দ্বীপ আছে, আলো আছে, শুধু কালো বিড়াল আর বটগাছটি নেই

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৮ মে ২০২০, ২৩:৫৬:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়। বেশ চির পরিচিত একটি বাণী। পৃথিবীতে যে পরিমাণ গাছপালা আছে তার সবার নাম কি ফলে পরিচয়? বেশ ভাবনার বিষয়! আমগাছ, কাঁঠালগাছ, জামগাছ বলতে বলতে মাথায় ঢুকে গেল যেমন পানগাছ, তুলসীগাছ, চৈগাছ, দারুচিনি গাছ ইত্যাদি।

যাইহোক বোঝা গেল যে গাছের পরিচয় শুধু ফলে নয় তা হতে পারে ফুলে, পাতায় এমনকি ছালেও। আশ্চর্য যে এত বড় একটি গাছ অথচ তার নিজের কোনো পরিচয় নেই। তবে বটগাছের নিজ পরিচয় বটগাছ। এর আদি নিবাস হল বঙ্গভূমি (বাংলাভাষী অঞ্চল)। এটি একটি বৃহদাকার বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ।

বটগাছ খুব বড় জায়গা জুড়ে জমির সমান্তরাল শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে যারা স্তম্ভমূলের ওপর ভর দিয়ে থাকে। বটগাছ খুব বড় অথচ তার বিচি খুব ছোট। যে জিনিস যত ছোট তার ক্ষমতা ততবেশি দেখা যাচ্ছে। করোনা চোখে দেখা যায় না অথচ বিশাল ক্ষমতা।

যাইহোক আজ আমি বহু পুরাতন একটি বট গাছ নিয়ে আলোচনা করবো। গাছটি ছিল মাগুরা জেলার শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে পাল্লা গ্রামের মোড়ে। সে এক বিশাল বটগাছ যেখানে হিন্দুরা শত শত বছর ধরে পূজা করেছে।

বটগাছটি বেশি পুরনো হবার কারণে যেকোনো সময় রাস্তায় পড়ে মানুষের প্রাণনাশের কারণ হতে পারে বলে সবার ধারণা থাকা সত্ত্বেও কেউ ভয়ে বটগাছটি কাটতে রাজি হয়নি। শেষে বাবা কোনো এক সময় জায়গাটি ক্রয় করেন এবং গাছটি কেটে ফেলেন। অনেকের ধারণা ছিল বড় ধরনের একটি ক্ষতি হবে আমাদের পরিবারে!

আমার বয়স খুব একটি বেশি নয় এবং ঘটনাটি ঘটে তৎকালীন পাকিস্তানের সময়। পরে দেশ স্বাধীনের পর বাবা সেখানে বাড়ি করেন। কারণ গ্রাম ছেড়ে শহরে লেখাপড়া করতে হবে। আমরা তিন ভাই সেখানে থেকেছি। আমাদের এলাকার অনেক কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররাও সেখানে লেখাপড়া করেছে। মাঝেমধ্যে বিশেষ করে স্কুল কলেজ ছুটি হলে সবাই যার যার গ্রামের বাড়িতে চলে যেত।

একবার এক রাতে আমি বাড়িতে একা। বিকেল হতেই একটি কালো রংয়ের বিড়াল বাড়ির আশপাশ দিয়ে ম্যাও ম্যাও করছে। বিড়ালটিকে এর আগে কখনও দেখিনি। ভাবলাম হবে হয়ত কারো। মনে হলো বিড়ালটির খিদে পেয়েছে। কাজের মহিলাটি রান্নাঘরে রান্না করছে। সে রান্না করে সন্ধ্যার খাবার নিয়ে তার বাড়িতে চলে যায়।

বললাম বিড়ালটিকে কিছু খাবার দিতে। তিনি খাবার দিলে বিড়ালটি খাবার না খেতেই হুট করে উধাও হয়ে গেল। কাজের মেয়ে চলে গেল তার বাড়িতে। আমি পড়তে বসেছি। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ বিড়ালটি ঘরে ঢুকে ম্যাও ম্যাও করছে। আমি একটু অবাক হলাম। ঘরের জানালা দরজা সব বন্ধ, পুরো বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। বিড়ালটি কীভাবে ঘরে ঢুকলো?

এদিকে বৈশাখ মাস বাইরের ওয়েদারও খুব ভাল মনে হচ্ছে না। ভাবছি রাতের খাবারটি খেয়ে নিই। খেতে বসেছি, হারিকেনটি টিপ টিপ করে জ্বলছে। বিদ্যুৎ তখনও আসেনি। আমি কিছু খাবার একটি বাটিতে করে বিড়ালটিকেও দিলাম। কিছুক্ষণ যেতেই হারিকেন নিভে গেল। এদিকে বাইরে ঝড় শুরু হয়েছে তারপর ভীষণ অন্ধকার।

কী যে করি, বেশ ভয় ভয় লাগছে। হঠাৎ দেখি বিড়ালের চোখ থেকে টর্স লাইটের মত আলো জ্বলে উঠছে। আমি ঘরের সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে সব ফেলে খাটে শুতে গেলাম। বিড়ালের চোখ আর জ্বলছে না এবং তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। ভয়ে অবশ হয়েছি আমি।

ঝড় একটু কমেছে বাইরে। জানালাটি খুলে বাইরে তাকাতেই দেখি সেই বিশাল বটগাছ। ব্যাপার কী, বটগাছ? সে তো বহু বছর আগেই বাবা কেটে ফেলেছেন। মনে মনে দোয়া পড়ছি আর ভাবছি “কেটে ফেললেই হলো, আমার অস্তিত্ব আজীবন, আমাকে কেটেছে বটে তবে আমি এখানেই আছি।”

আমি বললাম কে, কে কথা বলছে? নিস্তব্ধ নীরব। পুরো পৃথিবী চুপ হয়ে আছে, আমি সেদিন একা ঘরে, বয়স আমার বেশি না। সারারাত সেদিন যে কীভাবে কেটেছে তা বলতে পারবো না। রাত তো নয়; ছিল এক যুগ। পরে যে কী হয়েছিল তা আর মনে নেই। জ্ঞান হারিয়ে কখন ঘুমিয়ে গেছি তাও জানি না, তবে ঘুম থেকে উঠে দেখি দ্বীপ আছে, আলো আছে, শুধু কালো বিড়াল আর বটগাছটি নেই...।

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত