সুইডেন কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে
jugantor
সুইডেন কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে  

২২ মে ২০২০, ১৮:০১:১৮  |  অনলাইন সংস্করণ

ছোটবেলায় গল্প শুনেছি চোর পালালে মাথায় বুদ্ধি আসে। কথাটি নিয়ে ভেবেছি। ভয় বা আতঙ্কে আমরা বাকশক্তি হারাতে পারি। আমাদের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনকি আমরা জ্ঞান পর্যন্ত হারাতে পারি। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের ভারসাম্য না থাকার কারণে বিবেক বুদ্ধি লোপ পায়। 

এ কারণে ক্ষণিকের জন্য বুদ্ধি কাজ করে না। অন্ধকার ঘরে চোর ঢুকেছে ভয়ে বুদ্ধি লোপ পায়, পরে চোর চুরি করে সব নিয়ে যাবার পর বুদ্ধি এসে হাজির হয়। উপরের কথাটিতে বেশ যুক্তি রয়েছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য তা হলো সুইডেন পৃথিবীর অন্যান্য দেশর মতো শুরু থেকেই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে। 

যদিও বলা হয় সুইডেন মানবাধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ, তবে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় সে কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। সুইডেনের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে যখন করোনা ঢুকেছে, রোগীরা শ্বাসকষ্টে ভুগছে, তাদের জন্য ডাক্তার ডাকা, হাসপাতালে পাঠানো, অক্সিজেন দেওয়া কোনো কিছুরই অনুমতি ছিল না। এ কারণে সবাই বেশ নিরুপায় হয়ে বসে বসে রোগীদের মৃত্যু দেখেছে।

পাশের দেশগুলো যেমন ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ড প্রথমেই লকডাউন করেছে। সুইডেন সেটা করেনি। গত শীতকালীন ছুটিতে তারা কোনোরকম বাঁধা নিষেধ ছাড়া ইতালিতে গিয়েছে এবং দেশে ফিরে এসে দেদারছে ঘোরাঘুরি করে রোগটিকে ছড়িয়েছে। 

সরকার সব জেনেশুনে কোভিড-১৯কে গুরুত্ব দেয়নি এবং কিছুই করেনি। সরকারের গাফিলতির কারণে আমরা আমাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছি। সুইডেনে যত মানুষ কোভিড-১৯ এ মারা গিয়েছেন, তার বেশিরভাগই বৃদ্ধাশ্রমের, বয়স ৭০ এর বেশি। 

এদের অনেকেই সময়মত চিকিৎসা পেলে আরো অনেক বছর বেঁচে থাকতে পারতেন। সবচেয়ে বড় কথা, সব বয়সের মানুষেরই চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে সত্ত্বেও সেটা সম্ভব হয়নি। সুইডেন কি তাহলে বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসেবা, অবসরভাতা ইত্যাদির খরচ বাঁচাতে জেনে শুনেই ওদের মরতে সাহায্য করেছে? এটা কি সুইডেনের মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়?

সুইডেন লকডাউনে যায়নি, শুধু উপদেশ দিয়েছে কী করে চলতে হবে। যেমন শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া ইত্যাদি। বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে বাইরের কেউ যেন ভিজিট না করে সেই উপদেশ সরকারের পণ্ডিত ব্যক্তিরা দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় পোশাক (পিপিই) যেমন মাস্ক, গ্লাভসের বিরাট আকারে সংকট দেখা দেয়। 

হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে প্যানিক সৃষ্টি করে সরকার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যার ফলে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে উপদেশ ঠিকই দেওয়া হয়েছে, সমস্যার সমাধানও কিছুটা হয়েছে তবে অনেক মানুষ মরে যাওয়ার পর।

সুইডেনের হাসপাতাল প্রথম থেকেই বলেছে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই, তাই বাড়িতে থাকতে হবে। শুধু শ্বাসকষ্ট হলে হাসপাতালে আসা যাবে। তারা ইচ্ছে করলে রিস্ক নিয়ে ক্লোরোকুইন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিন একসঙ্গে প্রয়োগ করতে পার তো। 

শরীরের রক্ত জমাট বেঁধে হঠাৎ যে রোগীগুলো মারা গেলো তার জন্য Fragmin (delteparin) এর মতো ইনজেকশন দিতে পারতো। অথচ কিছুই করেনি শুধু অক্সিজেন দিয়ে সাহায্য করেছে। রোগী দীর্ঘদিন একা একা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত থাকার কারণে শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে হাসপাতালে যখন এসেছে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই হয়নি তাদের। 

যদিও কর্তৃপক্ষ বলেছে  রেস্পিরেটর (respirator) সবাই সহ্য করতে পারে না। এটা কঠিন চিকিৎসা, তাই শুধু অক্সিজেন দিব, বাঁচলে বাঁচবে, না বাঁচলে নাই। এত কিছুর পরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুইডেনের কোভিড-১৯ মোকাবেলার প্রশংসা করেছে। আমি অবাক হয়েছি কীভাবে এটা সম্ভব!

যেখানে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাইড্রোক্লোরোকুইন এবং এজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ একসঙ্গে সেবন করছে এবং অনেক আক্রান্ত রোগী সেরে উঠছে। তারপরও জানি না কেন তেমন গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব সাহস পাচ্ছে না?

ম্যালেরিয়ার জন্য ‍ক্লোরোকুইন ব্যবহৃত হয়েছে যার নতুন ভার্সন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন। যদি এ ওষুধ করোনা ভাইরাস চিকিৎসায় সফলতা আনে তবে লকডাউন তুলে বিশ্বের মানুষকে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে সমস্যা কোথায়? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাজ কী? মাসে মাসে বেতন নেয়া নাকি মানুষের জন্য কাজ করা? আর কতদিন চলবে এভাবে?

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

সুইডেন কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে

 রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে 
২২ মে ২০২০, ০৬:০১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ছোটবেলায় গল্প শুনেছি চোর পালালে মাথায় বুদ্ধি আসে। কথাটি নিয়ে ভেবেছি। ভয় বা আতঙ্কে আমরা বাকশক্তি হারাতে পারি। আমাদের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনকি আমরা জ্ঞান পর্যন্ত হারাতে পারি। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের ভারসাম্য না থাকার কারণে বিবেক বুদ্ধি লোপ পায়।

এ কারণে ক্ষণিকের জন্য বুদ্ধি কাজ করে না। অন্ধকার ঘরে চোর ঢুকেছে ভয়ে বুদ্ধি লোপ পায়, পরে চোর চুরি করে সব নিয়ে যাবার পর বুদ্ধি এসে হাজির হয়। উপরের কথাটিতে বেশ যুক্তি রয়েছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য তা হলো সুইডেন পৃথিবীর অন্যান্য দেশর মতো শুরু থেকেই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে।

যদিও বলা হয় সুইডেন মানবাধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ, তবে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় সে কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। সুইডেনের বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে যখন করোনা ঢুকেছে, রোগীরা শ্বাসকষ্টে ভুগছে, তাদের জন্য ডাক্তার ডাকা, হাসপাতালে পাঠানো, অক্সিজেন দেওয়া কোনো কিছুরই অনুমতি ছিল না। এ কারণে সবাই বেশ নিরুপায় হয়ে বসে বসে রোগীদের মৃত্যু দেখেছে।

পাশের দেশগুলো যেমন ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ড প্রথমেই লকডাউন করেছে। সুইডেন সেটা করেনি। গত শীতকালীন ছুটিতে তারা কোনোরকম বাঁধা নিষেধ ছাড়া ইতালিতে গিয়েছে এবং দেশে ফিরে এসে দেদারছে ঘোরাঘুরি করে রোগটিকে ছড়িয়েছে।

সরকার সব জেনেশুনে কোভিড-১৯কে গুরুত্ব দেয়নি এবং কিছুই করেনি। সরকারের গাফিলতির কারণে আমরা আমাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছি। সুইডেনে যত মানুষ কোভিড-১৯ এ মারা গিয়েছেন, তার বেশিরভাগই বৃদ্ধাশ্রমের, বয়স ৭০ এর বেশি।

এদের অনেকেই সময়মত চিকিৎসা পেলে আরো অনেক বছর বেঁচে থাকতে পারতেন। সবচেয়ে বড় কথা, সব বয়সের মানুষেরই চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে সত্ত্বেও সেটা সম্ভব হয়নি। সুইডেন কি তাহলে বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসেবা, অবসরভাতা ইত্যাদির খরচ বাঁচাতে জেনে শুনেই ওদের মরতে সাহায্য করেছে? এটা কি সুইডেনের মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়?

সুইডেন লকডাউনে যায়নি, শুধু উপদেশ দিয়েছে কী করে চলতে হবে। যেমন শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়া ইত্যাদি। বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে বাইরের কেউ যেন ভিজিট না করে সেই উপদেশ সরকারের পণ্ডিত ব্যক্তিরা দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় পোশাক (পিপিই) যেমন মাস্ক, গ্লাভসের বিরাট আকারে সংকট দেখা দেয়।

হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে প্যানিক সৃষ্টি করে সরকার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যার ফলে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে উপদেশ ঠিকই দেওয়া হয়েছে, সমস্যার সমাধানও কিছুটা হয়েছে তবে অনেক মানুষ মরে যাওয়ার পর।

সুইডেনের হাসপাতাল প্রথম থেকেই বলেছে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই, তাই বাড়িতে থাকতে হবে। শুধু শ্বাসকষ্ট হলে হাসপাতালে আসা যাবে। তারা ইচ্ছে করলে রিস্ক নিয়ে ক্লোরোকুইন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিন একসঙ্গে প্রয়োগ করতে পার তো।

শরীরের রক্ত জমাট বেঁধে হঠাৎ যে রোগীগুলো মারা গেলো তার জন্য Fragmin (delteparin) এর মতো ইনজেকশন দিতে পারতো। অথচ কিছুই করেনি শুধু অক্সিজেন দিয়ে সাহায্য করেছে। রোগী দীর্ঘদিন একা একা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত থাকার কারণে শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে হাসপাতালে যখন এসেছে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই হয়নি তাদের।

যদিও কর্তৃপক্ষ বলেছে রেস্পিরেটর (respirator) সবাই সহ্য করতে পারে না। এটা কঠিন চিকিৎসা, তাই শুধু অক্সিজেন দিব, বাঁচলে বাঁচবে, না বাঁচলে নাই। এত কিছুর পরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুইডেনের কোভিড-১৯ মোকাবেলার প্রশংসা করেছে। আমি অবাক হয়েছি কীভাবে এটা সম্ভব!

যেখানে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাইড্রোক্লোরোকুইন এবং এজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ একসঙ্গে সেবন করছে এবং অনেক আক্রান্ত রোগী সেরে উঠছে। তারপরও জানি না কেন তেমন গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব সাহস পাচ্ছে না?

ম্যালেরিয়ার জন্য ‍ক্লোরোকুইন ব্যবহৃত হয়েছে যার নতুন ভার্সন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন। যদি এ ওষুধ করোনা ভাইরাস চিকিৎসায় সফলতা আনে তবে লকডাউন তুলে বিশ্বের মানুষকে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে সমস্যা কোথায়? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাজ কী? মাসে মাসে বেতন নেয়া নাকি মানুষের জন্য কাজ করা? আর কতদিন চলবে এভাবে?

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
 

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০
০২ সেপ্টেম্বর, ২০২০