সমস্যা ছাড়া সৃজনশীল সমাজ আশা করা বৃথা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৮ জুন ২০২০, ১৬:৩৫:০০ | অনলাইন সংস্করণ

শিশুর জন্মের শুরুতে তাকে ঘিরে বাবা-মাসহ সবাই শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে এবং শেষে বিশ্বজুড়ে পাঠশালা তৈরি করে। এই পাঠশালা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সেই শিশুটি আস্তে আস্তে একজন সৃজনশীল মানুষ হয় অথবা মস্ত বড় একজন চোর বা দুর্নীতিবাজ হয়। তার শিক্ষাজীবনে কেউ কখনও তাকে বলেনি, শেখায়নি, হাতে নাতে প্রশিক্ষণ দেয়নি যে তুমি চুরি করবে, মিথ্যা কথা বলবে, অন্যায় করবে, বড় হয়ে ঘুষ নিবে, দুর্নীতি করবে ইত্যাদি।

তাকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে অন্যায় করা, চুরি করা, ঘুষ নেয়া, দুর্নীতি করা এবং মিথ্যা কথা বলা যাবে না। অথচ দেখা যাচ্ছে তাকে যা শেখানো হয়েছে সে ঠিক তার উল্টোটা করে চলেছে। যে শিক্ষার কোনো শিক্ষক নেই, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই এবং যে শিক্ষা গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে, সে সেটাই শিখেছে।

কীভাবে এটা সম্ভব হলো? যেখান থেকে তাকে দূরে থাকতে বলা হচ্ছে ঠিক সেখানে যেতে সে উঠে পড়ে লেগেছে। সে চুরি করছে, পুলিশ ধরছে। সে নতুন পদ্ধতিতে চুরি করছে, পুলিশ নতুন করে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাকে আবার ধরছে। বলা যেতে পারে চোর সমস্যা সৃষ্টি করছে, পুলিশ সমাধান খুঁজছে।

আমাদেরকে শিখানো হচ্ছে, সাদা মানুষ কালো মানুষকে ঘৃণা করতে পারবে না, অথচ আমরা সেটাই করছি। ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার স্বত্বেও বণ্টনে সেটা মানছি না। যা শিখছি তা না করে যা শিখছি না তাই করছি। কী কারণ রয়েছে এর পেছনে? প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে রয়েছে এক পরিকল্পিত শিক্ষা।

এ শিক্ষার রহস্য জানতে, বুঝতে, খুঁজতে বিশ্বজুড়ে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ সে শিক্ষায় কেউ শিক্ষিত না হয়ে শিক্ষিত হয় নিজ নিজ পরিকল্পিত এক মজার শিক্ষায় এবং সেই শিক্ষায় যারা শিক্ষিত তাদেরকে আমরা বলি কুখ্যাত। কারণ তারা সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। আমার মতে তারাই পরিবার, সমাজ, দেশ এবং বিশ্বের সর্বনাশের কারণ।

আমরা বলি “failure is the pillar of success.” সেক্ষেত্রে এও বলতে পারি সমস্যা বা চাপ থেকেই সমাধানের উৎপত্তি হয়। তাহলে কি সমস্যা বা চাপ আমাদের জীবন চলার, জীবনের গতি বাড়াবার, জ্ঞানের প্রসার বৃদ্ধি করার এবং চাপ নিয়ন্ত্রণ করার গাইড লাইন?

সমস্যা এবং চাপ আছে বলেই আমরা শিখছি, জানছি, শিক্ষা গ্রহণ করছি বা চাপের কারণে আমরা বাধ্য হচ্ছি সমাধান খুঁজতে। তাহলে কেন এত অবজ্ঞা এবং কেনই বা চাপ এবং সমস্যাকে বাদ দিয়ে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বেছে নিয়েছি এবং কেনই বা এখনও কিছু করছি না? সমস্যার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্ভব। সেক্ষেত্রে সমস্যাকে ইগনোর করা ঠিক হবে না।

আমরা চেষ্টা করি কোনোভাবেই যেন সমস্যা বা চাপ আমাদের আশপাশে না আসে। আমাদের শিক্ষা প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো সমস্যা এবং চাপ থেকে যেন আমরা দূরে থাকি। যার কারণে হঠাৎ যখন বড় ধরণের সমস্যা বা চাপ এসে হাজির হয় তখন আমাদের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি হয়, আমরা প্যারালাইজড হয়ে যাই, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি বা লকডাউনে চলে যাই। শেষে বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাদের বাধ্য করে সমাধানকে খুঁজতে।

তার মানে সমাজের সমস্যা এবং চাপ সামলাতে আমরা শিক্ষা নেই এবং দেই। হ্যাঁ, এটাই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। সময় এসেছে বাস্তব সম্মত শিক্ষার জন্য নতুন করে ভাবা।

আমি মনে করি যারা মানুষ জাতির জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে তারাই প্রকৃতপক্ষে মানুষ জাতির “pillar of success.” এখন সমস্যাকে কীভাবে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে আনতে পারি এটাই হওয়া উচিৎ নতুন প্রজন্মের জন্য প্রণীত নতুন শিক্ষাপদ্ধতির একটি ভিত্তি। যে জিনিসগুলো আমরা সবাই বর্জন করতে চেষ্টা করছি, যেমন চুরি করা যাবে না। অথচ সেগুলোই আমরা অর্জন করছি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি প্রস্তুত এসব বিষয় ভাবতে? আমরা বলি চাপ দিয়ে কিছু করা যাবে না বা ফল ভালো হবে না, কথাগুলো সত্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে। যেমন একটি ডিমকে বাইরে থেকে চাপ দিলে সেটা ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু ভেতর থেকে চাপ দিলে ডিম থেকে একটি জীবন বের হয়ে আসবে। দুই ক্ষেত্রেই কিন্তু চাপের একটি বিশাল প্রভাব জড়িত। শিক্ষা প্রশিক্ষণের কাজ এখন সঠিক এবং গঠনমূলকভাবে গাইড দেয়া কখন, কী অবস্থায় এবং কীভাবে চাপকে প্রয়োগ করতে হবে। হচ্ছে কি তেমন করে প্রশিক্ষণ বর্তমানে?

আমি মনে করি আমাদের সুশিক্ষা এবং কুশিক্ষা দুটোর ওপরই আলোচনা করতে হবে। গোপনকে উন্মুক্ত করতে হবে। কোনো প্রকার হাইডিং এজেন্ডা শিক্ষা প্রশিক্ষণে থাকলে চলবে না। আলোচনায় ডিবেট তৈরি করতে হবে।

যেমন শুধু বললেই হবে না দুর্নীতি করা যাবে না বা মিথ্যা বলা যাবে না। বরং আলোচনা করতে হবে কেন এগুলো করা যাবে না। কেস স্টাডি করতে হবে, ফলাফল বের করতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে। তাহলে ব্যক্তি তার ভালোমন্দের দায়ভার নিজে নিতে বাধ্য হবে।

বর্তমানে কোভিড-১৯ চাপ সৃষ্টি করে আমাদের জীবন নাশ করছে। এখন এর থেকে রেহাই পেতে যদি সবাই বসে থাকি হবে কি সমাধান? সেক্ষেত্রে প্রথম কাজ হচ্ছে কোভিড-১৯ সম্পর্কে জানা যেমন সে কী পছন্দ করে, কী করে না, কেন করে কিংবা কেন করে না ইত্যাদি। যখন আমরা এর গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন হবো ঠিক তখন সহজ উপায়ে এর সমাধান করতে সক্ষম হবো।

তার আগ পর্যন্ত লকডাউন, ভয়, আতঙ্ক আর নিজেদেরকে তিলে তিলে শেষ করা ছাড়া অন্যকিছু করতে সক্ষম হবো না। ঠিক তেমনি করে সমাজের যত খারাপ শিক্ষা বা খারাপ কাজ রয়েছে, কেন রয়েছে সেগুলো জানতে হবে। জানতে হলে এসব বিষয়ের ওপর আলোচনা পর্যালোচনা করতে হবে। আর তা করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রশিক্ষণে এবং তা করতে পারলেই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য সফল হবে। তা না হলে যেমন আছি তেমনই থেকে যাবো।

একটি ঝিনুক যখনই দেখে বিপদ বা আতঙ্কের সম্ভাবনা ঠিক তখনই সে নিজেকে বন্ধ করে ফেলে। ঠিক সমাজে যারা অপরাধ করে তারা কিন্তু ভয় এবং আতঙ্কের কারণে চুপচাপ থাকে। তবে সময় অনুকূলে এলে ঝিনুক যেমন মুখ খুলে তার গতিতে চলে, সমাজের অপরাধীরাও ঠিক তাই করে। সুশিক্ষা পেতে সারাক্ষণ ঘৃণা, চাপ বা ভয় নয় বরং মুক্ত মঞ্চে “norm and values”-এর আলোচনার সুযোগ তৈরি করার পদ্ধতি, দক্ষতা এবং সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সেটাই হোক শিক্ষাপ্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত