প্রথমে নিজ থেকে পরিবর্তন শুরু করতে হবে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৫ মে ২০২০, ১৭:৪০:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

ব্রিটিশদের আগমনের আগ থেকেই বাংলা কৃষি প্রধান দেশ। আমার দাদা এবং নানার বাবাও কৃষক ছিলেন। ধান, পাট, মুসুরি, সরিষা থেকে শুরু করে নীল চাষ করেছেন জমিতে। তখন বাড়িতে ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ। কৃষি কাজ যুগ যুগ ধরে বয়ে চলেছে আমার বাপ-দাদা চৌদ্দগোষ্ঠীর মধ্যে।

সেই হিসাবে আমরা গর্বিত বাঙালি। যদিও ভিনদেশি অনেক শাসক বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশে এসে বাহাদুরি বা অত্যাচার করেছে। পরগাছা হয়ে আমাদের খেয়ে আমাদের ওপর বাটপারি করেছে। সেসব পরগাছাদের আমরা দেশ থেকে তাড়িয়েছি, তবে আমাদের সময় লেগেছে।

বাঙালিরা অতিথিপরায়ণ, তাই অনেক সময় ধৈর্য ধরে এবং অনেক কিছু সহ্য করে অন্যায় অত্যাচার মেনে নিয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষরা। আমি আমার দাদা-দাদিকে দেখিনি। দাদা চেষ্টা করেছেন বাবাকে সংসারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে। বাবা তা না করে মেট্রিক পরীক্ষার পর পরই বাড়ি থেকে পালিয়ে পুলিশে যোগদান করেন।

শিক্ষার ভালো সুযোগ না থাকার কারণে ব্রিটিশ প্রশাসনে পুলিশ কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। তার কর্মজীবনে তিনি দেখেছেন পুরো বাংলাদেশেকে। দেখেছেন বাংলাদেশের মানুষকে। কীভাবে শাসন-শোষণ আর ভাষণের রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে বয়ে চলেছে।

যাইহোক বাবা ব্রিটিশ আমলে চাকরি শুরু করেন এবং যার সমাপ্তি হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। ১৯৭৫ সালের কালরাত্রিতে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন এবং বেশ ভেঙ্গে পড়েন। শেষে সরকারি কর্মজীবন ছেড়ে দাদার বিষয় সম্পদের দায়িত্বে ফিরে আসেন।

বাবার শখ ছিল যেমন গরু পালা, পুকুরে মাছের চাষ করা, মাঠে প্রজেক্ট করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা ইত্যাদি। এটা শুধু নিজের জন্য নয় অন্যকেও অনুপ্রেরণা দিতে সাহায্য করেছেন। তখন লবণ আর কেরোসিন তেল ছাড়া সবকিছু আমাদের বাড়িতেই তৈরি হতো।

হাট বাজারে বাড়ির বিভিন্ন উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। পাড়া প্রতিবেশীসহ আশেপাশের গ্রামের মানুষ উৎপাদিত পণ্যের দ্বারা উপকৃত হয়েছে। আমার বাবা-মা সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। অপচয় বা বিলাসিতা পছন্দ করেননি। তাদের আদর্শে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে।

বাপ-দাদার অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার প্রতি তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। একইসঙ্গে বাবার একটু মন খারাপ হয়েছে এই ভেবে, কৃষিকাজকে আমাদের সংসারে কে ধরে রাখবে। পরবর্তীতে আমাদের বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা ১৯৮৬ সাল থেকে লং ডিসটেন্স প্রজেক্ট চালু করেন বাংলাদেশে।

উদ্দেশ্য একটিই, তা হলো আমাদের যা আছে তা কীভাবে আরও উন্নত করা যায়। আমাদের এলাকায় তিনি নানা ধরনের প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ এবং গবাদি পশু পালনে বিশাল অবদান রেখেছেন। বর্তমানে নহাটা (উপজেলা মহম্মদপুর, জেলা মাগুরা) একটি আদর্শ গ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে।

বাবা-মা দীর্ঘ দিন ইউরোপে আমাদের সঙ্গে থেকেছেন। তবে তারা মৃত্যুর আগে দেখে গেছেন তাদের সন্তানরা দেশকে গড়তে, দেশের মানুষকে সাহায্য করতে, শিক্ষাকে প্রসারিত করতে এতটুকু কার্পণ্য করেনি।

আমি বিশ্বাস করি যদি সারা দেশের মানুষ যার যার জায়গা থেকে এলাকা ভিত্তিক বিভিন্নভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তবে বাংলাদেশেকে সোনার বাংলা করা সহজ হবে। দেশকে ভালোবাসা মানে যেমন নিজের পরিবারকে গড়তে সাহায্য করা এবং একইসঙ্গে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে টেনে তুলতে চেষ্টা করা।

এই চেষ্টা করার মনোভাব তৈরি করার মধ্য দিয়ে একটি সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়। আমরা যারা ভালো আছি আমাদের কাজ এখন যারা ভালো নেই তাদের সাহায্য করা। এখন যারা ভালো নেই তাদের নৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু পাবার আশা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কারণ পরিবর্তন আনতে হলে যেমন আছি তেমন থাকলে চলবে না।

জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে ধাপে ধাপে সামনের দিকে এগোতে হবে। আমার বাবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার বাবার সম্পদের লোভে না পড়ে নিজের চেষ্টায় ধাপে ধাপে বছরের পর বছর কঠিন সংগ্রাম করে অনেক কিছু রেখে গেছেন।

অন্যদিকে মা আমাদের লালন পালন করেছেন এবং বাবার কাজে সাহায্য করেছেন। তাদের জীবনের ৮০ বছরের চেষ্টা এবং কষ্টের ফল বাংলাদেশে রেখে গেছেন, সঙ্গে রেখে গেছেন তাদের ছেলে-মেয়েদের। যে ফসল তারা ফলিয়েছেন সে ফসল বৃথা যেতে পারে না।

মনে রাখতে হবে প্রথমে নিজ থেকে পরিবর্তন শুরু করতে হবে, পরে পরিবার, সমাজ এবং শেষে পুরো দেশে। এটা একটি প্রসেস, এর জন্য দরকার পরিশ্রম, সংঘবদ্ধতা, সু-শিক্ষা, সততা, দেশ প্রেম, ভালোবাসা এবং সর্বোপরি চেষ্টা। সবাইকে শুভেচ্ছা এবং শুভ কামনা।

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত