করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কিছু প্রস্তাবনা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২১:৪৩:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

ঘুম থেকে উঠে দেখি এক নতুন দিন। ডিসনি ঘুরতে মানুষ নেই, প্যারিসে সব থাকতেও সেই রোমান্টিক সেলফি তোলার কেউ নেই, নিউইয়র্কে মানুষ শূন্য প্রাসাদগুলো দাঁড়িয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

চীনের প্রাচিরে মানুষ নেই, মক্কায় বান্দার দেখা নেই। একটু মহব্বতের কোলাকুলি যা ছিল ভালোবাসার চিহ্ন, আজ হয়ে গেছে জীবন লাশের হাতিয়ার। হঠাৎ অর্থ, স্বার্থ সব হয়েছে নিস্তব্ধ। একটু অক্সিজেন পেতে এখন সবাই ব্যস্ত। পৃথিবী আমাকে ছাড়াই চলছে দিব্যি।

আকাশ বাতাস পানি সবাই চলছে যার যার গতিতে আমি শুধু অসহায়। পৃথিবী তোমাকে চাই যদি আবার একটু সহানুভূতি এবং সুযোগ পাই। আমাদের সামনের দিনগুলো সত্যি বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাবে।

যেভাবে অর্থ দান করা হচ্ছে সারা পৃথিবীতে তাতে দেখা যাবে অর্থ থাকবে কিন্তু পণ্যের হবে অভাব। নতুন এক ভয়াবহ দুর্যোগ সময় আসবে যদি কোভিড-১৯ থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজে বের করতে না পারি। এখন আর কোনো সন্দেহের কারণ নেই যে করোনা আমাদের নিয়ন্ত্রের বাইরে। তারপরও সমস্ত জানালা এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি আমাদের।

বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় যারা আছে তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সমস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, প্রিয়জনকে দেখতে, ছুঁতে এমনকি তার জন্য কবর খুঁড়তে পারছে না। এমন একটি সময় মনে হচ্ছে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া আমাদের জন্য খুবই দরকার। যেভাবে শাটডাউন করা হচ্ছে তাতে তেমন কাজ হচ্ছে না। কারণ মানুষ যেখানেই যাচ্ছে ভাইরাসও সঙ্গে থাকছে।

সৈকত, রেস্টুরেন্ট, দোকান ইত্যাদি খোলা রাখা মানেই হল ভাইরাসের রেসিপি তৈরি করা। শাটডাউন মানে একেবারে শতভাগ শাটডাউন। মানুষের চলাচল বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ভাইরাসের চলাচল বন্ধ হবে না। যদি দশ সপ্তাহ একটানা সবকিছু বন্ধ থাকত তাহলে হয়ত এটা কমে আসত। আর তা না হলে যেভাবে চলছে তাতে দিনে দিনে দুঃখ শুধু বাড়বে। খাবারে সংকট দেখা দেবে, ওষুধ বাজারে মিলবে না।

মানুষের জন্য শুধু নতুন করে কবর খুঁড়তে হবে। সারা পৃথিবীর সরকার কর্তৃক টেস্ট বাড়াতে হবে। যাতে জনগণ খুব সহজেই টেস্ট করতে পারে। যত দ্রুত আমরা টেস্টের রেজাল্ট পাব এবং সঠিক নাম্বার জানতে পারব তত দ্রুত ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য সম্ভাব্য ভলান্টিয়ার তৈরি করা যাবে।

বিশ্বে প্রতিদিন যে হারে টেস্ট করা হচ্ছে, যেমন সাতদিনের পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টার ভিতরে টেস্ট রেজাল্ট দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়টির উপর আরও গুরুত্ব দেয়া দরকার। দেখতে হবে সমস্ত কর্মীরা সুস্থ কিনা, তারপর যারা খুবই অসুস্থ এবং যারা ভাইরাসে আক্রান্ত বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তাদের। ঠিক তেমনিভাবে মাস্ক ও ভেন্টিলেটর ব্যবহারের দিকটাও ঠিক করতে হবে।

মেডিকেল ইকুইপমেন্টের দাম যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। চিকিৎসার উন্নয়ন এবং ভ্যাকসিন তৈরির জন্য দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনো গুজব এবং প্যানিক যেন না ছড়ায়। কিছুদিন আগে ইমার্জেন্সি রোগীর চিকিৎসায় হাইড্রোক্লোরিন বা হাইড্রোঅক্সিলক্লোরোকুইন ব্যবহারের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এটা ক্রয় করে পুরো স্টক খালি করে ফেলছে, অথচ ভাবছে না কী হবে যদি অন্য কেউ অসুস্থ হয়? বেঁচে থাকার জন্য যাদের দরকার এমনকি তারাও এই ওষুধ আর পাবে না।

নিরাপদ এবং কার্যকরী ওষুধ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে প্রথমে যাদের দরকার শুধু তারাই যেন এটা ব্যবহার করার সুযোগ পায়। স্টক করে কী লাভ যদি সবাই মারা যায়, একা একা বেঁচে থাকার মধ্যে কি মজা খুঁজে পাবেন? করোনার এ মহামারী থেকে মুক্তির জন্য আমাদের প্রথমেই দরকার একটি নিরাপদ এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন। হয় তো এটা পেতে আরও বছরখানেক সময় লাগতে পারে। আর এটা বের হওয়া মানেই সব সমস্যার সমাধান নয় বা যুদ্ধে পুরোপুরি জয়লাভ নয়। কারণ গোটা পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করার জন্য আমাদের দরকার অন্য, দরকার ভ্যাকসিন, দরকার অন্যান্য ওষুধ।

এ সময় অনুন্নত প্রচণ্ড ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে পরিপূর্ণ লকডাউন কিংবা শাটডাউন করা কঠিন। সে ক্ষেত্রে ভাবতে হবে অন্য উপায় কী? দরকার নতুন ফ্যাসিলিটি তৈরি করা করোনা রুগীদের চিকিৎসার জন্য। ব্যক্তিগতভাবে এটা করা সম্ভব নয়। সরকারিভাবেই এটা করতে হবে। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ভ্যাকসিন ম্যানুফেকচারের জন্য সব ধরনের চেষ্টা করতে হবে। যদি বিজ্ঞান, হেলথ প্রফেশনালদের কথা শুনে পরিকল্পিতভাবে সামনের দিকে এগোনো যায় তাহলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচবে, এই দুর্যোগ একদিন মুছে যাবে এবং গোটা পৃথিবীর মানুষ নতুন করে জীবনের মূল্য ফিরে পাবে। প্রতিটি দেশেই দুর্যোগ বা ত্রাণ মন্ত্রণালয় রয়েছে। আছে নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী। এদের কাজ এখন শুধু এরকম জরুরি সময় যাবতীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় কাজ করা।

আমাদের সাহায্য করা একান্ত দরকার নানাভাবে, উচিত দুর্যোগ মোকাবিলা ফান্ডে দান করা। ঘরের কাজ করুন। ঘরে বসে ভবিষ্যতের প্লান করুন, যা ইচ্ছে তাই করুন। দোহাই লাগে, বিনা কারণে বের হয়ে অন্যের জীবন নাশের চেষ্টা করবেন না। ভাবতে হবে আপনার কারণে যেন অন্যের ক্ষতি না হয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান বা প্রশাসন তারা যেভাবে ত্রাণ বিতরণ করছে, তাতে মানুষের যেমন ভিড় বাড়ছে, পরস্পর পরস্পরের কাছাকাছি আসছে, আবার লোক দেখানোর জন্য সেলফি তোলার প্রতিযোগিতা চলছে। এখনকি রাজনীতি করার সময়? এখন কি গরীবের ত্রাণ লুটপাট করার সময়? কবে সচেতনতা আসবে আমাদের? নাকি কোনোদিনও আসবে না?

এ জীবনে সাধ মিটিলোনা কারও দুর্নীতি করে, হায়রে বাঙালি জাতি! যাই হোক যখনই একটি মাস্ক, এক বস্তা চাল নিয়ে রাস্তায় দলে দলে বের হচ্ছে, ভিড় জমাচ্ছে, এটা তখন ব্যক্তিসেবা হলেও দেশের সেবা হচ্ছে না। লক ডাউন হয়ে যদি সবাই ঘরের মধ্যে আড়তখানা তৈরি করে বা মাস্ক না ব্যবহার করে তাহলে যে লাউ সেই কদু। যত ট্রাভেল হবে ভাইরাস তত ট্রাভেল করবে। প্রিয়জনকে হারানোর আগে ভাবুন কথাটি, দয়া করে একবার ভাবুন, ভালো করে ভাবুন।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত