চেঞ্জ ফর বেটার লাইফ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৭ মে ২০২০, ০৮:০৩:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

‘‘শ্রদ্ধেয় রহমান মৃধা স্যার। আসসালামু আলাইকুম। গত ৩ মে যুগান্তরে আমি আপনার একটি যুগোপযোগী কলাম পড়লাম। আপনি সুইডেন থেকে লিখেছেন। আমি ...... থেকে লিখছি। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। ২০১৪ সাল থেকে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আসছি। এ পর্যন্ত কয়েকবার চাকরি হারিয়েছি শুধুমাত্র অফিসের কথা মত সিমেন্ট রড চুরি তথা কোয়ালিটি খারাপ করতে না পারার কারণে।

সরকারি চাকরি করতেও সাহস হয় না, যখন দেখি কোন সরকারি অফিসের পিয়ন থেকে সর্বোচ্চ পদের ব্যক্তিবর্গের অবাধে দুর্নীতি করতে। বর্তমানে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানে প্রধান ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দায়িত্বে আছি। প্রথম দিকে তারা সরাসরি সিমেন্ট, রড ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি করতে বললে আমি সরাসরি এর বিরোধিতা করি।

কারণ আমি জানি এবং বিশ্বাস করি একজন মানুষের কাছে কোন অপরাধ করলে শুধু তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলে আল্লাহও ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত স্কুল, কলেজ বা অন্য কোন সরকারি ভবনের ক্ষতি করে কিভাবে তার ক্ষমা পেতে পারি? নিশ্চয়ই জনে জনে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া সম্ভব নয়! এটা তো স্যার জনগণের অধিকার।

স্যার, এখন প্রতিনিয়ত আমার বস আমাকে কিছু প্রশ্ন করে লজ্জায় ফেলে দেন। যার উত্তর আমার কাছে নেই। আপনার লেখা পড়ে আমার এতটাই ভালো লেগেছে যে প্রশ্নগুলো তাই আপনার কাছে পাঠালাম। আপনি দেশের জন্য একজন বীর সৈনিক ছিলেন এটা বুঝতে পেরেছি। বস যে ভাবে প্রশ্নগুলো করেন-

১) যখন আমরা কোন কাজের টেন্ডার ড্রপ করি তখন ব্যবসায়ি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য সরকারি আইটেম রেট হতে ১০% লেস তথা কম দিই। যেমন ১০০ টাকায় ১০ টাকা কম মানে ৯০ টাকা।
২) কাজ পাওয়ার পর ড্রইং পাস করানোর জন্য ঊর্ধ্বতন ইঞ্জিনিয়ারকে আরও ১০০ টাকায় ৫ টাকা দিতে হয়।
৩) নির্মাণ কাজে পরিদর্শন: যেমন ঢালাই কাজ, রডের পরিমাণ চেক ও বিভিন্ন কাজে ইঞ্জিনিয়ারদেরকে অফিস হতে সাইটে নিয়ে যাওয়া-আসা, খাওয়ানো, পান-সিগারেট আবার পকেটে সম্মানী হিসাবে আরও ১০০ টাকায় ১০ টাকা খরচ করতে হয়।
৪) কাজের বিল করার সময় মোট বিলের শতকরা ৫ শতাংশ ইঞ্জিনিয়ারদের পিসি (কমিশন) হিসাবে অবশ্যই দিতে হয়।
৫) এছাড়াও টেন্ডার প্রসেসিং করতে বিভিন্ন কারণে শতকরা ২ টাকা এদিক-সেদিক খরচ করতে হয়।
৬) কোম্পানি পরিচালনা, ব্যাংক লোনের সুদ ইত্যাদিতে শতকরা ৫-৬ শতাংশ খরচ তো আছেই। (ধরে নিলাম সরকারি রেটের মধ্যে ১০% কোম্পানির লাভ ধরা থাকে)
৭) নির্মাণ কাজের বিভিন্ন আইটেম কম বেশি হওয়ায় এস্টিমেট রিভাইজ করতে হয় এর জন্য শতকরা অতিরিক্ত আরও ২-৩% খরচ করতে হয়।
৮) ভ্যাট এবং ট্যাক্স মিলে ১২.৫% তো আছেই।

হিসাব: মনে করি, বাজেট ১০০ টাকা। খরচ-

১ নম্বর প্রশ্ন=১০ টাকা।
২ নম্বর প্রশ্ন=৫ টাকা।
৩ নম্বর প্রশ্ন=১০ টাকা।
৪ নম্বর প্রশ্ন=৫ টাকা।
৫ নম্বর প্রশ্ন=২ টাকা।
৬ নম্বর প্রশ্ন=৬ টাকা।
৭ নম্বর প্রশ্ন=২ টাকা।
৮ নম্বর প্রশ্ন=১২.৫ টাকা।

সর্বমোট=শতকরা ৫২.৫০ টাকা মূল নির্মাণ বাজেট হতে হাওয়া হয়ে যায়।

বসের প্রশ্ন হলো, সঠিকভাবে কাজ করলে উপরের উপরি টাকাগুলো কি আমি জমি বিক্রি করে দেব? স্যার, আমি প্রতিনিয়ত নিজের কাছে ছোট হয়ে যাই। কখনও কখনও অফিসের টয়লেটে গিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলি আর নিজেকে প্রশ্ন করি, বসের বাস্তব এবং সত্যিকারের প্রশ্নগুলোর কি কোন সমাধান নেই?

বসের কাছে আমি এখন সত্যিকারের বোঝা, গলার কাঁটা। তাই তো এখন অনেক কাজে আমাকে ভিজিট করতে পাঠায় না। কারণ আমি সাইট ভিজিটে গেলে সরকারি ইঞ্জিনিয়াররাও মাঝে মাঝে সাইটে আসে না। বলেন যে, আমি সাইটে থাকলে নাকি কাজের কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই নাই।

স্যার, করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন তাই বাধ্য হয়ে আমিও বাসায়। আর এরই মহান সুযোগে কোম্পানি হতে ছাটাই হওয়ার চিঠি ইস্যু হচ্ছে। আপনারা দেশটাকে স্বাধীন করে আমাদের তরুণ সমাজকে কাদের হাতে রেখে গেছেন?

চাকরি চলে গেলে হয়তো আবার চাকরি পাবো ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ভবিষ্যতে আমিও যে একজন সৎ আদর্শবান শিল্প উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, তাহলে কিভাবে আমি আমার কোম্পানি দাঁড় করাবো বা পরিচালনা করবো স্যার?”

যেহেতু আমি নিয়মিত নানা বিষয়ের ওপর বাংলাদেশের মত সুইডেনেও লিখি। স্বাভাবিক ভাবেই অনেকের থেকে ফিডব্যাক পাই। এমন প্রশ্ন সুইডেনে কখনও কেউ করবে না, কারণ সমস্যাই সাধারণত প্রশ্নের উৎস জোগায়।

বাংলাদেশে যে পরিমাণ এবং যে ধরণের দুর্নীতি হয় সেক্ষেত্রে এসব প্রশ্ন উঠতেই পারে। এখন প্রশ্ন যখন উঠেছে এবং সমস্যা যখন রয়েছে তখন দেশের ১৮ কোটি মানুষ এবং রাষ্ট্রের কর্তারা জানুক যে একজন বিবেকবান নতুন প্রজন্ম এখনও ভাবছে সে কী করবে তার নিজের এবং দেশের জন্য।

আমি মনে করি, এই চিঠির মধ্যে যে অভিযোগ রয়েছে, এর উৎস বস না, পুরো জাতি। আমাদের মোড়াল ভ্যালু নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মোড়াল ভ্যালুর সমাধানই করতে পারে বাংলাকে সোনার বাংলা। With love and respect together we can make BANGLADESH the richest and finest country in the world to live.

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত