সুইডেনে চিকিৎসা সেবায় এ কেমন নীতি? 

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৪ জুন ২০২০, ১৮:১৮:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

ফেস্টিং (Fästing) একটি সুইডিশ পোকা যাকে ইংরেজিতে বলা হয় টিক (Tick)। পোকাটি দেখতে অনেকটা ছারপোকার মতো। এরা জঙ্গলে বাস করে এবং পশু যেমন কুকুর বা বিড়ালের সংস্পর্শে এসে তাদের রক্ত চোষণ করে। পাশ্চাত্যে মানুষের সঙ্গে কুকুর এবং বিড়ালের বেশি মেলামেশা হয় বিধায় অনেক মানুষ ফেস্টিংয়ের কারণে রোগাক্রান্ত হয়।

ফেস্টিং এবোলা (ebola) ভাইরাস বা অন্যান্য বিষাক্ত রোগ ছড়াতে সাহায্য করে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মত সুইডেনের জঙ্গলে এদের বসবাস। এরা যখন শরীরের রক্ত চোষণ করে তখন টের পাওয়া যায় না। তবে যদি ফেস্টিংটি বিষাক্ত ভাইরাসযুক্ত হয় তখন রোগীর জীবননাশের আশঙ্কা থাকে।

আমার পরিচিত এক সুইডিশ, নাম তার লিসা। লিসার মার বয়স ৬৮। বছর খানেক আগে রিটায়ারমেন্টে গিয়েছেন তিনি। লিসা চাকরি করে আমার সহধর্মিণী মারিয়ার সঙ্গে।
আজ লিসার মন খুব খারাপ, কারণ তার মা হঠাৎ করে প্যারালাইজড হয়েছে। তার কোমর থেকে শুরু করে শরীরের পুরো নিচের অংশটা কোনোরকম নড়াচড়া করতে পারছে না।

নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর জানা গেছে লিসার মাকে ফেস্টিংয়ে কামড়িয়েছে। তবে কখন, কীভাবে তা কেউ জানে না। বর্তমানে লিসার মা বিছানা থেকে কোনোরকম নড়াচড়া করতে পারছে না। সুইডেনের নিয়ম অনুযায়ী লিসার মা ২৪ ঘণ্টা সার্ভিসসহ নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা পাবে।

কিন্তু তার মার বয়স ৬৮ বিধায় কোন রকম ফিজিক্যাল ট্রেনিং বা সাইকোথেরাপি দেয়া হবে না। লিসা একটু রেগে বিষয়টি জানতে কর্তৃপক্ষকে ফোন করে এবং বলে ২৪ ঘণ্টা সব সার্ভিস যখন দিতে বাঁধা নেই তাহলে কেন চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো করার চেষ্টা করছ না? কর্তৃপক্ষ উত্তরে বলেছে, সে এখন রিটায়ারমেন্টে, তাকে আর সমাজের কাজে লাগানো যাবে না বিধায় এক্সট্রা কোনো ব্যবস্থা করা হবে না।

লিসা বলেছে একজন পঙ্গু মানুষের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করা হবে, তাকে রিহাবিলিটাইজেশন করলে যদি ভালো হয়ে যায় তাহলে সারাজীবন তাকে সেবা দেয়া লাগবে না। তাহলে কেন তা করা হচ্ছে না? কর্তৃপক্ষের উত্তর একটিই– বয়স ৬৫ হলে বেঁচে থাকতে যা দরকার তার সব করা হবে তবে তার শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে কোনোরকম সাপোর্ট দেয়া হবে না।

শুধু একটিই কারণ, তার দ্বারা রাষ্ট্রে কোন কন্ট্রিবিউশন হবে না। কোভিড-১৯ চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এসব দেশে একই সিদ্ধান্ত, যেমন বয়স ৭০ প্লাস হলেই “you are good for nothing.”

তবে একটি জিনিস পরিষ্কার তা হলো নতুন প্রজন্মের ব্যাপারে এখানে সব ধরণের অফুরন্ত সুযোগ-সুবিধা। এদের কথা একজন তরুণ বড় হয়ে কী হবে তা কেউ জানে না, সেক্ষেত্রে তাকে সুযোগ করে দেয়া, বিপদে সাহায্য করা, অসুখে সেবা দেয়া রাষ্ট্রর দায়িত্ব।

বাংলাদেশে অবশ্য বিষয়টি অন্যরকম, যার যত ক্ষমতা তার তত সুযোগ-সুবিধা। যেমন বৃদ্ধ অথচ অতীতে মন্ত্রী ছিল সেকারণে সব সুযোগ পাচ্ছে অন্যদিকে মায়ের কোলে একটি শিশু বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।

যাইহোক লিসার মার বিষয়টি মারিয়া আমার সঙ্গে শেয়ার করেছে। ঘটনাটি শোনার পর মনে হলো জীবনটা একটি মেশিনের মতো। যতদিন ঠিক মতো চলবে, ঠিক আছে। চলবে না, পাল্টিয়ে নতুন আরেকটি মেশিন বসালেই হয়ে গেল।

বেচারা লিসার মন খারাপ তার মার জন্য। বলছে কী হবে বেঁচে থেকে যদি নিজের মতো করে কিছুই মা করতে না পারেন। লিসার মা তাকে বলেছে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ জোগাড় করে দিতে। তিনি একসঙ্গে সেগুলো খেয়ে চিরনিদ্রায় যেতে চান।

ঘটনাটি লিসা শেয়ার করেছে মারিয়ার সঙ্গে। মারিয়া বিষয়টি জানার পর লিসাকে বলেছে, গত বছর তার এক বান্ধবীর (পেশায় নার্স) মার ক্যান্সার হয়েছে জানার পর মা মেয়েকে বলেছে, আমি ভুগে ভুগে অন্যের ওপর নির্ভর হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। তুমি আমাকে কিছু ঘুমের ওষুধ এনে দিবে, আমি একবারে খেয়ে ঘুমিয়ে যাব।

মায়ের অনুরোধ রাখতে মারিয়ার বান্ধবী কাজটি করে। যখন মারিয়ার বান্ধবীর মা মারা যান পরে পুলিশের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়ে। মাকে মরতে সাহায্য করার কারণে মারিয়ার বান্ধবীর নার্সের পেশা বাতিল করে দেয় হয়। জীবন নেবার দায়িত্ব শুধু স্রষ্টার, সেক্ষেত্রে আত্মহত্যা মহাপাপ।

লিসা বিষয়টি তার মাকে বলেছে, জানি না লিসার মা কী করবেন! তিনি যদি ওষুধগুলো গোপনে জমা করে পরে একবারে খেয়ে নেয় তখন মৃত্যু অবধারিত। এমতাবস্থায় লিসার মার ওষুধ সেবনের প্রতিদিনকার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষ নিয়ে নিয়েছে।

জীবন বড় কঠিন যখন ভাটার আগমন হয়। এক্ষেত্রে সুইডেন আর বাংলাদেশ বলে কোন কথা নেই। তবে গরীব দেশের মানুষের সমস্যা নিয়ে যেভাবে আলোচনা হয় বড়লোকদের সমস্যা নিয়ে তেমনটি হয় না। সত্যি কথা বলতে কী, বড় লোকদের বড় বড় সমস্যা, কিন্তু তার প্রকাশ কম।

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত