হলিউডে উদীয়মান এক সুইডিশ তারকার গল্প

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৬ জুন ২০২০, ১৪:৫০:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

হলিউডে উদীয়মান এক সুইডিশ তারকার গল্পে লেখক মূল ছবি ব্যবহার করতে চাননি, তাই প্রতীকী একটি শুটিংয়ের ছবি দেয়া হয়েছে

হেই রহমান, হুর মোর দু (কেমন আছ)? সেনার দু ইয়েন মেই (আমাকে চিনতে পেরেছ)? আরে! এ দেখি সেই নিকলাস, আমার এক কলিগ উলরিকার ছেলে। বহু বছর পরে হঠাৎ এক চেনা মুখ সামনে হাজির। তা তোমরা কেমন আছ? তোমার মা কেমন আছে? মেয়ে নিকিতার খবর কী? এক গাদা প্রশ্ন করলাম ঝটপট করে।

সেই ১৭ বছর আগে তাকে দেখেছি সদেরতেলিয়ে (Södertälje), স্টকহোমের অদূরে একটি শহরে। নিকলাস চাকরি করে সুইডিশ রেলে। সে রেলগাড়ি চালক, বয়স মাত্র কুড়ি বছর। কলেজ শেষ করেই চাকরিতে ঢুকেছে।

নিকলাস রাতে যখন রেল চালায়, ডিউটি শেষে ক্যামেরার মাধ্যমে দেখে কেউ রেলের বগিতে থেকে গেল কিনা। কারণ অনেক সময় দেখা যায় যে, মাঝরাতে কোনো কোনো যাত্রী এত বেশি পরিমাণ ড্রিংক করেছে যে স্টেশনে না নেমে ঘুমিয়ে গেছে বা ভুলে গেছে নামতে, তখন ট্রেনের মধ্যে থাকতে চেষ্টা করে।

নিকলাস তাদেরকে ঘুম থেকে তুলে প্রায়ই সাহায্য করে ট্যাক্সিতে করে নির্দিষ্ট ঠিকানাতে পৌঁছে দিতে। আজ ঘটেছে কিছুটা ভিন্ন। হঠাৎ দেখে একটি মেয়ে বয়স ১৬-১৭ হবে, শেষের বগিতে বসে কাঁদছে।

রাত অনেক অথচ একা একটি সুন্দরী মেয়ে বাড়িতে না গিয়ে ট্রেনে বসে একা কাঁদছে কেন? কী ব্যাপার? এই মেয়ে তোমার নাম কী? একা একা বসে কাঁদছোই বা কেন? মেয়েটি বললো, আমার নাম ক্রিস্টিনা, মা মারা গেছে বাবার সঙ্গে থাকি।

সে বলে, বাবা নতুন করে বিয়ে করেছে, আমার তেমন খোঁজ খবর নেয় না। বাড়িতে যেতে মন চাইছে না তাই বসে আছি। নিকলাস বললো, আমি এখন ট্রেন বন্ধ করে বাড়িতে চলে যাবো। তোমাকে একা রেখে যেতে পারবো না। তুমি আমার সঙ্গে চলো তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিব।

ক্রিস্টিনা রাজি হলো। নিকলাস তাকে পৌঁছে দিল তার বাড়িতে এবং সে পরে ট্যাক্সি করে নিজের বাড়িতে চলে এলো। কিছুদিন যেতেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এবার ক্রিস্টিনা বাড়িতে যেতে নারাজ। কী করবে নিকলাস? বাধ্য হয়ে মেয়েটিকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসে।

নিকলাসের মা উলরিকা বিষয়টি জানার পর ক্রিস্টিনাকে বাড়িতে থাকার অনুমতি দেয়। সময়ের সঙ্গে নিকলাস এবং ক্রিস্টিনার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। তাদের ঘর আলো করে আসে একটি কন্যা সন্তান, নাম নিকিতা।

উলরিকা, নিকলাসের মা তখন আমার কোম্পানিতে কাজ করে। সে তার ছেলের মেয়ে নিকিতার জন্মদিনে আমাদের দাওয়াত করেছিল। আমি দাওয়াতে গিয়েছিলাম। সেদিন নিকিতার জন্মদিনে সেই ছোট্ট শহরটি সদেরতেলিয়েতে। প্রথম যেদিন নিকিতাকে দেখেছিলাম তখন তার বয়স মাত্র দুই বছর।

হঠাৎ এত বছর পর গতকাল নিকলাসের সঙ্গে আমার রেলস্টেশনে দেখা। এ কথা সে কথা বলতে জিজ্ঞেস করলাম নিকিতার কথা। নিকলাস বললো, সে তিন বছর বয়সে তার মা ক্রিস্টিনার সঙ্গে আমেরিকা চলে যায়। আরও বললো ক্রিস্টিনা আমাকে ডিভোর্স দিয়ে এক আমেরিকানকে বিয়ে করে হলিউডে স্থায়ী হয়। সেই থেকে নিকিতা আর সুইডেনে আসেনি এবং আমাদেরও দেখা হয়নি।

আমি আবারও জিজ্ঞেস করলাম নিকিতার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ আছে কিনা! নিকলাস বললো, তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। তবে গত বছর সামারে সুইডেনে এসেছিল একটি মুভির স্যুটিংয়ে।

খবরটি পেয়ে অনেক চেষ্টা করেছিলাম দেখা করার, কিন্তু দেখা মেলেনি। তবে ফোনে কথা হয়েছিল। তাকে বুঝাতে চেয়েছিলাম তার সঙ্গে আমার দেখা হওয়া উচিত, যোগাযোগ থাকা উচিত কিন্তু বুঝিয়েও লাভ হয়নি। আমার সব চেষ্টা বিফলে গেছে।

সে জানায়, নিকিতা অতীতের স্মৃতিগুলো ভুলে গেছে। তিন বছর বয়সের কী স্মৃতিই বা তার মনে আছে! তাছাড়া সে এখন হলিউডের উদীয়মান তারকা। সব মিলে ভালোই চলছে। আমি যে জীবনের প্রথম তিনটি বছর তার সংস্পর্শে ছিলাম সে কথা তার মনে নেই। মনে থাকবেই বা কী করে সে তো বহু বছর আগের কথা।

অতীতের স্মৃতিচারণ করতে করতে ট্রেন এসে গেলো, এবার বিদায়ের পালা। সর্বশেষ আমি জানতে চাইলাম উলরিকা এবং নিকলাসের বর্তমান অবস্থার কথা। উলরিকা সদেরতেলিয়েতেই বসবাস করছে। নিকলাস নতুন করে বিয়ে করেছে। সে থাকে স্টকহোমের অদূরে টুম্বাতে (Tumba) এবং ভালোই আছে।

মস্ত বড় পৃথিবী তার পরও হঠাৎ তাও যেন ছোট্ট একটি গণ্ডি যেখানে দেখা মেলে বহুদিনের চেনা মুখ। কখনও সেসব মুখে আমরা শুনতে পাই ভালো খবর আবার কখনও মন্দ। ভাবতে ভাবতে আমি নিকলাসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গন্তব্যে পা বাড়ালাম।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত