মৃত্যু পরবর্তী কার্যক্রম: সুইডেন বনাম বাংলাদেশ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ৩০ এপ্রিল ২০২০, ০৮:১৮:৫০ | অনলাইন সংস্করণ

জন্ম মানেই মৃত্যু। তার মানে মরতে একদিন হবেই। কথাটি সহজ করে বলতেও অনেকে সাহস হারিয়ে ফেলে। কথায় বলে, কী আছে জীবনে; আজ মরলে কাল দুইদিন। তবে যেদিন মৃত্যুর মুহূর্তটি সামনে এসে হাজির হবে, কী অনুভূতি হবে তখন? আমরা যারা বেঁচে আছি তারা জানি না।

কেবল জানে যারা সব ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা মাঝে মধ্যে যেমন বলি, মরতে একদিন হবেই সেটা মন থেকে বলি না। কারণ সে সময়টি কখন, কীভাবে আমাদের জীবনে আসবে তা তো আমরা বলতে আগে ভাগে পারবো না। তবে সত্যকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে কর্তব্যবোধের নির্মম নির্দেশ অনুসরণ করে যদি বেঁচে থাকাকালীন সব কিছুর হিসাব নিকাশ করা সম্ভব হয়, সেটা হবে সবচেয়ে উত্তম।

মৃত্যু নিয়ে কেউই কথা বলতে পছন্দ করবে না সেটা আমি জানি। তারপরও এই অপ্রিয় সত্যকে গোপন করে অনেকেই জীবন পার করে মৃত্যুবরণ করে। তখন মৃত ব্যক্তির অসমাপ্ত কাজগুলো থেকে যায়। তা সম্পন্ন করতে হয় যারা বেঁচে থাকে তাদের।

শুরু হয় আপনজনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব যা শেষে কোর্টে গিয়ে মীমাংসা করতে হয়। কারণ অর্থ এবং শর্ত যেখানে জড়িত, সেখানে ত্রুটি বিচ্যুতির জায়গা নেই বললেই চলে। আজ বাংলাদেশের নয় সুইডেনের জনগণের মৃত্যু পরবর্তী বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে কিছু বর্ণনা করব। এখানের লোক সংখ্যা কম। প্রতিটি পরিবারে তিন থেকে চারজনের বসবাস।

অনেকে আবার একাকী সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। এখানে দেনা পাওনা বা লেনদেন যাই হোক না কেন সব কিছুই ডকুমেন্টের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সুইডেনে হঠাৎ যদি কেউ মারা যায়, সঙ্গে সঙ্গে সে খবর ট্যাক্স কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়। প্রতিটি মানুষের জন্ম তারিখের শেষে বাড়তি চারটি সংখ্যা দেয়া হয়; যার কারণে এখানে জন্ম তারিখের পরিবর্তে বলা হয় ‘পারসন নাম্বার’।

এখন এই পারসন নাম্বারের কারণে মৃত ব্যক্তিকে সনাক্ত করা থেকে শুরু করে তার ব্যাংক ব্যাল্যান্সসহ সব কিছুর মনিটরিং করতে সহজ হয়। যে মুহূর্তে কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে, কর্তৃপক্ষ তার স্থাবর অস্থাবরসহ সমস্ত কিছু লকডাউন করে ফেলে। মৃত ব্যক্তির জানাজার জন্য রয়েছে একটি গ্রুপ। তাদের দায়িত্ব জানাজার পুরো কাজ সম্পন্ন করা।

সুইডেনে কাজ করা মানেই ট্যাক্স পে করা। যাকে বলা হয় খাজনা দেয়া। এখানের মানুষ যে কাজই করুক না কেন খাজনা দিতে হয়, যা গড় আয়ের এক তৃতীয়াংশ। এই এক তৃতীয়াংশ অর্থ সরকার কীভাবে ব্যয় করে তার একটি হিসাব প্রত্যেক নাগরিককে জানানো হয় ট্যাক্সের হিসাব নিকাশের মাধ্যমে।

যারা সমাজে কাজ না করে বসে বসে খায় এমন লোকও আছে। তবে আজীবন কিছু না করে শুধু শুধু বসে খায় এমন কাউকে এখনও দেখিনি। তবে যদি কেউ বৃদ্ধ বয়সে এখানে আসে, তাকে সুইডিশ সরকার একটি ভাতা দিয়ে থাকে সিনিয়র নাগরিক হিসাবে। এ গ্রুপের লোকদের খাজনা দেওয়া লাগে না।

যে পরিবারের লোক সংখ্যা বেশি, তারা সমাজের সুযোগ-সুবিধাগুলো বেশি নিয়ে থাকে। তা স্বত্বেও খাজনা সবাইকে দেওয়া লাগে এবং তার পরিমাণ নির্ভর করে আয়ের ওপর। এখন যে ব্যক্তি মারা গেল তার মৃত্যুতে যে খরচ হবে তা সেই মৃত ব্যক্তির ব্যাংক একাউন্ট থেকে নেওয়া হবে। যদি দেখা যায় তার কিছুই নাই, তখন সরকারের তরফ থেকে তাকে সাহায্য করা হয়। সরকার সাহায্য করে কীভাবে?

বলেছি এ সমাজে অনেকেই রয়েছে যারা খাজনা দেয় তবে তার ব্যবহার করে কম। সেক্ষেত্রে তার খাজনার বেশির ভাগ অর্থ সরকারের ফান্ডে জমা থাকে। যার কারণে যার কিছু নাই তাকে সরকারের সেই ফান্ড থেকে সাহায্য করা হয়ে থাকে। এ বর্ণনায় বোঝা নিশ্চয় গেল যে সরকার বলতে জনগণকেই বোঝানো হয় এবং জনগণ ছাড়া সরকারের অস্তিত্ব শূন্য।

মৃত ব্যক্তির জানাজার কাজ শেষ হবার পরে যদি তার বিষয় সম্পদ কিছু থেকে থাকে তবে তা নিয়মানুযায়ী ভাগবন্টন করা হয়। যদি কেউ জীবিত অবস্থায় উইল করে রেখে যায় সেসব তথ্যসহ সব কিছুই সরকারের নজরে আনতে হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।

যখন দেখা যায় ব্যক্তি মালিকানার কোন উত্তরাধিকারী নাই, তখন সমস্ত সম্পদ সরকারের ফান্ডে জমা হয়। জীবনের সব হিসাব নিকাশ শেষে ব্যক্তিটি পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। বাকি শুধু রয়ে যায় বিধাতার সঙ্গে হিসাব নিকাশটা!

বহু বছর সুইডেনে রয়েছি যার কারণে সব বিষয়ের সঙ্গে দিন দিন জড়িয়ে পড়ছি। অন্যদিকে বাংলাদেশে থাকতে দেখেছি যখন কেউ মারা যায় স্থানীয়ভাবে সেখানকার সবাই মিলে দিব্বি কবর খোঁড়া থেকে শুরু করে কাফন দাফনসহ জানাজার কাজ শেষ করে। পরে জানাজা এবং কবর শেষে শুরু হয় হিসাব নিকাশের পালা।

সুইডেনের সঙ্গে তুলনা করলে, জনগণের কাজে বাংলাদেশে সরকারের অংশগ্রহণ খুবই সামান্য। বাংলাদেশে মৃত ব্যক্তির পুরো সব ব্যবস্থা হয়ে যায় সরকারের সক্রিয় অংশ গ্রহণ ছাড়াই। তার প্রধান কারণ বাংলাদেশে খাজনা দেয়ার যে সিস্টেম তা সুইডেনের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা বলা যেতে পারে।

সেক্ষেত্রে নাগরিকের অধিকার নিয়েও তুলনা করা ভুল হবে। কাগজে কলমে গণতন্ত্র আর বাস্তবে গণতন্ত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যেখানে সরকার এখনও জনগণের খাবারের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি সেখানে সব কিছুর তুলনা করা ঠিক হবে না। আমি আমার জীবনের অভিজ্ঞতাকে শেয়ার করলাম।

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত