এক নীরব ঘাতক কোভিড-১৯
jugantor
এক নীরব ঘাতক কোভিড-১৯

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

০৭ মে ২০২০, ২৩:৫১:৩৯  |  অনলাইন সংস্করণ

সুইডেনের একজন নামকরা অর্থোপেডিক সার্জন হঠাৎ ঘুম থেকে আর উঠেনি সেদিন। কী হয়েছিল কেউ জানে না। আমি ফোন করেছি ডা. উলফকে (Dr. Ulf) সেদিন সন্ধ্যায়, কিন্তু ডা. উলফ কল ব্যাক করেনি। সাত দিন পর হঠাৎ একটি এসএমএস এসেছে।

“বাবা গত শুক্রবার রাতে শুতে যাবার আগে ছোভ গোত (শুভরাত্রি) বলে গেলেন, সকালে আর ঘুম থেকে উঠেননি। কয়েকদিন ধরে সর্দি-কাশি এবং সামান্য জ্বর ছিল। ইতি, ইংগ্রিদ (Ingrid, ডা. উলফের মেয়ে)।”

এমন একটি খবর পাবার পর মনটা ভেঙ্গে গেল। আমার স্ত্রীকে বিষয়টি বলতেই সেও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে ডা. উলফ আমাদের বাসায় এসেছিল। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। অবসরে গিয়েছে স্বত্বেও সপ্তাহে তিনদিন স্কোনে (Skåne, সুইডেনের একটি বিভাগ) থেকে প্লেনে করে স্টকহোমে এসে কাজ করে এবং সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে যেতেন।

সেদিন হঠাৎ ফোন করে বললো “রহমান আমাকে স্টকহোমে রাতে থাকতে হবে, কারণ বেশ সকালে একটি জরুরি মিটিং আছে। তোমাদের বাসায় থাকা যাবে কি?”

বললাম অবশ্যই যাবে। আমাদের ছেলে জনাথান তখন লন্ডনে, তার টেনিস টুর্নামেন্ট চলছে। তার রুমটি খালি রয়েছে। যেখানে মারিয়া তার রাতে থাকার ব্যবস্থা করেছে। বহুদিন পর একসঙ্গে ডিনারের সময় নানা ধরণের গল্পে জমে গেলাম। প্লানও করলাম সামারে ইতালিতে তার যে সামার হাউজ রয়েছে সেখানে আমি আর মারিয়া বেড়াতে যাব।

ডা. উলফের ইতালির বাড়ি রোম থেকে মাত্র এক ঘণ্টার পথ। সাগরের ধারে, পাহাড়ের ওপর, সঙ্গে ইতালির ল্যান্ডস্কেপ সব মিলে সত্যি এক মনোরম পরিবেশে তার বাড়িটি। এদিকে তার সুইডেনের বাগান বাড়িও এক চমৎকার পরিবেশে।

ডেনমার্কের বর্ডারের সঙ্গে সুইডেনের এই বিভাগ স্কোনে। এর বিশাল বনভূমি জুড়ে রয়েছে ডা. উলফের বনজ সম্পদ থেকে শুরু করে ঘোড়ার ফার্ম। যেখানে ঘোড়াকে নানা ধরণের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তার কয়েকটি ঘোড়া বিভিন্ন রেসিংয়ে বিশ্বখ্যাতি লাভ করেছে।

একজন মস্তবড় ডাক্তার সে, তারপরও তার রয়েছে নানা ধরণের নেশা। বিভিন্ন ধরণের স্পোর্টস কার যা তার বিনোদনের অংশ বিশেষ। তারপর সময় পেলেই টেনিস খেলতে পছন্দ করতেন। সে শুধু ধনী নয়; একজন বড় মনের মানুষও।

ডিনারে গল্প করতে করতে অনেক রাত হলে সবাই ঘুমতে গেলাম। ভোর রাতে ডা. উলফ বেশ কাশতে শুরু করে। একটু চিন্তিত হলাম। পরে দরজা নক করে জিজ্ঞেস করলাম কোন সমস্যা? উত্তরে বললো, এক সপ্তাহ আগে ইতালিতে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে আসার পর একটু সর্দি-জ্বর এবং কাশি হয়েছে।

তখনও সুইডেনে কোভিড-১৯ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নাই। চীনের উহানে শুনেছি ভাইরাসটি ঝামেলা করছে। নভেম্বর মাসে ডা. উলফ ইতালি ভ্রমণ করেছেন। ঠিক তখনই ইতালির একটি গ্রুপ উহান শহর সফর করেছে এবং আরেকটি গ্রুপ চীন থেকে ইতালিতে এসেছে।

কেউ ভাবতে পারেনি এর মধ্যে কত রহস্যময় ঘটনা রয়েছে এবং জানার অজান্তে ঘটেছে অনেক অঘটন। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ডা. উলফ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। জানতাম না যে আর দেখা হবে না একে অপরের সঙ্গে এবং সেদিনের সেই দেখাই হবে আমাদের শেষ দেখা।

ডা. উলফের মেয়ে ইংগ্রিদ বা তার পরিবারের কেউ জানে না হঠাৎ বাবা মারা গেলেন কেন! জানুয়ারির ১৭ তারিখে ডা. উলফের ফিউনারেল (funeral) ছিল, আমাদের যাবার ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও যেতে পারিনি। ভাবছি তার সমাধিতে এক গুচ্ছ ফুল পাঠাব তার মেয়ে ইংগ্রিদের মাধ্যমে।

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

এক নীরব ঘাতক কোভিড-১৯

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
০৭ মে ২০২০, ১১:৫১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

সুইডেনের একজন নামকরা অর্থোপেডিক সার্জন হঠাৎ ঘুম থেকে আর উঠেনি সেদিন। কী হয়েছিল কেউ জানে না। আমি ফোন করেছি ডা. উলফকে (Dr. Ulf) সেদিন সন্ধ্যায়, কিন্তু ডা. উলফ কল ব্যাক করেনি। সাত দিন পর হঠাৎ একটি এসএমএস এসেছে। 

“বাবা গত শুক্রবার রাতে শুতে যাবার আগে ছোভ গোত (শুভরাত্রি) বলে গেলেন, সকালে আর ঘুম থেকে উঠেননি। কয়েকদিন ধরে সর্দি-কাশি এবং সামান্য জ্বর ছিল। ইতি, ইংগ্রিদ (Ingrid, ডা. উলফের মেয়ে)।”

এমন একটি খবর পাবার পর মনটা ভেঙ্গে গেল। আমার স্ত্রীকে বিষয়টি বলতেই সেও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে ডা. উলফ আমাদের বাসায় এসেছিল। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। অবসরে গিয়েছে স্বত্বেও সপ্তাহে তিনদিন স্কোনে (Skåne, সুইডেনের একটি বিভাগ) থেকে প্লেনে করে স্টকহোমে এসে কাজ করে এবং সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে যেতেন। 

সেদিন হঠাৎ ফোন করে বললো “রহমান আমাকে স্টকহোমে রাতে থাকতে হবে, কারণ বেশ সকালে একটি জরুরি মিটিং আছে। তোমাদের বাসায় থাকা যাবে কি?” 

বললাম অবশ্যই যাবে। আমাদের ছেলে জনাথান তখন লন্ডনে, তার টেনিস টুর্নামেন্ট চলছে। তার রুমটি খালি রয়েছে। যেখানে মারিয়া তার রাতে থাকার ব্যবস্থা করেছে। বহুদিন পর একসঙ্গে ডিনারের সময় নানা ধরণের গল্পে জমে গেলাম। প্লানও করলাম সামারে ইতালিতে তার যে সামার হাউজ রয়েছে সেখানে আমি আর মারিয়া বেড়াতে যাব। 

ডা. উলফের ইতালির বাড়ি রোম থেকে মাত্র এক ঘণ্টার পথ। সাগরের ধারে, পাহাড়ের ওপর, সঙ্গে ইতালির ল্যান্ডস্কেপ সব মিলে সত্যি এক মনোরম পরিবেশে তার বাড়িটি। এদিকে তার সুইডেনের বাগান বাড়িও এক চমৎকার পরিবেশে। 

ডেনমার্কের বর্ডারের সঙ্গে সুইডেনের এই বিভাগ স্কোনে। এর বিশাল বনভূমি জুড়ে রয়েছে ডা. উলফের বনজ সম্পদ থেকে শুরু করে ঘোড়ার ফার্ম। যেখানে ঘোড়াকে নানা ধরণের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তার কয়েকটি ঘোড়া বিভিন্ন রেসিংয়ে বিশ্বখ্যাতি লাভ করেছে। 

একজন মস্তবড় ডাক্তার সে, তারপরও তার রয়েছে নানা ধরণের নেশা। বিভিন্ন ধরণের স্পোর্টস কার যা তার বিনোদনের অংশ বিশেষ। তারপর সময় পেলেই টেনিস খেলতে পছন্দ করতেন। সে শুধু ধনী নয়; একজন বড় মনের মানুষও। 

ডিনারে গল্প করতে করতে অনেক রাত হলে সবাই ঘুমতে গেলাম। ভোর রাতে ডা. উলফ বেশ কাশতে শুরু করে। একটু চিন্তিত হলাম। পরে দরজা নক করে জিজ্ঞেস করলাম কোন সমস্যা? উত্তরে বললো, এক সপ্তাহ আগে ইতালিতে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে আসার পর একটু সর্দি-জ্বর এবং কাশি হয়েছে। 

তখনও সুইডেনে কোভিড-১৯ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নাই। চীনের উহানে শুনেছি ভাইরাসটি ঝামেলা করছে। নভেম্বর মাসে ডা. উলফ ইতালি ভ্রমণ করেছেন। ঠিক তখনই ইতালির একটি গ্রুপ উহান শহর সফর করেছে এবং আরেকটি গ্রুপ চীন থেকে ইতালিতে এসেছে। 

কেউ ভাবতে পারেনি এর মধ্যে কত রহস্যময় ঘটনা রয়েছে এবং জানার অজান্তে ঘটেছে অনেক অঘটন। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ডা. উলফ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। জানতাম না যে আর দেখা হবে না একে অপরের সঙ্গে এবং সেদিনের সেই দেখাই হবে আমাদের শেষ দেখা। 

ডা. উলফের মেয়ে ইংগ্রিদ বা তার পরিবারের কেউ জানে না হঠাৎ বাবা মারা গেলেন কেন! জানুয়ারির ১৭ তারিখে ডা. উলফের ফিউনারেল (funeral) ছিল, আমাদের যাবার ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও যেতে পারিনি। ভাবছি তার সমাধিতে এক গুচ্ছ ফুল পাঠাব তার মেয়ে ইংগ্রিদের মাধ্যমে। 

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম