ নিষ্ঠাবান ভালো মনের মানুষ।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫১ ২৫
বিশ্ব ৮,৫৬,৯১৭১,৭৭,১৪১৪২,১০৭
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×