ওষুধ আবিষ্কার: প্রেক্ষিতে বিশ্ব ও বাংলাদেশ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০১ মে ২০২০, ০৬:০৭:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের মানুষ আমরা দেশ স্বাধীনে অবদান রেখেছি। তার মধ্যে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশের মানুষকে তাদের মধ্যে হাজারও মানুষের নাম ফুলের মতো ফুটে উঠবে। এই স্বাধীনতার পেছনে কেউ দিয়েছেন নেতৃত্ব, কেউ দিয়েছেন অনুপ্রেরণা, কেউ করছেন যুদ্ধ, কেউ দিয়েছেন সেবা ইত্যাদি।

অনেক স্বাধীনচেতা মহামানুষের মধ্যে নিঃসন্দেহ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একটি পরিচিত নাম এ বিষয়ে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। তিনি দেশ গড়ার পেছনে ভালো ভালো কাজ করে যাচ্ছেন সে বিষয়েও আমরা অবগত। তিনি তার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি রাজনীতি করেন তাও আমরা জানি।

বর্তমানে করোনা রোগী সনাক্ত করার জন্য যে কিট তার কোম্পানি উদ্ভাবন করেছে তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা টেনে আনা হয়েছে। এই উদ্ভাবনের পেছনে জাতির স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টি অবশ্যই জড়িত এবং সেদিক থেকে পরোক্ষভাবে এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে জড়িত সে কথাও বলা যায়।

ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন “একটা কিছু আবিষ্কার করেছি, এটা তো আনন্দের ব্যাপার।” হ্যাঁ, আনন্দের ব্যাপার কিন্তু শুধু আনন্দের সঙ্গে ওষুধের কার্যকারিতার কোনো সম্পর্ক নেই। ওষুধের কার্যকারিতার সঙ্গে ওষুধের বিশুদ্ধতার সম্পর্ক জড়িত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক বিভিন্ন ওষুধ অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত আছেন তারা জানেন নতুন ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে বৈশ্বিকভাবে নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে নিবন্ধন করলে বিশ্বব্যাপী তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। জাপান এবং ইউরোপেও নিবন্ধন করতে হয়। ওষুধ বিক্রি করতে হলে এসব কর্তৃপক্ষকে মোটিভেট করতে হবে ওষুধের গুণগত মান দেখিয়ে।

কিট অনুমোদনের জন্য যে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, সেগুলো যদি পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়ে থাকে তবে কেন অভিযোগ? তাহলে কি বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ব্যবসায়িক স্বার্থে জাতীয় স্বার্থের বিপক্ষে কাজ করছে?

গতকাল অবদি ওষুধ প্রশাসন নানা অজুহাত দেখিয়ে গণস্বাস্থ্যের কিট গ্রহণ করতে রাজি হয়নি অথচ আজ হয়েছে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কিট সংক্রান্ত বিষয়ে ঘুষের অভিযোগও তুলেছেন, যা একটি সিরিয়াস ইস্যু, এ অভিযোগের পর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

এদিকে অধিদফতর বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন ছাড়া সরকার এই কিট গ্রহণ করবে না। আমার প্রশ্ন, যেসব কিট দেশে আমদানি করা হচ্ছে তাতে কি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন রয়েছে? বাংলাদেশের তৈরি কিট ব্যবহার না করে যদি অন্য দেশের কিট ব্যবহার করা হয় সেক্ষেত্রে জাতি সরকারের কাছে জবাবদিহিতা আশা করতেই পারে।

আমি মনে করি সরকারের উচিত হবে বিদেশি কিট ব্যবহার না করে দেশের তৈরি কিট ব্যবহার করা, যদি তা সমমানের হয়। তা না হলে কি ধরে নিতে পারি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা আর্থিক সম্পর্ক জড়িত রয়েছে? জাতির দুর্দিনে সবার একসঙ্গে কাজ করার কথা অথচ কী নোংরামি চলছে দেশে?

আমি নিজে ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত বিধায় এ প্রক্রিয়া আমার জানা আছে। কারণ আমি আন্তর্জাতিকভাবে এসব বিষয়ের সঙ্গে বেশ পরিচিত। যেকোনো আবিষ্কারের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষেই যথাযথ অনুমোদন নিতে হয়। বাংলাদেশ প্রথম থেকে মনে হয় সঠিক পদক্ষেপ নেয়নি, যার কারণে প্রথমে সাহায্যর হাত বাড়িয়ে পর মুহূর্তে এসে পিছুটান দিয়েছে।

এখন আবার যখনই জেনেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন, পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের কিটের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিট নেবে। তারা এটি পরীক্ষা করে দেখবে এবং রেজাল্ট জানাবে। আমেরিকা এই কিট নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তখন বাংলাদেশও রাজি হয়েছে। বাংলাদেশে কি জানে তারা কি করছে? মনে হচ্ছে নিয়মকানুনের মধ্যে সমস্যা রয়েছে।

আবার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, তিনি চান মানুষ দুশো টাকায় পরীক্ষা করার সুযোগ পাক, কিন্তু কর্মকর্তারা চান এ খরচ পাঁচশো টাকা হোক। খুবই ভয়ঙ্কর অভিযোগ। ঘুষের অভিযোগের সঙ্গে এ অভিযোগ ভয়ানকভাবে সম্পর্কযুক্ত।

ছোট বেলায় শুনেছি “ধাওয়া জ্বালে খৈ আর মিঠে জ্বালে পিঠে।” ওষুধ তৈরি করা তাড়াহুড়র বিষয় নয়। এর পেছনে সময়, অর্থ, জ্ঞানসহ নানা ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা জড়িত রয়েছে। সব কিছু সঠিকভাবে সম্পন্ন হবার পর রেগুলেটরি অথরিটির অনুমোদন নিতে হয় বাজারজাতকরণে।

কোভিড-১৯ হুট করে এসে খৈয়ের মত ছড়াচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার মোকামিলা করতে প্যানিক নয় বরং একটি নির্ভরযোগ্য কিট এবং একটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে হবে, যেখানে সেটার অ্যাকুরিসি থাকবে শতভাগ। মানুষের দুর্দিনে তাড়াহুড়ো করে কিট তৈরি করা হলো, অথচ কর্তৃপক্ষের সাহায্যের পরিবর্তে এলো বাধা।

ছোট্ট একটি গল্প মনে পড়ে গেল। একটি লোক চার তলার ছাদের ওপর উঠেছে আত্মহত্যা করবে। সবাই ভয়ে পুলিশে ফোন করল। পুলিশ এসেই জোর গলায় বললো লোকটিকে, “এই ছেলে ওখান থেকে নাম, নইলে গুলি করে দিব কিন্তু”।

একটি নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে পাওয়া সম্ভব হবে না, মাঝখানে খাজনার চেয়ে বাজনা হবে বেশি। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, করোনা বাংলাদেশে তেমন প্রভাব ফেলবে না বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত।
বাংলাদেশের মানুষ যে পরিবেশে বসবাস করে, যে খাবার খায়, যে পানি পান করে এবং যে তাপমাত্রা সহ্য করে সেক্ষেত্রে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে। সেক্ষেত্রে লকডাউন নয় বরং আসুন সবাই মিলে খিদে নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজি।

লেখক: রহমান মৃধা, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রি, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত