মিশন, ভিশন, পলিসি এবং কি কখন কেন?

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৮ মার্চ ২০২০, ২০:৫০:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

করোনাভাইরাসের কারণে টয়লেট পেপারের মত পণ্যের ক্রাইসিস দেখা দিয়েছে সুইডেনে। এমুহুর্তে বার বার শুধু একটি কথা আমাকে বিরক্ত করছে তা হলো কেন সেদিন মিটিংয়ে জোর গলায় চিৎকার করে বলিনি সব কিছু আউটসোর্সিং (নিজের কর্মী, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি বাদে অন্য কোন ব্যক্তি, কোম্পানি অথবা কোন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে যখন কোনো কাজ করানো হয় তাকে মূলত আউটসোর্সিং বলে) করা ঠিক নয়।

কেউ আমার কথার তেমন গুরুত্ব দেয়নি সেদিন। কারণ সে মিটিংয়ে সবাই ছিল ধনী দেশের নাগরিক, তাদের চিন্তা চেতনায় তারা মনে করে তারা যা জানে বা যে অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে তা আমার মত দরিদ্র দেশের নাগরিকের নেই। তাই তারা আমার কথার সেদিন গুরুত্ব দেয়নি। কি কথা এবং কেনই বা আমি সেদিন এটা সবাইকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হইনি? ১৯৯৫ সালের দিকে সুইডেনের শিল্প কারখানায় হিড়িক পড়ে গেল অটোমাইজেশন এবং আউটসোর্সিংয়ের ওপর।

এর মূলমন্ত্র ছিল হাইটেকের ব্যবহার শুরু করো আর লো-টেক এবং লো-টাচ দূর করো। সে আবার কি? ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রি সব সময় নাম্বার ওয়ান পজিশনে থাকবে - ডে ওয়ান থেকে এটাই তখন সবার চিন্তাভাবনা। ম্যানুয়ালি যেসব ওষুধ, মেডিকেল বা ক্লিনিক্যাল ইকুইপমেন্ট তৈরি করা হতো তা আউটসোর্সিং করা হবে। আর যে সমস্ত প্রোডাক্টের মূল্য বিলিয়ন ডলারের বেশি সেগুলোর প্রতি ফোকাস দিতে হবে।

যার কারণে তখন ঘোষণা করা হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিন ম্যানুফ্যাকচারিং এবং প্রোডাকশন প্ল্যানিং অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ইউরোপের সব ধনী দেশগুলো দক্ষতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ যেমন লিন ম্যানুফ্যাকচারিং সিস্টেম, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাকটিস, কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সিস্টেম, প্রোডাকশন অপটিমাইজেশন, সেফটি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট এবং সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স নর্মস—এ বিষয়গুলোর ওপর প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করল।

অনেক কোম্পানি তখন গুরুত্বপূর্ণ প্রোডাক্টগুলো ছাড়া বাকি সব উৎপাদন আস্তে আস্তে আউটসোর্সিং করতে শুরু করে, যেমন গ্লাবস, মাস্ক, গাউন, সিরিঞ্জ, পিপেট এসব আর সুইডেনে নয়, তৈরি হবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে। যে সব দেশে দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্রের অভাব, মূলত সেসব দেশেই তখন কম খরচে লো-টেক পণ্য তৈরির জন্য আউটসোর্সিং শুরু হয়। সেই থেকে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের গুরুত্ব বেড়ে যায় গোটা বিশ্বে।

বর্তমানে করোনাভাইরাসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রচণ্ড সংকট দেখা দিয়েছে। সুইডেনের হাসপাতালগুলো এই প্রথমবারের মত টের পেতে শুরু করেছে যা আমি বলেছিলাম সেদিন (১৯৯৫) সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং আউটসোর্সিংয়ের মিটিংয়ে। সব কিছু সঠিকভাবে মনিটর করা হলেও ক্রাইসিস পরিস্থিতিতে সমস্যার সমাধান করা কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে উচিত হবে না সবকিছু আউটসোর্সিং করা যতক্ষণ পর্যন্ত ম্যানেজমেন্টের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকে।

টেক্সটাইল কোম্পানি হেনেস মরিচ (H&M) তার প্রডাকশন বাংলাদেশে রেখেছে বটে তবে ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজাইন তাদের দখলে রয়েছে বিধায় আউটসোর্সিং স্বত্বেও তারা ভালো করছে আজ অবধি। করোনা ভাইরাসের কারণে ইউরোপে যে সমস্যাগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে তা হলো আউটসোর্সিংয়ের ফলে লো-টেক প্রোডাক্টগুলো এখন এদের কন্ট্রোলের বাইরে। সে ক্ষেত্রে বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী সব কিছু জাস্ট ইন টাইমে পাওয়া যাচ্ছে না।

এর ফলে হাসপাতালগুলোর ম্যানেজমেন্টে বেশ অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে। বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ গ্লোবালই আমরা এখন একে ওপরের উপর নির্ভরশীল।

একইসঙ্গে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের রাজনীতিবিদরা যে দিক নির্দেশনা দেখাচ্ছে যেমন বর্ডার ক্লোজ করে দিয়েছে, তাতে মনে হয় না আর কোনদিন পৃথিবীর মানুষ বিল্ডিং ট্রাস্ট বিল্ডিং গ্রোথ কনসেপ্টের ওপর বিশ্বাস করবে। এখন প্রশ্ন কি করণীয় থাকতে পারে ক্রাইসিস সময় মোকাবেলা করার জন্য?

বেসিক নিড যা না হলেই নয় সেসব পণ্য অন্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তাই সেগুলো নিজেদেরকেই তৈরি করতে হবে। হোক না সেগুলো লো-টেক বা লো-টাচের। বিপদে যেন সাধারণ মানুষ প্যানিক সৃষ্টি না করে সেদিকে নজর দিতে হবে। যুগে যুগে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যখনই কোনো বিপদ এসেছে, তখন ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিক্ষণীয় দিকগুলোরও দরজা খুলেছে।

এবারের নোবেল করোনাভাইরাস আমাদের তেমন একটি শিক্ষা দিয়েছে। যেহেতু পরের ওপর শতভাগ বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে উঠছে, সে ক্ষেত্রে নিজেদেরকে দায়িত্ব নিতে হবে। তার জন্য দরকার দক্ষ ম্যানেজমেন্ট এবং সুপরিকল্পিত সিস্টেম চালু করা। একটি কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান বা দেশ পরিচালনায় দরকার দক্ষ ম্যানেজমেন্ট, সিস্টেম ইন প্লেস, ইমপ্লিমেন্টেশন এবং তার বেস্ট প্রাকটিস, সর্বোপরি cGMP (কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাকটিস), ডকুমেন্টেশন এবং ফলোআপ। যেমন আমার টাকা আমি ছাড়া অন্য কেও ব্যাংক থেকে তুলতে পারে না। ঠিক সেভাবে আমার ভোটও অন্য কেউ দিতে পারবেনা। অথচ ভোট চুরি করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু কেন? কারণ সিস্টেম আছে তবে তার প্রয়োগ নেই। তার জন্য দরকার নিজস্ব পাসওয়ার্ড সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং ডিজিটাল ছবি।

যখন এ তিনটির সমন্বয় ঘটবে তখন সম্ভব হবে না ভোট চুরি করা। এভাবে আমরা অনেক কিছুর সমাধান করতে পারি যদি আমরা জানি আমাদের মিশন, ভিশন এবং পলিসি। সে সঙ্গে কি, কখন এবং কেন (www)? যেমন আমাদের জানতে হবে কি করণীয় আর কি হবে বর্জনীয় যদি দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। We need to change our outlook for better life. The sooner, the better. জানি আমার এ ইনোভেটিভ চিন্তা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না কারণ সময় নিজেই প্রস্তুত নয় এ ধরণের পরিবর্তনের জন্য।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত