পুঁথিগত এবং সৃজনশীল শিক্ষার সমন্বয়ই সুশিক্ষা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৬ মার্চ ২০২০, ১৫:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

পুঁথিগত এবং সৃজনশীল শিক্ষার সমন্বয়ই সুশিক্ষা

সোশাল মিডিয়া কেড়ে নিয়েছে মানুষের সেই ছোটবেলার আড্ডাখানা, কেড়ে নিয়েছে নিঃসঙ্গতাকে, কেড়ে নিয়েছে ইন্টিমেট ভালোবাসাকে। বিনিময়ে সুযোগ করে দিয়েছে এক ঝাঁক বুনো হাঁসকে দেখার, দিয়েছে আমাদেরকে ব্যস্ত করে, দিয়েছে কাছের মানুষকে দুরে সরিয়ে আর টেনে এনেছে দূরের প্রবাসীকে কাছে।

খেতে, বসতে, শুতে এমনকি রাত জেগে সবাই সময় দিচ্ছি এই মিডিয়ায়। অথচ সবাই বলছে তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য একটি সময়, সুন্দর ভবিষ্যৎ হত্যার পাশাপাশি নিজেদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে সোশাল মিডিয়া। তাছাড়া এসব সাইটে অনৈতিক বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ, ফটো, অশ্লীল পেজ ইত্যাদিতে যুক্ত হয়ে চরিত্রকে নষ্ট করে দিচ্ছে অনেকে।

মেসেজিং, চ্যাটিংয়ে রাত কাটিয়ে একে অপরের সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে সবাই ইত্যাদি।

মনে পড়ে গেল “Shaken, not stirred" is a catchphrase of Ian Fleming's fictional British Secret Service agent James Bond, and his preference for how he wished his martini prepared because stirring a drink diminished its flavour. Both shaking and stirring a drink with ice serve to chill and dilute the drink.

এমনটি হয়েছে বর্তমানে। দেখা যাবে, কল্পনায় অনুভব করা যাবে, তবে ধরা বা ছোঁয়া যাবে না। যার কারণে আমরা অতি কাছের মানুষগুলো থেকে দিন দিন আড়ালে এবং দূরে সরে যাচ্ছি। বারবার মনে হয় এই বুঝি দূর থেকে কেউ আমার হৃদয়ের দারে এসে মধুর স্বপ্ন ভেঙ্গে বলছে “কেন দূরে থাকো, শুধু আড়াল রাখো, কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো!”

আমি আবেগপ্রবণ হয়ে উপরে আবেগের উপর কিছু বর্ণনা দিয়েছি, সোশাল মিডিয়াকে একটু দোষী করেছি। সোশাল মিডিয়ার কারণে এখন আর সেই আগের মতো ছোটবেলা এক জায়গায় বসে আড্ডা মারা, গসিপ করা, নদীতে সাঁতার কাটা, বিলে মাছ ধরা, বিকেল হলে খেলাধুলা করা হয় না। এসব এখন বন্ধ হয়েছে, শুরু হয়েছে সোশাল মিডিয়ার রাজ্য। যে রাজ্যের রাজা আমরা নিজেরা। কার সঙ্গে কি করব বা না করব এসব সিদ্ধান্ত নিই আমরা। আমরা এখন সবাই রাজা আমাদের নিজ নিজ রাজত্বে। তবে বাস্তবে ভেবেছেন কি এই সোশাল মিডিয়ার কারণে আমরা আমাদের অতীতের মত জীবন নতুন প্রজন্মদের দিতে পারবো না?

ভেবেছেন কি আমরা নিজেরাও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে শতভাগ অ্যাডজাস্ট করে চলতে পারবো না। সেক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পুরনোদের একটি সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ হবেই। সোশাল মিডিয়ার কারণে আমরা স্বপ্ন এবং কল্পনায় অনেক কিছু করতে এবং ভাবতে শিখেছি। কারণ আমাদের কাছের মানুষকে আমরা দূরে সরিয়ে দিয়েছি। তাদের সঙ্গে এখন আর আগের মতো কথা হয় না। সোশাল মিডিয়া যেমন টুইটার, স্ন্যাপচ্যাট, ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের মাধ্যমে টেক্সট করলে সেই কাছের মানুষগুলোর সাড়া দ্রুততার সঙ্গে পেয়ে যাচ্ছি।

তাহলে সমস্যা কোথায়? মানুষ অভ্যাসের দাস, তাই সবই অ্যাডজাস্ট হয়ে যাচ্ছে, যাবে। তাছাড়া তরুণ প্রজন্মের জন্য সব কিছু নতুন, তারা যেটা দেখে অভ্যস্ত সেটাই শিখছে। যেমন ডিজিটাল যুগে সব কিছু যেভাবে হচ্ছে সারা বিশ্বে এখন যদি বাংলাদেশ ভিন্নভাবে কিছু করতে বা বলতে চায় তা তো সম্ভব হবে না।

সেক্ষেত্রে বরং উচিত হবে ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুরু থেকেই অ্যাডজাস্ট হতে চেষ্টা করা, নইলে সারাজীবন পিছে পড়েই থাকতে হবে। আর একবার পিছে পড়লে সেখান থেকে ওঠা বড্ড কঠিন হবে। মাঝখানে হায় হতাশার সঙ্গে বাকি জীবনটা কেটে যাবে।

সেই পুরনো দিনের মত কফি হাউজের সেই আড্ডাখানা আর নেই। অনেক কিছুই নতুন ভাবে শুরু হয়েছে বর্তমানে এই প্রযুক্তির কারণে। যেমন এখন বেশির ভাগ লোকই লিখতে পারে, পড়তে পারে, যা অতীতে সম্ভব হয়নি। কারণ মোটিভেশনের অভাব ছিল, তার পর পৃথিবীতে সুযোগ সুবিধার সীমাবদ্ধতা যার যার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা আর নেই।

এখন কি সম্ভব মেয়েকে বলা যে দরকার নেই লেখাপড়া করা? সম্ভব নয়। তাই স্রোতের গতিতে নতুন প্রজন্মদের সুশিক্ষার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জানতে হবে সুশিক্ষা কী? আর তা জানতে হলে শিখতে হবে। সুশিক্ষা বলতে আমি শুধু পুঁথিগত শিক্ষাকে বলব না। কারণ পুঁথিগত শিক্ষায় সৃজনশীলতার অভাব রয়েছে।

একইসঙ্গে যাদের তেমন কোন শিক্ষাই নাই তারা সমাজের এক কোণায় পড়ে নির্যাতিত এবং নিপীড়িত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। “তাদের পথে, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন, এবং তাদের পথে নয় যারা আপনার ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট, আমীন”- (সূরা আল ফাতিহা, আয়াত নাম্বার ৭)। এখন সমাজে যারা শিক্ষিত বা অনেক লেখাপড়া করেছে, টাকা পয়সা এবং মান-সম্মানে তারা সমাজের একটি বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে। সবাই তাদের বড় মাপের গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে দেখছে, তার অর্থ এই নয় যে তাদেরকেই অনুকরণ বা অনুসরণ করতে হবে।

যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দেখব ব্যক্তির ব্যক্তিত্বে সৃজনশীলতার অভাব রয়েছে, মনুষ্যত্বের অবক্ষয় ঘটেছে, চরিত্রের অধঃপতন দেখা দিয়েছে, দিক নির্দেশনায় আলোর পথ থেকে সরে পথভ্রষ্ট হয়েছে, ততক্ষণ এসব ভণ্ডদের থেকে দূরে থাকতে হবে এবং সেই সঙ্গে পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়াও সৃজনশীলতার উপর শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সৃজনশীলতার ওপর শিক্ষা পেতে হলে নিজেকে সৎ, সুন্দর, চরিত্রবান এবং আদর্শবান হতে শিখতে হবে। তবেই হবে সুশিক্ষা। অতএব আমরা যেন সেই সুশিক্ষা গ্রহণ করতে পারি যে শিক্ষায় রয়েছে পুঁথিগত এবং সৃজনশীল শিক্ষার সমন্বয়। কথাগুলো বলতেন তিনি আমাদের। তিনি অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন স্বত্বেও সপ্তম শ্রেণির পর তাঁর লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি তখন।

তার স্বপ্ন ছিল কেউ যেন শিক্ষার আলো থেকে ঝরে না পড়ে। তিনি তাঁর স্বামীর সাহায্যে সব ছেলেমেয়েকে সমান সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন সৃজনশীল শিক্ষা পেতে। তিনি অনুপ্রাণিত এবং উৎসাহিত করেছেন প্রতিবেশীর সন্তানদের এবং প্রথম বাংলাদেশ নামের এই দেশটিতে উপহার দিয়েছিলেন নাইট স্কুল গ্রামের মহিলাদের জন্য তাঁর নিজের বাড়িতে।

গ্রামের মহিলাদের মধ্যে জ্ঞানের আলো দিতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ১৯৩৭ সালে বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি- আমাদের মা আলহাজ্ব হুরজাহান মৃধা। আমাদের মায়ের কাছে আমাদের অঙ্গীকার, তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় সুশিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া।

আমরা আমাদের বাবা-মার আদর্শ বুকে নিয়ে কাজ করে যাব সোনার বাংলা গড়তে। আমাদের মা ঘুমিয়ে আছেন সুইডেনের লিনসোপিং-এ; যেখানে আমার বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা এবং আমি লেখাপড়া করেছি। নতুন প্রজন্মের কাছে এতটুকু প্রত্যাশা তোমরা মন দিয়ে পড়ালেখা করবে, মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করবে।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৬ ২৬
বিশ্ব ৯,৮১,৪২৫২,০৬,২৭২৫০,২৫৫
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×